কর্মজীবী শেফালীকে ভিক্ষুক বানাল করোনা

করোনায় সবচেয়ে কষ্টে দিন পার করছে খেটে-খাওয়া মানুষগুলো। তেমনি একজন ষাটোর্ধ্ব শেফালী বেগম। স্বামী হাফিজ সর্দারের মৃত্যুর পর থেকে ভেসেই চলেছেন তিনি কচুরিপানার মতো। ১০ বছর আগে সাদা শাড়ি গায়ে ওঠার পর ভেবেছিলেন, বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেবেন। কিন্তু এই বৃদ্ধাকে গ্রহণ করেনি সেখানকার কেউ।

এরপর চাঁদপুরের হাইমচরে স্বামীর ভিটা ছেড়ে ভাসতে ভাসতে শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ায় গিয়েছিলেন দুই ছেলের কাছে। কিন্তু শেফালীকে আশ্রয় দেননি তারাও। উল্টো ১০ মাস গর্ভে ধারণ ধরা প্রিয় সন্তানের কাছ থেকে উপহারস্বরূপ মেলে তিক্ত অভিজ্ঞতা।

এরপর ভাসতে ভাসতে চলে আসেন রাজধানীর পল্লবীর সি-ব্লক মুসলিম বাজার এলাকায় হেলালের বাড়িতে, মেয়ের কাছে। নাতি-পুতি মিলে বিশাল পরিবারে তিনি যোগ হন ১১ নম্বর সদস্য হয়ে। মেয়ের অভাবের সংসার এমনিতেই ‘নূন আন্তে পান্তা ফুরোয়’ অবস্থা, তার ওপর শেফালী বেগম। কষ্টেই পড়ে যান তারা। এতকিছুর পরও জীবনযুদ্ধে হার মানেননি ওই বৃদ্ধা। মাথার ওপর পেয়েছেন একটি নিশ্চিন্ত ছাদ, অন্যের বাসায় ঝিয়ের কাজ করে কোনো রকমে পেটের জোগান দিচ্ছিলেন। কিন্তু শেফালী বেগমের সামান্য সুখটুকুও সয়নি বিধাতার!

করোনাভাইরাস মহামারি মাথাচারা দিয়ে উঠতেই তাকে কাজে যেতে বারণ করে দেন গৃহকর্তী। লকডাউনের কারণে বেকার হয়ে পড়েন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মেয়ে জামাই মোসলেমও। শ্বাসকষ্টে এখন বিছানা নিয়েছেন তিনি। ফলে দীর্ঘ দু’মাস গৃহবন্দি অবস্থায় এক-বেলা, আধা-বেলা খাবার খেয়ে নিদারূণ কষ্টে দিন পার করছে পরিবারটির ১১ সদস্য।

অথচ সরকারের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত কোনো সাহায্যই পায়নি অসহায় পরিবারটি। বিশ দিন আগে ক্ষুধায় যখন চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল, তখন উপায়ান্তর না পেয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হন শেফালী। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এখন পেট চলছে তার মানুষের দুয়ারে দুয়ারে হাত পেতে। প্রতিদিনই তিনি ভেসে চলছেন মহল্লা থেকে মহল্লায়। ক্ষুধার জ্বালায় কর্মজীবী ওই নারী এখন পরিণত হয়েছেন ভিক্ষুকে। দৈনিক মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ৮০ থেকে ১০০ টাকায় কোনো রকমে চলছে তার সংসার।

গতকাল বুধবার দুপুরে মিরপুর পল্লবীর মুসলিম বাজার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জামে মসজিদ কমপ্লেক্সের সামনের ফুটপাতে বসে শেফালী বেগম যখন জীবনের করুণ এ ইতিহাস বর্ণনা করছিলেন, তখন তার দু’চোখ বেয়ে অঝোরে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু। কথার ফাঁকে শাড়ির আঁচলে সে জল মুছে যেন ঢাকার চেষ্টা করছিলেন জীবনের কষ্টগুলো। তার মতো অসহায় ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের পাশাপাশি স্বচ্ছল পরিবারের কাছে জোর আবেদন জানান শেফালী বেগম।

শুধু বয়োবৃদ্ধা এই শেফালী বেগমই নয়, তার মতো কর্মজীবী অসংখ্য নারী-পুরুষকে ভিক্ষুকে পরিণত করেছে মহামারি করোনা। সরকারের দান-অনুদান না পেয়ে ক্ষুধার কাছে পরাস্ত হয়ে এখন ভিক্ষাবৃত্তিকেই তারা বেছে নিয়েছেন পেশা হিসেবে। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় শহরে বাড়ছে ভাসমান মানুষের সংখ্যা। কঠোর লকডাউনেও ঘরে আটকে রাখা যাচ্ছে না তাদের।

ফুটপাত, বাস টার্মিনাল, লঞ্চ টার্মিনাল, রেলস্টেশন এমন কী মহল্লার অলিগলি চষে বেড়াচ্ছেন তারা অন্নের সন্ধানে। ফলে সবার অজান্তে তাদের মাধ্যমে কোভিড-১৯ সংক্রমিত হচ্ছে অথবা অন্যের সংস্পর্শে এসে অসহায় এ মানুষগুলো নিজেরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। এতে করে প্রতিদিনই কোভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির যে সূচক তাতে এ মানুষগুলোর ভূমিকাও যুক্ত হচ্ছে অনাকাঙ্খিতভাবে।

শেফালী বেগম যে এলাকায় থাকেন সেটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের অর্ন্তভুক্ত। এ ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাজ্জাদ হোসেন আজ বৃহষ্পতিবার বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি যেন কেউ ক্ষুধার্ত না থাকে। এ পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে ৪০ টন চাল পেয়েছি।

যা ১৫ হাজার মানুষের মধ্যে ইতিমধ্যে সরবরাহ করা হয়ে গেছে। ত্রাণের অপ্রতুলতার কারণে বাকি ২৫ হাজার মানুষের মাঝে খাবার পৌঁছুনো সম্ভব হয়নি। তাই যারা পাননি তারা তো না পাওয়ার কথা বলতেই পারেন। এখানে আমাদের করার কিছুই নেই।’

কেএ/বার্তাবাজার

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর