তিন দিনের শিশুকন্যা মিম জান্নত। বাবা মহম্মদ ইলিয়াস এখনও মেয়ের মুখ দেখেননি। লকডাউনের জেরে ভিন্ রাজ্য থেকে ফিরতেই পারেননি। জান্নতের মা রুপালি বিবি হাসপাতালে। স্ত্রী, কন্যার চিন্তায় ডোমকল থেকে প্রায় ৯৫০ কিলোমিটার দূরে ঘুম উড়েছে মহম্মদ ইলিয়াসের।
বছর পঁচিশের যুবক ইলিয়াস। পরিযায়ী শ্রমিক। অভাবের সংসারের হাল ধরতে দুই ভাই, ইলিয়াস ও শাহিন, ভারতের মুর্শিদাবাদের ডোমকলের প্রত্যন্ত গ্রাম কুপিলা থেকে কেরলে কাজ করতে গিয়েছিলেন। স্ত্রী সন্তানসম্ভবা বলেই ২২ মার্চ বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন ইলিয়াস। সঙ্গে গ্রামেরই আরও ৩৮ জন শ্রমিক। মাঝরাস্তায় আটকে পড়েন।
গত ৪১ দিন ধরে ছত্তিশগড়ের বিলাসপুর রেল স্টেশনে আটকে আছেন ইলিয়াস–সহ বাংলার ৩৯ জন পরিযায়ী শ্রমিক। ডোমকলের এক বেসরকারি নার্সিংহোমে তিন দিন আগে কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন রুপালি বিবি। সিজার হয়েছে। তার পর থেকে নানা সমস্যা। ঘন ঘন জ্ঞান হারাচ্ছেন। দিতে হয়েছে রক্তও। এমন কঠিন সময়ে পরিবারের পাশে থাকতে না–পারার যন্ত্রণা কুরে–কুরে খাচ্ছে ইলিয়াসকে। বিলাসপুর থেকে ফোনে ইলিয়াস জানালেন, ‘পাঁচ দিন আগে যখন স্ত্রী প্রসববেদনায় কাতর, কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। ৪০ দিন পেরিয়ে গেল বিলাসপুরে আটকে। আর কত দিন এভাবে আমাদের থাকতে হবে, বলতে পারেন? কবে আমাদের জন্য ট্রেন আসবে কে জানে!’
ডোমকল থেকে ইলিয়াসের মা শাহনাজ বিবি জানালেন, ‘লকডাউনের ফলে এক ছেলে আটকে বিলাসপুরে। আরেক ছেলে কেরলে। ওদের আয়ে তো সংসারটা চলে। কাজও নেই ওদের। এখন চরম আর্থিক সঙ্কটে পড়েছি। সামান্য একটু জমি ছিল। তাও বন্ধক দিতে হয়েছে সিজারের টাকা জোগাড় করতে। অভাবের সংসারে এ ছাড়া কোনও উপায় ছিল না।’
এদিকে বিলাসপুরের আটকে–থাকা পরিযায়ী শ্রমিকদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে। কেননা একই আশ্রয় শিবিরে থাকা ঝাড়খণ্ডের ১০ শ্রমিককে রবিবার বাসে করে ফেরত নিয়ে গেছে। এর পরই নদিয়া–মুর্শিদাবাদের শ্রমিকেরা চিন্তায় পড়েছেন।
তাদের বক্তব্য, বিদেশ থেকে ভারতীয়দের আনতে বিমান পাঠানো হলেও, দেশের দিনমজুরদের ঘরে ফেরাতে এত টালবাহানা কেন? কেনই–বা শ্রমিকদের ফেরাতে ট্রেনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে না? ফোনে আজাদ সরকার বললেন, ‘বিলাসপুর প্রশাসন তিন থেকে চারবার আমাদের নাম–ঠিকানা সব লিখে নিয়ে গেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।’ রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, রাজস্থানের আজমেঢ়, কেরল থেকে শ্রমিক স্পেশ্যাল ট্রেন রাজ্যে আসছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আটকে–থাকা শ্রমিকদের ধাপে ধাপে ফেরাতে আরও ট্রেন চাওয়া হচ্ছে রেল মন্ত্রকের কাছে।
বার্তাবাজার/কে.জে.পি