‘পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব’ রচনা পড়ে এমন মানুষ খুব কমই আছে কিন্তু বিশ্বায়নের এ যুগে সময়ের সাথে সাথে এ কর্তব্য গুলো ভুলে যাচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে পশ্চিমা অনুকরণে একক পরিবারের দিকে ধাপিত হচ্ছি, সঙ্গে পারিবারিক দায়-দায়িত্ববোধ ভুলে গিয়ে পিতা-মাতার ভরণপোষণ করছে না।
অথচ জীবজগতে যত প্রানী আছে তার মাঝে একমাত্র মানব সন্তানকে জন্ম থেকে সাবালক করা পর্যন্ত মা-বাবাকে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।
পিতা-মাতাকে প্রাধান্য, শ্রদ্ধা ও সেবা-যত্ন করার ব্যাপারে বিভিন্ন ধর্মে বিভিন্ন নির্দেশনা পাওয়া যায়। ইসলাম ধর্মে, মাহান আল্লাহ বলেন: তোমার পালনকর্তা আদেশ করছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার কর।
তাদের মধ্যে একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবনদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে উহ! শব্দটিও বল না এবং তাদেরকে ধমক দিও না এবং তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বল। তাদের সামনে ভালবাসার সাথে নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বল, হে পালনকর্তা! তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশককালে লালন-পালন কবেছে–বনী ইসরাঈল। (আয়াত ২৩-২৪)। অর্থ্যাৎ পিতা-মাতার সাথে নম্র আচরণ করা, সেবা-যত্ন করতে বলা হয়েছে।
তারা বার্ধক্যে উপনীত হলে কোন রুঢ় কথা না বলা বা ধমক না দেওয়ার আদেশ করা হয়েছে। তাদের সে ভাবে সেবা-যত করা উচিত যেভাবে তারা শৈশবকালে তোমার সেবা-যত করেছেন। ভুলে গেলে হবে না যে, প্রথমে তারা নিঃস্বার্থভাবে তোমার সেবা-যত্ন করে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছে। বার্ধক্যে তাদের যত যত্ন নেওয়াই হোক না কেন তাদের সমকক্ষ হওয়া সম্ভব নয়।
কিন্তু বাস্তবে বৃদ্ধ পিতা-মাতার কাছ থেকে একটু কষ্ট পেলে বা বকাঝকা শুনলেই তাদের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে যায় সবাই । বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যায়, ইচ্ছাকৃতভাবে পিতা-মাতাকে ছেড়ে একা থাকা বা পিতা-মাতার ভরন-পোষণ না করার প্রবণতা অস্বাভাবিক ভাবে বেড়েছে।এই পরিস্থিতিতে পিতা মাতার ভরন পোষন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার ২০১৩ সালে “পিতা-মাতার ভরন পোষন আইন ২০১৩” পাশ করেন।
পিতা-মাতার ভরণপোষণ কি?
পিতা-মাতার ভরণ পোষণ আইন ২০১৩-এর ৩ ধারা অনুযায়ী, ভরণপোষণ বলতে খাওয়া-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বসবাসের সুবিধা এবং সঙ্গপ্রদানকে বোঝানো হয়েছে। প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতামাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। সন্তান বলতে সক্ষম ও সামর্থ্যবান ছেলে ও কন্যা উভয়কেই বোঝানো হয়েছে।
একাধিক সন্তান থাকলে সন্তানদের নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। আরো বলা বলা হয়েছে, কোনো সন্তান তার বাবা বা মাকে অথবা উভয়কে তার বা ক্ষেত্রমতো তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধ নিবাস কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদাভাবে বাস করতে বাধ্য করতে পারবে না।
ভরণ-পোষণের পরিমাণ:
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইনের ৩ এর (৭) অনুযায়ী, কোনো পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে, সন্তানদের সাথে বসবাস না করলে অর্থাৎ পৃথকভাবে বসবাস করলে, উক্ত পিতা-মাতার প্রত্যেক সন্তান তার বা তাদের দৈনন্দিন আয়-রোজগার, বা মাসিক আয় বা বাৎসরিক আয় হতে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা বা উভয়কে নিয়মিত প্রদান করতে হবে অথবা মাসিক আয়ের কমপক্ষে দশ ভাগ পিতা-মাতার বরণ পোষণ করবেন।
ধারা ৪ অনুযায়ী, আইনটি শুধু পিতা-মাতার ভরণপোষণ বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পিতা-মাতার অবর্তমানে দাদা-দাদি ও নানা-নানির ভরণপোষণ বিষয়েও জোর দিয়েছে। পিতার অবর্তমানে দাদা-দাদিকে এবং মাতার অবর্তমানে নানা-নানিকে পিতা মাতার মতোই ভরণপোষণ দিতে হবে।
পিতা-মাতার ভরণ পোষণ আইন, ২০১৩ এ ভরণ-পোষণের মানদন্ড সুনিদ্রিষ্ট না করা হলেও এই আইনের ৯ ধারা অনুযায়ী “পিতা-মাতার ভরণ পোষণ বিধিমালা, ২০১৭(খসড়া)” এর ৩য় অধ্যায়ে ভরণ-পোষণের ন্যূনতম মানদন্ডের বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। নিম্নে তা সংক্ষিপ্ত আকারে আলোচনা করা হলো,
১. বিধি ১৪ অনুযায়ী, পুষ্টিমান নিশ্চিত করে ন্যূনতম তিনবার বা পিতা-মাতার প্রয়োজন অনুসারে খাদ্য সরবারহ করতে হবে।
২. বিধি ১৫ অনুযায়ী, সামর্থের মধ্যে আরামদায়ক পোষাক এবং বছরে কমপক্ষে একসেট কাপড় দিতে হবে।
৩. বিধি ১৬ অনুযায়ী, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন স্থানে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. বিধি ১৭ অনুযায়ী, পিতামাতার ন্যূনতম চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন অনু্যায়ী নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আরো বলা রয়েছে যে বছরে কমপক্ষে একবার চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
৫. বিধি ১৮ অনুযায়ী, প্রত্যেক সন্তাকে যথাযথ ভাবে পিতামাতার পরিচর্যা করতে হবে তবে তিনি যদি না পারেন তবে তার প্রতিনিধি পরিচর্যা করবে।
৬. বিধি ১৯ অনুযায়ী, সন্তান বা পরিবারের অন্য সদস্যগণ পিতামাতাকে নিয়মিত সঙ্গ প্রদান করবেন যদি তা সম্ভব না হয় তবে অন্য কোন উপায়ে (মোবাইল/ফোন/ইমেইল) নিয়মিত যোগাযোগ করতে হবে। আর বছরে কমপক্ষে ২ বার সাক্ষাত করতে হবে।
৭. বিধি ২০ অনুযায়ী, পিতামাতার আগ্রহকে গুরুত্ব দিয়ে বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন- টেলিভিশন,কম্পিউটার,খবরের কাগজ,বই ইত্যাদি। সন্তানের সার্মথ্য অনুযায়ী ভ্রমনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৮. বিধি ২১ অনুযায়ি, পিতা-মাতা মৃত্যবরণ করলে সন্তানকে স্বশরীরে উপস্থিত থেকে দাফন বা সৎকারসহ পিতামাতার দেনা-পাওনা পরিশোধ করতে হবে। তবে প্রবাসে বা অন্য কোন গুরুত্বপুর্ন কারণের উপস্থিত হতে না পারলে তার পরিবর্তে প্রতিনিধি প্রেরন করতে হবে।
পিতা-মাতার ভরণপোষণে অবাধ্য সন্তানের শাস্তি:
পিতা-মাতার ভরণ পোষণ আইন ২০১৩-এর ৫ ধারার (১) অনুযায়ী, সন্তানদের বিভিন্ন দায়িত্ব দেয়ার পাশাপাশি অপরাধ, দন্ড ও বিচারব্যবস্থা কেমন হবে সে বিষয়েও স্পষ্ট করা হয়েছে। কোন সন্তান যদি এই আইনের বিধানাবলি লঙ্ঘন করে তাহলে আদালত তাকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদন্ড প্রদান করতে পারবে। এছাড়া স্ত্রী বা স্বামী কিংবা পুত্র-কন্যা বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যদি পিতা-মাতা বা দাদা-দাদি বা নানা-নানির ভরণপোষণ প্রদানে বাধা বা অসহযোগিতা করে তবে তাকেও একই দন্ডে দন্ডিত করা হবে।
অপরাধের ধরন:
পিতা-মাতার ভরণ পোষণ আইন ২০১৩-এর ৬ ধারা অনুযায়ী, আইনে কেউ অপরাধ করলে তা আমলযোগ্য। একইসাথে দায়েরকৃত মামলা জামিনযোগ্য। পিতা-মাতা বা সন্তান চাইলে সর্বসম্মতিক্রমে এই মামলায় আপোষ-মীমাংসারও সুযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে এই আইনের ৮ ধারা অনুযায়ী, আদালত মামলা আপোষ-মীমাংসার জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বার বা সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা মেয়র বা অন্য কোন উপযুক্ত ব্যক্তিকে আদেশ করবেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আদেশ অনুযায়ী উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে যথাযথ ভাবে আপোষ-মীমাংসা করবেন। পিতা-মাতার ভরণ পোষণ বিধিমালা, ২০১৭(খসড়া) এর ৩০ (ঘ) বিধি অনুযায়ী, অভিযোগ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্য শর্তে বা শর্ত ছাড়া আপোষ- মীমাংসা করতে হবে এবং তা পিতামাতা ও সন্তানের স্বাক্ষরসহ লিখিতভাবে আদালতে জানাতে হবে।
যেখানে অভিযোগ দায়ের করতে হয়:
পিতা-মাতার ভরণ পোষণ আইন ২০১৩-এর ৭ ধারা অনুযায়ী, এই আইনের অধীনে অপরাধের অভিযোগ দায়ের ও বিচার প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হবে। তবে অপরাধের লিখিত অভিযোগ পিতা-মাতাকেই দায়ের করতে হবে অন্যথায় আদালত তা গ্রহণ করবেন না। তবে পিতা-মাতার ভরণ পোষণ বিধিমালা, ২০১৭(খসড়া) এর ২২ (১) বিধি অনুযায়ী, অসমর্থিতার কারণে পিতা-মাতার প্রতিনিধির মাধ্যমে আদালতে অভিযোগ দাখিল করতে পারবে।
আপীলঃ
পিতা-মাতার ভরণ পোষণ বিধিমালা, ২০১৭(খসড়া) এর ২৪ বিধি অনুযায়ী, আপোষ-মীমাংসার কোন পক্ষ সংক্ষুব্ধ হলে সংশ্লিষ্ট আদালতে পুর্নবিবেচনার জন্য ১৫ দিনের মধ্যে আপীল করতে পারবেন। তবে পিতা-মাতার ভরণ পোষণ আইন, ২০১৩ এর ৭ ধারার অধীনে যদি প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত কোন দন্ড প্রদান করেন সেই দন্ডের বিপরিতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি জেলা দায়রা জজ বা মহানগর দায়রা জজ আদালতে ৩০ দিনের মধ্যে আপীল করতে পারবে।
মোঃ শহীদুল্লাহ মানসুর
আইন বিভাগ,
মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
কেএ/বার্তাবাজার