করোনা দিনের একজন ইউএনও’র কাজের প্রতি ভালোবাসা

কারো ঘরে খাবার নেই সেখানে ইউএনও। সরকারি খাদ্য সহায়তা বিতরণ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা বিত্তবানদের অসহায়াদের পাশে এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করতেও ইউএনও। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা নিশ্চিত করা, বিদেশ বা আক্রান্ত এলাকা থেকে আগত নাগরিকের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করণ, বাজার মনিটরিং, ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা সব কাজ করেন ইউএনও। সরকারি নির্মাণ কাজের তদারকি সেটিও করছেন একজন ইউএনও। ভয়াবহ করোনার এ দিনেও দিন রাত্রি ছুটাছুটিতে কর্মব্যস্তত যাচ্ছে ময়মনসিংহের ঈশ^রগঞ্জের ইউএনও মো. জাকির হোসেনের।

করোনা দিনের একদিন শিরোনামে ইউএনওর ফেসবুকে একাউন্টে মঙ্গলবার রাতে একটি স্ট্যাটাস দেন ইউএনও মো. জাকির হোসেন। পুরু-দিন রাত্রি কি কি কাজ করেছেন তার একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্ট্যাটাসটিতে। এতে প্রশংসায় ভাসছেন ইউএনও মো. জাকির হোসেন।
স্ট্যাটাসটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে- মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০ টায় সরিষা ইউনিয়নের এনায়েতনগর গ্রামে একটি পরিবার খাদ্য সংকটে ভুগছে খবর পেয়ে পরিবারটিতে খাদ্যসহায়তা ও নগত অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। একই পরিবারটিকে সরকারি মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় আনার নির্দেশ দেয়া হয় সঙ্গীয় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান ভুঁইয়াকে।

ফেরার পথে জাটিয়া ইউনিয়নে কর্মহীন অসহায় ৩০০ পরিবারের মাঝে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ইউএনও। সরিষা থেকে জাটিয়া হয়ে উপজেলা সদরে ফিরতে ১২ টা বেজে যায়। উপজেলা যুবলীগের নেতৃবৃন্দ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী তারাও দলগতভাবে করোনার দুর্যোগে অসহায় ১২০০ মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায়। স্থানীয় ডাকবাংলো চত্বরে খাদ্যসহায়তা বিতরণে ইউএনও ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদ হাসান সুমন, পৌরসভার মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস ছাত্তার, থানার ওসি মোখলেছুর রহমান আকন্দ প্রমুখ।

ডাকবাংলো চত্বরে খাদ্যসহায়তা বিতরণের পর ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভার উদ্যোগে ফায়ারসার্ভিসের গাড়িতে জীবাণুনাশক ছিঁটানো কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়। মুকিযোদ্ধা মোড় এলাকায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা জীবাণুমুক্ত করার লক্ষে কাজ করেন।

বেলা সোয়া ১২ টায় অভ্যন্তরীন বোরো ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। স্থানীয় খাদ্যগুদামে চলতি বোরো মৌসুমে উপজেলার ১১ টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা থেকে ২ হাজার ৬৮৫ মেট্রিক টন ধান লটারিতে নির্বাচিত কৃষকদের কাছ থেকে কেনা হচ্ছে। এছাড়া ১৪ জন লাইসেন্সধারী মিল থেকে ২ হাজার ৬৬৩ মেট্রিকটন সিদ্ধ চাল ও ৩ টি মিল থেকে ৪৪৬ মেট্রিকটন আতব চাল কেনা শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার ধান-চাল ক্রয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ইউএনও হিসেবে সভাপতিত্ব করেন।

খাদ্য গুদাম থেকে বের হয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১০০০ পরিবারে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ইউএনও। বেলা সাড়ে ১২টায় উপজেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় থেকে এ খাদ্য সহায়তা বিতরণ করা হয়।

আকস্মিক ভাবে বেলা ১ টার দিকে ঈশ্বরগঞ্জ থানার সামনে উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ তদারকি করেন। নির্মাণকাজে নিন্মমানের পাথর ও ৬০ গ্রেডের মরিচা পড়া রড ব্যবহার কর হতে দেখা যায়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিন্মমানের সামগ্রী সরিয়ে নিয়ে গুনগত মানসম্পন্ন নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের নির্দেশ দেন ইউনএনও।

এর পর পূর্ব নির্ধারিত একটি প্রোগ্রাম ছিল তাররুন্দিয়া ইউনিয়নে। সেখানেও ৩০০ কর্মহীনদের মাঝে সরকারি খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন দুপুর পৌনে ২ টায়।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে কমিউনিটি কিনিকও গুগুরুপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গ্রামীণ জনসাধারণকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডাররা। সিসিতে নিয়মিত উপস্থিত থেকে সঠিক সেবা প্রদান করছে কিনা তা তদারকি করা হয়। যদিও করোনার কারণে কমিউনিটি কিনিকগুখোলার সময় কমিয়ে বেলা ১২টা পর্যন্ত করা হয়েছে। বড়হিত ইউনিয়নের রাজন্দ্রপুর চৌরাস্তা কমিউনিটি কিনিকে সিএইচসিপিকে পাওয়া না গেলেও স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ করে সেবা নিয়ে তাঁদের সন্তোষ্টির কথা জানা যায়।

দুপুর আড়াইটায় উপজেলার ১১ নম্বর বড়হিত ইউনিয়নে ৩০০ কর্মহীন পরিবারের মাঝে খাদ্য সহায়তা বিতরণ করা হয়। বিতরণ কাজের উদ্বোধন করেন ইউএনও।

এরপর অফিসে ফিরতে ৩ টার বেশি বেজে যায়। অফিস চত্বরে গিয়ে দেখেন গ্রামপুলিশ বাহিনীর সদস্য বৃন্দ উপজেলা পরিষদ চত্বরে অপেক্ষ করছে। যারা এই প্রাণঘাতি করোনার মধ্যেও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে। মাঠ পর্যায়ে বহুমুখী কাজ করা গ্রাম পুলিশদের সুরক্ষর জন্য কেএন৯৫ মাস্ক বিতরণ করা হয়।

এরপর অবশ্য ৬ টা২৫ মিনিট পর্যন্ত অফিসেই দাপ্তরিক কাজ করেন ইউএনও। অফিসে আগত সেবাগ্রহীতাদের নানাবিধ সমস্যা শুনে সমাধান দেয়ার চেষ্টা করেন।

স্ট্যাটাসটি যখন লিখেন তখন ঘড়িতে রাত ১ টা বেজে ৪৫ মিনিট। সরকারি বাংলোর নীচতলা বসে জনপ্রতিনিধি কর্তৃক প্রেরিত মানবিক সহায়তা তালিকা এক্সেল শিটের মাধ্যমে ‘সেন্ট্রাল এইড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সফটওয়্যারের মাধ্যমে আপলোড করার কাজ করছিলেন। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এ কাজে সহযোগিতা করছিলেন।

সকাল থেকে রাত্রির শেষ ভাগ পর্যন্ত করোনার দিনেও কাজ করে চলছেন একজন মানবিক ইউএনও। যা সবার অলক্ষ্যে থেকে যায়। স্ট্যাটাসটিতে কমেন্টে ঝধনরনঁৎ ঐধংধহ ঝযধশরষ নামে এক ব্যক্তি লেখেন -‘এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে আপনার মত একজন সৈনিক পেয়ে আমরা ঈশ্বরগঞ্জ বাসী গর্বিত । আল্লাহ পাক আপনাকে সুস্থতা সহ নেক হায়াত দান করুক সেটাই কামনা করি।’

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক কমান্ডার হাবিবুর রহমান হলুদ লেখেন- ‘আমরা জানি বিশেষ শব্দটি বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, আল্লাহ্ বিশেষ শক্তি ও সাহস দিয়ে, করোনার এ মুহূর্তে উনাকে আমাদের মাঝে করুনা করে পাঠিয়েছেন। আল্লাহ্ উনার সহায় হোন।’

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন বলেন, তিনি নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালনের চেষ্টা করছেন। কর্মক্ষেত্রের জন সাধারণ যেনো ভালো থাকে সে জন্য দিন রাত্রি এই ছুটেচলা।

বার্তা বাজার/এম.সি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর