বিকেল হতেই খাবার বানিয়ে, রেঁধে বেড়িয়ে পড়ছেন। রোদ, বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষের মাঝে ইফতার পৌঁছে দিচ্ছেন। নিজে সনাতন ধর্মাবলম্বী হলেও মুসলমানদের পবিত্র এই মাসে রোজাদারদের মুখে হাসি ফোটাচ্ছেন। করোনার প্রাদুর্ভাবে অর্থ সংকটে যাদের মুখে অন্ন তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। তিনি ছাত্রলীগ নেত্রী। নাম, তিলোত্তমা শিকদার।
ঘটনাটি গত কয়েকদিনের। একদম অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চিত্র। এমন একটি বাংলাদেশের চেতনা নিয়েই এই দেশটির জন্ম। যেখানে ধনী-গরীব, জাত-ধর্ম নির্বিশেষে একটি সুন্দর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ হবে। তিলোত্তমা তারই সচিত্র, সুন্দর উদাহরণ।
এবারের রমজান একইসাথে ভিন্ন ও বিশেষ। এবারই প্রথম, মসজিদে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। ঘরে নামাজ-তারাবি হচ্ছে। ইফতার কেন্দ্রিক রাজনীতি, অর্থনীতি প্রায় বন্ধ। বেশিরভাগ কর্মসংস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। একদম ঘরবন্দী জীবন, যা এবারই প্রথম। অন্যদিকে, ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে ভাবলে, স্রষ্টাকে সময় দেওয়ার এখনই ভালো সময়৷ পরিবার ও নিজের জন্য সুন্দর সুন্দর মুহূর্ত তৈরিতে রয়েছে যথেষ্ট সময়। একইসাথে, অসাম্প্রদায়িক ভাবনায় যেকোনো ধর্মের পাশে দাঁড়ানোর এখনই ভালো সময়। এদিক দিয়ে বিশেষ।
প্রতিবছর, মসজিদে সাধারণের জন্য ইফতার হতো। কিছু মানুষ সেখানে ইফতার করতো। সামর্থবানরা ইফতারি দিতেন। এবার সেসব বন্ধ। রমজান-ঈদ এলেই জাকাতের লম্বা লাইন লাগে। এবার হবে কিনা কেউ জানেনা। হলেও অনেক বিত্তবান আর এবার বিত্তশালী থাকবেন না। অর্থনৈতিক অতিমারিতে পূর্বের অবস্থায় থাকবে না অনেকেই। সিএসআর বা পিআর থেকেই অনেক প্রতিষ্ঠান থ্রি বা ফাইভ স্টারে করপোরেট ইফতার করে থাকে, এবার তাও বন্ধ। কিছু চাকরিজীবীও ভালো আছেন। ঠিকঠাক বেতন পাচ্ছেন। বেতন কমছে না, আটকেও নেই। এদিকে, বাইরে যেতে হচ্ছে না বলে অনেকধরণের খরচ বেঁচে যাচ্ছে। মাস শেষে সঞ্চয় হচ্ছে ভালোই।
রাজনৈতিক ইফতার, সামাজিক ইফতার বা বন্ধু ও পারিবারিক ইফতারে বিশাল পরিমাণ অর্থ খরচ হতো। এসবের প্রায় বন্ধ। বেঁচে যাচ্ছে বেশিরভাগ টাকাই। এসবের অনেক টাকাই করোনা পরবর্তীতে পরিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বহাল রাখতে বা তৈরি করতে কাজে দিবে। তবে, এখান থেকেও কিছু করে অর্থ দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো গেলে মন্দ হয় না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, দেশের ইফতার বাণিজ্য টাকার অঙ্কে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। হিসাবটা সহজ। দেশের ৮৮.৪ শতাংশ মুসলিম। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীও যদি রোজা রাখে৷, তাহলে সেই সংখ্যা ৮ কোটির বেশি। তবে বাচ্চা, অসুস্থরা যেহেতু ইফতারেও থাকেন। বা রোজা না রাখলেও ইফতারে সামিল হোন বেশিরভাগই। তাই ধরা হয় ৮৫ শতাংশ মানুষ সরাসরি ইফতারে সম্পৃক্ত হোন। সাড়ে তেরো কোটির উপরে মানুষ প্রতিদিন গড়ে ৩০ টাকা করে খরচ করলেও দৈনিক ৪০০ কোটির উপরে খরচ হয়। মাসে ১২ হাজার কোটির উপরে এই খাতে খরচ। প্রতিবছর জাকাত-ফেতরা দেওয়া হয় প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার। সিএসআর এসব হিসেব বাদ দিলাম। এর, ৩০-৫০ শতাংশ এই বছর মানুষের পিছনে খরচ করলেও সেই অর্থের পরিমাণ দিয়েই দেশের ৫ কোটি মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। তাই, চলুন। প্রতিবছর ইফতারে যে বাড়তি খরচ করতাম, তা দিয়ে কিছু মানুষের পাশে দাঁড়াই। ইফতার করাই। সিএসআর, পিআর থেকে করপোরেট প্রতিষ্ঠান খরচ করতে পারে। রাজনৈতিক সংগঠন, সামাজিক সংগঠন এই সময়ে পাশে প্লিজ পাশে দাঁড়ান। চাল-ডাল দ্রব্যাদি কিনে দেন। মুসলিম ছাড়াও এদেশে অসংখ্য ধর্মের মানুষ আছে। এতদিনে তাদেরও অন্ন শেষ হয়তো, তাদের পাশে দাঁড়ান। জাকাতের অর্থ বিত্তবানরা দান করুন। ভালো হয়, এমনকিছু কিনে দেওয়া, যার মাধ্যমে পরবর্তীতে আয় করে খেতে পারে। প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষও করা যেতে পারে। কেবল, করপোরেট প্রতিষ্ঠানই প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা জাকাত দেয়। সেখানের অর্থও এখন খরচ হতে পারে। এতে, করোনা পরবর্তী সংকট মোকাবিলায় তারাও অবদান রাখতে পারবে।
গবেষণার একটি কাজে সাতক্ষীরা গিয়েছিলাম। সেখানে সমাজ যাদের দলিত হিসেবে ধরে, তাদের অনেকের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। ঘুরে ঘুরে এলাকা দেখেছিলাম। কেবল সাতক্ষীরাতেও ২৭ এর উপরে দলিত শ্রেণির গোষ্ঠী বাস করে। কি নিদারুণ কষ্ট তাদের। এমনে সময়েই তাদের পাশে তেমন কেউ থাকে না। এখন তাহলে কি অবস্থা তাদের? তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
তিলোত্তমা শিকদার যেভাবে মুসলিমদের পাশে আছে। তেমনই মুসলিমদেরও মুসলিমদের পাশে দাঁড়াতে হবে। অন্যান্য ধর্মালম্বীদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এদেশে মুসলিম সংখ্যা বেশি৷ সংখ্যায় বেশি বলেই ধনী-গরিব সব সংখ্যাতেই মুসলিম সংখ্যা বেশি। এগিয়ে আসতে হবে এই বেশিকেই।ধর্ম-মতের বাইরে সকলের পাশে থাকতে হবে। এক্ষেত্রে, কেউ সরাসরি সহযোগিতা করতে পারে। কেউ অর্থ দিয়ে করতে পারে। নিজে যেয়ে দেওয়া যেতে পারে। দূরের হলে, যারা তাদের নিয়ে কাজ করছে তাদের টাকা পাঠানো যেতে পারে। আর, পুরো বাংলাদেশেই এই অবস্থাটা তৈরি করতে পারলেই দেশজুড়ে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চিত্র দেখবো। তখন মনে হবে, করোনা দুঃখ, কষ্টের সাথে সাথে একটি সুন্দর অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়তে সাহায্যও করেছিলো।
লেখা: হামিমুর রহমান ওয়ালিউল্লাহ
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
বার্তা বাজার/এম.সি
*প্রকাশিত মুক্তমত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বার্তা বাজার-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বার্তা বাজার কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।