করোনায় দিশেহারা সিরাজদিখানের পুদিনা চাষিরা, ক্ষতি প্রায় দুই কোটি টাকা

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিশ্বব্যাপী যেমন মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে তদ্ররূপ ধস নেমেছে কৃষিখাতেও। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকের ওপর করোনার আঘাত মারাত্মক ভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে। মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলায় কৃষি ও কৃষকের সমস্যা ও দুর্দশার ব্যাপারে কৃষিঅফিস প্রায় নীরব। উপজেলার বালুচর ইউনিয়নের চান্দের চর খাসকান্দি মদিনা পাড়া এলাকায় রোজাকে সামনে রেখে প্রায় দুইশ বিঘা জমিতে চাষ করা পুদিনা পাতা ব্যবসায়ী কৃষক থেকে শুরু করে দুই হাজার শ্রমিকের ঘরে মারাত্মকভাবে অভাব দেখা দিয়েছে। বিঘার পর বিঘা জমিতে চাষীরা পদিনাপাতা চাষ করলেও প্রাপ্য মজুরি হতে বঞ্চিত হচ্ছেন এই রোজার মাসে। পুদিনা পাতা বিক্রি করার এবং বেশী লাভবান হবার মোক্ষম সময় এই মাহে রমজানের মাস। অথচ করোনার মহাদুর্যোগের কারণে উপজেলার এইসব জমিনেই পচে শেষ হচ্ছে প্রায় দুইশ বিঘা জমির পুদিনা পাতা।

মোঃ বারেক বেপারী বলেন, শুধুমাত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে তিনমাসে পুদিনাপাতার জমিনে কাজ করে অন্য জেলা সহ অত্র এলাকার প্রায় একহাজার শ্রমিক। সর্বমোট তিন মাস সময়ের মধ্যে পুদিনা পাতা বিক্রি উপযোগী করে তুলেন কৃষক শ্রমিকরা। এলাকার দুইশত বিঘা পুদিনা পাতার জমিনে প্রতিদিন ঘরে একহাজার শ্রমিক কাজ করে যারা সংসার চালায় সেই শ্রমিকের ঘরে ঘরে এখন কান্নাররোল। পুদিনা বিক্রি হচ্ছেনা শ্রমিকদের ও কাজে নেওয়া হচ্ছেনা। এছাড়া করোনায় লকডাউনে বিভিন্ন জায়গায় থেকে আশা শ্রমিকরা যখন আটকে পড়েছে ঘরে। অন্যদিকে পুদিনাপাতা পরিচর্যায়হীন হয়ে নষ্ট হয়েছে জমিনে। এবং শ্রমিকরা কাজ করতে না পেরে অনাহারে অর্ধাহারে মরছে। এছাড়া অন্য জেলার শ্রমিকরা করোনার কারণে চলে যেতে হয়েছে তাদের নিজ নিজ জেলাতে।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, পবিত্র মাহে রমজান কে সামনে রেখে সিরাজদিখান উপজেলার বালুচর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে পায় দুইশত বিঘা জমিতে ব্যাপক ভাবে চাষ হয় পুতিনাপাতা। উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানাযায় বিগত দিনে উপজেলার শুধুমাত্র বালুচর ইউনিয়নেই পুদিনাপাতা চাষবাস হতো, তবে সেটা ছিলো সীমিত আকারে। কিন্ত এখন মাহে রমজান কে সামনে রেখে তারা ব্যাপক লাভবান হওয়ায় সেটা কয়েকশ বিঘাতে পরিণত হয়েছে বলে জানান। কৃষক দিল মোহাম্মদ বলেন, আমরা শুধু রমজান মাসে পদিনা বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা ইনকাম করি। এক বিঘা পুদিনা পাতার টাকা দিয়ে আমরা ১০ বিঘা জমিনের ধান কিনতে পারি। আমাদের এখানে পুদিনাপাতার যাত দুই তিন পদের হলেও এখানে স্থানীয় দেশি জাতের পুদিনাই চাষ হয় বেশী। এবার এখানে দুইশত বিঘা জমিতে পুদিনা পাতা চাষ হয়েছে । প্রতি বিঘাতে শুধু লাগানোর পর পরিচর্যা করে বিক্রির উপযুক্ত করে তুলতেই খরচ হয় ৫০ হাজার টাকা, আর এই প্রথম ধাপের ৫০ হাজার টাকাই আমাদের বড় লোকসান, শ্রমিক সংকটে আর যানবাহন চলাচল না করার কারণে আমরা সময় মতো পুদিনা বাজারজাত করতে পারছিনা।

জানা যায় বেশী লাভের আশায় শুধুমাত্র রমজান মাসের জন্যই বেশী উদপাদন করা হয় পুদিনাপাতা। এক বিঘা জমির পুদিনাপাতা ৫০ হাজার খরচ হলেও যদি ঠিক মতো বিক্রি করা যায় তাহলে শুধুমাত্র এক বিঘা পুদিনা বিক্রি হতো দুই লক্ষ টাকা। কিন্ত এই মহামারীর করোনার কারণে ক্ষেতের পুনিদা ক্ষেতেই পচে যাচ্ছে। এই পুদিনা চাষের সাথে জড়িত এখানকার ৭০/৮০ জন কৃষক ও ২৫ জন বেপারী সহ তাদের পরিবার এখন রাস্তার ভিখারি।

কৃষক ফিরোজ মিয়া বলেন, শুধু মাত্র পুদিনা লাগানোর খরচই দুইশত বিঘা জমিনে ১ কোটি টাকা লোকসান। দেশের এই অবস্থায় এখন বিক্রি ও হচ্ছেনা পুদিনা পাতা তাই জমিনে অন্য কিছু চাষও করা যাচ্ছেনা এখন পুনরায় শ্রমিক নিয়ে এগুলো কেটে ফেলতেও খরচ আছে বিঘা প্রতি ১৫ হাজার টাকা ।

ছলিমুল্লাহ বেপারি বলেন, আমাদের এখানকার পুদিনা পাতা পাইকারি ভাবে শ্যাম বাজার কাওরান বাজার যাত্রাবাড়ী বিক্রি হতো। ঢাকার আশেপাশের এলাকাতে এগুলোর চাহিদা খুব বেশী যেমন মিরপুর সহ শহরের আনাচে কানাচে আমাদের এই পুদিনা পাতা বিক্রির জন্য শুধুমাত্র ঢাকাতেই ছিলো দুই হাজার হকার যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করতো এখন তারাও অনাহারে মরছে।

উপজেলা কৃষিকর্মকর্তা সুবোধ চন্দ্র জানায়, মুন্সীগঞ্জের শুধুমাত্র সিরাজদিখান উপজেলার বালুরচর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৭ হেক্টরের অধিক জমিতে পুদিনা পাতার চাষ হয়। বিশেষ করে চান্দের চর, খাস্কান্দি ও মদিনা পাড়ায় ব্যাপক হারে পুদিনার চাষ করা হয়। পুদিনার অনেক জাত রয়েছে। এর মধ্যে পিপারমেন্ট, স্পিয়ার মেন্ট ওঅ্যাপেল মেন্ট হলো পুদিনার সবচেয়ে উন্নত জাত।

জাপানি অরিজিন হলো আমাদের দেশের আবহাওয়ার সাথে সহনশীল। করোনার কারণে দেশের অধিকাংশ জায়গাই লকডাউনে আছে ।রোজার মাসই হলো পুদিনাপাতার মাস। ঢাকা সহ আশেপাশের শহরগুলোতে ইফতারের প্রধান সামগ্রী এই পুদিনাপাতা কিন্ত এই করোনা সব শেষ করে দিলো।

বার্তা বাজার/এম.সি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর