জলে নামার আগে নেংটি খোলা

হ্যাঁ আমার মা ছোট বেলায় ভয়ে বা অলসতার কারণে কোন কাজ করতে না চাইলে জুজুর অজুহাত দেখাইলে এই কথাটা প্রায়ই বলতেন জলে নামার আগে নেংটি খুলে বসে থাকলে চলবে না। এটা এক ধরনের অজ্ঞানতা বা বিষাদ যোগ। আসলে আমরা সবাই বিষাদগ্রস্ত!

এই পোস্টের প্রসংগ বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের অনলাইন ক্লাশ।খুব ছোট একটা উদাহরণ দিয়ে শুরু করি- কিছু দিন আগে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের আয়োজনে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে ঐ বিভাগের প্রায় ৩০০ জন ছাত্র-ছাত্রীর অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। উক্ত বিভাগের সম্মানিত শিক্ষক মহোদয়গণ জানেন শেষ পর্যন্ত কতজনের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। যাই হোক, শতভাগ উপস্থিতি প্রত্যাশা করা ঠিক না, ব্যক্তিগত সমস্যা থাকতেই পারে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা থাকা উচিৎ নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আইটি পরিসেবা বা অবকাঠামো বিবেচনায় অনলাইনে পাঠদান শেষ করে পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়টি এই মূহুর্তে শতভাগ যৌক্তিক নয় বলে আমি মনে করি। তাই বলে কি নেংটি খুলে বসে থাকব আর ঢেউ দেখে আতঙ্কিত হয়ে হা-হুতাস করব বা উদ্যোগক্তাবৃন্দের দোষারোপ বা সমালোচনায় ব্যস্ত থাকব?

আসুন ভাবনাটাকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করি।

দুঃখিত, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উদাহরণ দিতে হচ্ছে- Dept. of Bio and Brain Engineering, KAIST, South Korea তে পড়া-লেখা করার সময় আমার পিএইচ.ডি. সুপারভাইজার একটা কথা বলতেন (Be Effective and Efficient) কার্যকর এবং দক্ষ হতে হবে। যদি আমরা আমাদের চেয়ে উন্নত কারো তুলনায় কিছু সময় পিছিয়ে থাকি তাহলে এই “Be Effective and Efficient ধারণাটি খুবই কার্যকরী। যেমন আমরা প্রায় বলি অমুক দেশের তুলনায় আমরা এত বছর পিছিয়ে আছি। সেক্ষেত্রে তাদের সমতূল্য হতে হলে আমাদের অবশ্যই Effective and Efficient হতে হবে। সেখানে ক্রেডিট সিস্টেমের কারণে প্রতিটি ক্লাশ লেকচারের ব্যপ্তি ছিল দুই ঘন্টা। লেকচার বিষয়বস্তু তিনদিন আগেই কোর্স ওয়েব পেজে প্রকাশ করা হত। উদ্দেশ্য ছাত্র-ছাত্রীরা পরবর্তী ক্লাশের বিষয়ে একটা প্রাক ধারণা নিয়ে আসবে যাতে ক্লাশটি Effective and Efficient হয় অর্থাৎ সীমিত সময়ে একটি কোর্সের বিস্তারিত বিষয়বস্তু পাঠ দান বা গ্রহণ করা সম্ভব হয়।

আমাদের কিছু হাইপোথিসিস ভাবনা:

হাইপোথিসিস-০১: আমরা এই মূহুর্তে অনলাইনে ক্লাশ নিয়ে কোর্সের পাঠদান শেষ করব।

হাইপোথিসিস-০২: আমাদের সকল ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক বা তারা ক্রেডিট (যেমন উপস্থিতি বা শিক্ষা) বৈষম্যের শিকার হবে।

হাইপোথিসিস-০৩: অনেক শিক্ষার্থী বলেছেন আমার বন্ধুকে বঞ্চিত করে আমি অনলাইন ক্লাশে অংশগ্রহণ করতে পারি না ইত্যাদি।

হাইপোথিসিস-০১: এর কথায় আসি “আমরা এই মূহুর্তে অনলাইনে ক্লাশ নিয়ে কোর্সের পাঠদান শেষ করব”- বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক অবস্থা, ইন্টারনেটের গতি ও মূল্য এবং অবকাঠামো বিবেচনায় সকল ছাত্র-ছাত্রীর অনলাইনে পাঠদানের সুযোগ প্রদান করা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে সম্ভব না। করোনা পরিস্থিতিতে আমরা শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তব কারণে পিছিয়ে যাচ্ছি, এটায় বাস্তব সত্য। কারণ আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ কর্ণধার শিক্ষার্থীদের কোন রকম স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিতে চাই না। নিশ্চিতভাবে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে তাদেরকে সুরক্ষিত রাখা আমার, আপনার তথা দেশের দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে আমি মনে করি। অনলাইনে ক্লাশ প্রদান বা পাঠদানে ছাত্র-ছাত্রীদের বিষয়টি না ভেবে নিজের বিষয়ে একটু ভাবুন। এক্ষেত্রে আপনার ক্লাশ মিথস্ক্রিয় হল কিনা সেটা ভাবার দরকার নাই। এজন্য আপনার Zoom Apps বা অন্য কোন Interactive Classroom আইটি প্রযুক্তির বিষয়ে ভাবার কোন যুক্তি নাই। আপনি খুব সহজেই Facebook Live প্রযুক্তি ব্যবহার করে লেকচার ভিডিও প্রস্তুত করুন এবং সামর্থ্যবান কিছু ছাত্র-ছাত্রীদের মতামতের অপেক্ষা করুন। ছাত্র-ছাত্রীদের মতামতের ভিত্তিতে লেকচারসমূহ সহজবোধ্য এবং পরিমার্জিত করুন। এভাবে নির্দিষ্ট সংখ্যক লেকচার প্রস্তুত করে ছাত্র-ছাত্রীরা নয়, আপনি নিজেই আপনার কোর্সটি সম্পন্ন করুন। এই ডিজিটাল লেকচারগুলো আপনার অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। উপযুক্ত এবং স্বাভাবিক সময়ে আপনার কোর্স লেকচারগুলো ছাত্র-ছাত্রীদের সহজপ্রাপ্য হবে। শ্রেণীকক্ষে পাঠ গ্রহণের আগেই এ বিষয়ে প্রাক ধারণা অর্জন করতে পারবে। আপনিও একজন গর্বিত শিক্ষক হিসাবে খুব দ্রুত সময়ে আনন্দদায়ক পরিবেশে আপনার কোর্সটি পাঠদানে সক্ষম হবেন। একবার বিবেচনা করুন আপনি কোর্সটি শেষ করছেন ঠিকই কিন্তু সেটা ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য, নাকি আপনার জন্য, নাকি সময় এগিয়ে নেওয়ার জন্য।

হাইপোথিসিস-০২: এর কথায় আসি, “আমাদের সকল ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক বা তারা ক্রেডিট (যেমন উপস্থিতি বা শিক্ষা) বৈষম্যের শিকার হবে” সকল মা চায় তার রান্নাটা সুস্বাদু (সকল মসলা পরিমিত এবং যথা সময়ে প্রয়োগ করে রান্না করা হলে অবশ্যই সুস্বাদু হবে) এবং পরিবেশনটা যেন সুন্দর হয়। একটু ভিন্ন ভাবে ভেবে দেখুন! আপনি কোন কোর্সের যে লেকচারটি পাঠ দান করবেন, সেই লেকচারটি আইটি মাধ্যমে (যেমন ফেসবুক লাইভ) কিছু ছাত্র-ছাত্রীর টেস্ট করার জন্য একবার প্রচার করুন। তাদেরকে কমেন্ট বা মতামত প্রদানের সুযোগ দিন। তারা অল্প কয়েকজন শতকরা ১০ জনও যদি হয় বাকি শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করবে। বুঝতে জটিল এবং অসংগতিপূর্ণ বিষয়সমূহ নিয়ে মতামত প্রদান করবে। আপনি সেই মতামতের ভিত্তিতে আপনার লেকচার পরিশুদ্ধ করে নিন। স্বাভাবিক সময়ে সকল ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতিতে শ্রেণি কক্ষে তাদের উৎসাহ এবং ধন্যবাদ দিন এবং সহজ বোধগম্য, সুশৃঙ্খল এবং আনন্দদায়ক পাঠদানে উজ্জীবিত হওয়ার প্রচেষ্টা করুন। ছাত্র-ছাত্রীদের ক্রেডিট (যেমন উপস্থিতি বা শিক্ষা) বৈষম্যের শিকার হওয়ার কি কোন ক্ষেত্র আছে? নিজেই বিবেচনা করুন।

হাইপোথিসিস-০৩: এর কথায় আসি, “অনেক শিক্ষার্থী বলেছেন আমার বন্ধুকে বঞ্চিত করে আমি অনলাইন ক্লাশে অংশগ্রণ করতে পারি না ইত্যাদি” গণ-ভোজে খাবার পরিবেশনের আগে চেখে বা টেস্ট করে নিতে হয় এটা আমাদের প্রচলিত চর্চা। তোমার কোন বা কিছু সংখ্যক বন্ধু (ধরে নিচ্ছি ৮০%) আইটি সুবিধা বঞ্চিত হওয়ার কারণে অনলাইন ক্লাশে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। তুমি কেন তাদের প্রতিনিধি হয়ে অংশগ্রহণ করবে না? পাঠ গ্রহণে বা পাঠ্যবিষয় বোধগম্য হতে তোমার যে সমস্যা হবে নিশ্চয়ই সেগুলো তোমার বন্ধুদেরও সমস্যা হবে। তোমার শিক্ষক যখন অনলাইনে (ধরে নিলাম ফেসবুক লাইভে) ক্লাশ নিলেন তোমার কাছে যে যে টপিক বুঝতে সমস্যা বা অসঙ্গতি আছে বলে মনে হয়েছে, সেগুলো কমেন্ট করে উক্ত শিক্ষককে জানাতে পার। পরবর্তীতে স্বাভাবিক সময়ে শ্রেণিকক্ষে উক্ত স্যার যখন বুঝতে সমস্যাপূর্ন এবং অসংগতিপূর্ণ বিষয়গুলো সমাধান বা পরিস্কার করে পাঠ দান করবেন, উক্ত ক্লাসটি কি Effective and Efficient হবে না? তাহলে তোমার এই ভাবনাটা কতটা যুক্তি সংগত যে তুমি অনলাইন ক্লাশে অংশগ্রহণ করে তোমার অন্য বন্ধুদের বঞ্চিত করছ, নাকি সকলের উপকার করছ? একবার চিন্তাটা পরিবর্তন করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

পরিশেষে বিনীত অনুরোধ জানাই, জলে নামার আগে নেংটি না খুলে, আতঙ্কিত বা হা-হুতাস না করে, চিন্তাটা একটু ঘুরিয়ে সকলকে ইতিবাচক হতে।

লেখক : অধ্যাপক ড. পরেশ চন্দ্র বর্ম্মন।
অধ্যাপক, আইসিটি বিভাগ ও প্রক্টর, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

(ফেসবুক ওয়াল থেকে সংগৃহীত)

* প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বার্তা বাজার-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বার্তা বাজার কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

বার্তা বাজার/এম.সি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর