দৌলতদিয়ার পূর্বপাড়ায় হাহাকার

ঈদ আসছে। অথচ দৌলতদিয়ার পূর্বপাড়ায় হৈ হুল্লোড় নেই। চারদিক নীরবতা। কোথাও কেউ নেই, যে ঈদের দিন একটু সেমাই কিনে দেবে নিজের বাচ্চাকে নিয়ে খাওয়াবো। এই যৌন পল্লীর ভেতরে এমন কেউ নেই, যে তার বাচ্চাকে একটি নতুন জামা বানিয়ে দিতে পারবে। কথাগুলো বলছিলেন ঝুমুর বেগম। যৌন পল্লীর তেরশ যৌনকর্মীর সংগঠন অসহায় নারী ঐক্যের সভানেত্রী তিনি।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে পুলিশের পরামর্শে ২০শে মার্চ থেকেই ‘লকডাউন’ করে রাখা হয়েছে গোয়ালন্দ উপজেলায় গড়ে ওঠা ওই পতিতালয়টি।

প্রায় দুই মাস ধরে আয় নেই সেখানকার যৌনকর্মীদের। সরজমিন গিয়ে তাদের দুর্দশার চিত্র দেখা গেছে। যদিও তাদের বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের একটি মানুষকেও না খেয়ে মরতে দেবেন না। যেভাবেই হোক আমরা খাবার পাবোই- প্রতিবেদককে বললেন, ঝুমুর বেগম।

ঝুমুরের নেতৃত্বে তোলা দাবির প্রেক্ষিতে ইসলামিক রীতিতে যৌনকর্মীদের লাশ সৎকার শুরু হয় গত ফেব্রুয়ারিতে। এর মধ্য দিয়েই পাড়ার অবহেলিত নারীদের মুখপাত্র হয়ে ওঠেন তিনি। তার দাবি, করোনা দৌলতদিয়ার যৌনকর্মীদের বুঝিয়েছে অভাব, অনাদরের কী কষ্ট আর অনাহার কাকে বলে।

এই পতিতালয়ে জন্ম নিয়ে বেড়ে ওঠা ত্রিশোর্ধ্ব যৌনকর্মী ঝর্না বলেন, এখানকার তেরশ যৌনকর্মীসহ পনেরোশ মানুষের একই কথা, শেখ হাসিনা এসে আমাদের পাশে দাঁড়াক। মানুষ অনাহারে অনেক কষ্টে আছে। এখনও আমরা অনেক দুঃখের মধ্যে আছি। তবে আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুমুর আপার মাধ্যমে কিছু খাবার পেয়েছি। নিজের তিন ছেলেকে দেখিয়ে পাড়ার ২৪ বছরের পুরানো বাসিন্দা পূর্ণিমা বলেন, এখানকার অনেক মায়েরাই অসহায় অবস্থায় আছেন। প্রধানমন্ত্রী আমাদের নেত্রীর মাধ্যমে কিছু টাকা দিলে কিছু পেতাম। কাঁচাবাজার করে সন্তানদের কিছু অন্তত খাওয়াতে পারতাম।
আমি বুঝবো, কিন্তু বাচ্চারা কিন্তু লকডাউন কি তা বুঝবে না। সে বলবে মা এটা দাও, ওটা দাও। বাচ্চার আবদার যখন মা পূরণ করতে না পারে, তখন কেমন লাগে সেটা সবাই বোঝেন। ঝুমুর বলেন, এই পূর্বপাড়ার মতো আরো অনেক পূর্বপাড়া আছে, এখনও বাংলাদেশের বুকে। সরকার যে ত্রাণগুলো দেয়, তারা সেগুলো সেখানকার মা বোনেরা ঠিকভাবে পায় না। বঞ্চিত থাকে। সমাজে যারা দানশীল, তারা যদি ফকির-মিসকিন হিসেবে আমাদের কিছু দান করতেন তবে আমরা একটু চলতে পারতাম।

১৩ থেকে ১৪ বছর বয়স থেকে যৌনপল্লীতে রয়েছেন ৫৫ বছর বয়সী সালেহা বেগম। তিনি বলেন, এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো। কেউ করোনায় মরবে, আর আমি মরবো ভাতের অভাবে। ৩৬ বছরের পুরানো বাসিন্দা আফরোজা বলেন, কেউ সঞ্চয় করলেও তা ‘বাবুর’ (প্রিয় খদ্দেরের) পিছনেই ব্যয় করে ফেলে। যে কারণে জমানো কোনো টাকা থাকে না আমাদের।
গোয়ালন্দ ঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশিকুর রহমান জানান, সরকারি- বেসরকারি উদ্যোগে মঙ্গলবার পর্যন্ত চার দফা খাদ্য সাহায্য পেয়েছে পূর্বপাড়ার যৌনকর্মীরা। লকডাউন দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে তাদের জন্য আরো সাহায্য চাওয়া হয়েছে।

ঝুমুর আরো বলেন, মানুষের শুধু চাল- তেল-ডাল থাকলেই হয় না। এখানকার মেয়েরা আর কিছু না চাইলেও একটু ভালো খেতে চায়। আগে অধিকাংশ যৌনকর্মী ঘুম থেকে উঠেই দুটো ডিম খেত। এখন রিলিফের চাল ১০ বার ধুয়ে হলেও তারা খাচ্ছে। তবে লকডাউন দীর্ঘ হলে যৌনকর্মীদের অনেক কষ্ট হবে। তাদের জীবনটা যে কীভাবে যাপন করবে বুঝতে পারছিনা।

স্থানীয় ভাতের হোটেলের মালিক আবদুস সামাদ ও কাপড় ব্যবসায়ী রুহুল আমিন জানান, ছোট-বড় ২৩৬টি দোকান আছে দৌলতদিয়ার এই পাড়ায়। গত ১০ই মে থেকে সারাদেশে লকডাউন শিথিল হলেও এখানে মাত্র পাঁচ-ছয়টা দোকান ছাড়া এখনও সব বন্ধ। ৩২ বছর বয়সী মোহাম্মদ সুজন পাড়ার মূল ফটকের কাপড়ের দোকার ও লেডিস টেইলার্সের মালিক। তিনি বলেন, এই জায়গার মেয়েদের কাছেই আমাদের ব্যবসা। করোনার কারণে বৈশাখে বা এই রোজায় তা করতে পারিনি। পাড়ায় ১৫ বছর ধরে হোটেলের ব্যবসা করছেন আব্দুস সাত্তার সরদার। তিনিও বলেন, এইরকম খারাপ অবস্থা কখনো দেখিনি। মুদী দোকানী আব্দুর রশিদ জানান, দোকান খুলে প্রতিনিয়ত পুঁজি হারাচ্ছেন। সবাই শুধু বাকিতে কেনাকাটা করছে। কবে টাকা দিতে পারবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।

যৌনকর্মী কল্পনা বলেন, দোকানদারদের খারাপ ব্যবহার সহ্য করেও বাকিতে কেনাকাটা করতে হচ্ছে। যদিও উন্নয়নকর্মী এবং যৌনকর্মীদের কেন্দ্রীয় নেত্রীদের দাবি, তুলনামূলকভাবে ভালো আছেন যৌনপল্লীর মেয়েরা। যৌনকর্মীদের অধিকার নিয়ে ১৮ বছর ধরে কাজ করছেন উন্নয়নকর্মী সেলিমা সুলতানা। সর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে এক লাখ ২ হাজার ২০৩ যৌনকর্মী রয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, যার মধ্যে ভাসমান আছেন ৪১ হাজার ৩৫০ জন। এছাড়া বাসাবাড়িতে ৩৯ হাজার ৭৮ জন, হোটেলে ১৭ হাজার ৯৭৬ জন এবং যৌনপল্লীগুলোতে ৩ হাজার ৮৫৬ জন পতিতাবৃত্তি করছেন। হিসাবটি ২০১৬ সালের বলে তিনি জানান, বর্তমানে ভাসমান যৌনকর্মীর সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার। করোনা ভাইরাসের কারণে তারাই সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় রয়েছেন।

ভাসমান মেয়েদের অবস্থা খুবই করুণ উল্লেখ করে যৌনকর্মীদের সবচেয়ে বড় সংগঠন সেক্স ওয়ার্কার নেটওয়ার্ক অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক আলেয়া আক্তার লিলি বলেন, লকডাউনে আটকে থাকার কারণে যৌনকর্মীদের আয় একদমই বন্ধ হয়ে গেছে। হাজার হাজার যৌনকর্মী একই সমস্যায় ভুগছেন। অনেকেই জানিয়েছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে তাদের জন্য টিকে থাকাই কষ্টকর হয়ে যাবে। তিনি জানান, ভাসমানদের মতোই কষ্টে আছেন হোটেল এবং বাসা বাড়িভিত্তিক যৌনকর্মীরাও। এই তিন শ্রেণীর যৌনকর্মীরাই সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে পরিচয় লুকিয়ে রাখেন। যে কারণে সরকারি অনুদান বা খাদ্য সাহায্য সংগ্রহ করতে পারে না।

সূত্র: মানবজমিন।

বার্তাবাজার/কে.জে.পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর