লকডাউনের শুরু থেকেই মানবিক মানুষ আকাশ আহমেদ ভেবেছেন দেশের সাধারণ মানুষের কথা। ঢাকা শহরে প্রচুর মানুষ আছে যাদের মাসের পয়সা দিয়ে মাস পার করতে হয়। সেই সব মানুষদের কথা ভেবেছেন তিনি। এই লোকজনের চলার মত কোন অবস্থা আর থাকবে না। মূলত এটা ভেবেই শুরু করেছিলেন মধ্যবিত্তের জন্য খাবার বিতরণ।
তার এই খাবার বিতরণ এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি ছিল গোপনীয়তা রক্ষা করা। আমরা পুরো বিষয়টা আকাশ আহমেদের নিজের মুখেই শুনি-
‘আমি ভাবলাম যদি লকডাউন দীর্ঘায়িত হয় এবং মানুষ সত্যি সত্যি ঘরে বন্দি থাকে তখন সাধারণের সব আয় বন্ধ হয়ে যাবে। হতদরিদ্র রিক্সাওয়ালা, বস্তিবাসী এদের খাবারের সংকুলন হয়তো হবে স্থানীয় প্রশাসন সহ বিভিন্ন সংগঠন ও অন্যান্য সদস্যদের মাধ্যমে। কিন্তু যারা মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত যারা প্রতি মাসের টাকায় প্রতি মাসের সংসার চালায় তাদের কি অবস্থা হবে? সেসব মানুষগুলো কারো কাছে হাত পাততে পারবে না, কোথাও গিয়ে লাইন ধরতে পারবে না এমনকি কোনো সাহায্য সংস্থার কাছে গিয়েও তারা আবেদন জানাতে পারবে না। এসব মানুষগুলোর জন্য কিছু করা যায় কিনা ভাবলাম। কিন্তু কাজটি ছিল কঠিন। আমি ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিলাম মধ্যবিত্তদের ঘরে খাবার পৌঁছে দেয়া হবে গোপনীয়তা রক্ষা করে। যাদের প্রয়োজন আমার ইনবক্সে নক করুন। প্রথমে অনেকেই ব্যাপারটা সহজভাবে নিয়ে নক করতে সাহস পাননি চক্ষু লজ্জার ভয়ে। যখন অনেকেই বুঝতে পারলেন ব্যাপারটি আসলেই কেউ জানবেনা এবং ঘরে খাবার পৌঁছে দিবে তখন বেশ কিছু মানুষ নক করলেন।’

আকাশ আহমেদ এর কাছে এই প্রতিবেদকের প্রশ্ন ছিল- এই ফান্ড কোত্থেকে কিভাবে কালেকশন করলেন? জবাবে তিনি বললেন, কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী, ফেসবুক বন্ধু সহকর্মী এদের অনেকেই এগিয়ে এসেছেন। আমার কৃতজ্ঞতা তাদের প্রতি। কারণ তাদের এই সহযোগিতা না পেলে আমি হয়তো এত মানুষের ঘরে খাবার পৌঁছে দিতে পারতাম না।
প্রতিবেদকের পাল্টা প্রশ্ন ছিল- এই লোকজনের মধ্যে মানুষ যদি ঘরে বন্দি থাকে তাহলে আপনি কেন ঝুঁকি নিয়ে ঢাকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে ঘুরে এভাবে খাবার পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব নিলেন?
স্মিত হেসে তিনি উত্তর দিলেন, মানুষ হিসেবে এই দুর্যোগে কিছু দায়িত্ব কাঁধে নিতেই হবে। আমরা যদি কেউ না কেউ এভাবে পাশে না দাঁড়াযই, তবে এই মানুষগুলোর কষ্ট আরো বেড়ে যাবে। আমাদের সরকারের পক্ষে কখনোই সম্ভব না এভাবে সব মানুষের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেয়া। আমরা যার যার অবস্থান থেকে যদি সবাই মিলে একটু একটু করি তবেই দেখা যাবে আমরাই দুর্যোগ খুব সাহসের সাথে মোকাবেলা করতে পারব। আমার মনে হয়েছে মধ্যবিত্তের এই যে বুকে চাপা পড়া আর্তনাদ এটা আসলে সবার কান পর্যন্ত পৌঁছাবে না। তাই নিজের মত করে কিছু চেষ্টা করা।
তিনি আরও জানান, আমি জানি এটা খুব সামান্যই কাজ বড় কোন কাজ নয়, যদি পারতাম প্রত্যেকটা পরিবারে কমপক্ষে এক মাসের পুরো বাজারটা দিতে, তবেই আরো বেশি ভালো লাগত। তবে মনে হতো যে কিছু একটা করতে পেরেছি। আসলে ইচ্ছেটা বা স্বপ্নটা অনেক বড় তো হতেই পারে; কিন্তু সামর্থ্য নেই সে স্বপ্নটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করার মত।
প্রশ্ন ছিল এত ভালো এই কাজটি করতে কি কোন সমস্যা হয়েছে?
তিনি জানালেন, সমস্যা তো থাকবেই। সমস্যা জেনেই এগিয়ে যাওয়া। ঘরে বসে থাকলেই তো হবেনা। কিছুতো একটা করতে হবে মানুষের জন্য, সমাজের জন্য। মানুষ হিসেবে জন্ম নিয়ে মানুষের পাশে যদি না থাকি, মানুষের কোন উপকারে না আসি তবে লাভ কি? মৃত্যুর পর তো জবাবদিহিতার একটা জায়গা আছে, যেখানে আমাকে দাঁড়াতে হবে। আমি আসলে কারো জন্য কিছু করিনি, যা করেছি আমার নিজের জন্য।
এই হচ্ছেন একজন মানবিক মানুষ আকাশ আহমেদ। যিনি ঢাকা শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত চষে বেরিয়েছেন গত একটি মাস। ফোন নাম্বার এবং ঠিকানা ধরে ধরে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবার কাজটা নিশ্চয়ই খুব সহজ ছিল না। এপ্রসঙ্গে তিনি জানান, ওমর ফারুক সম্রাট এবং সাখাওয়াত হোসেন নামে আরো দু’জন মানবিক মানুষ তার এই বিতরণ কাজের সাথে থেকে তাকে সহযোগিতা করেছেন। এ পর্যন্ত ৫৩২টি পরিবারের কাছে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করেই।
এই মানুষটি যে উদাহরণ তৈরি করেছেন আশা করি তা আমাদের সমাজে অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
বার্তা বাজার/পি.বি