সাইদুর রহমান সম্রাট। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সহ-সভাপতি। এই অবস্থানে এসেছেন ছাত্র রাজনীতির বন্ধুর পথে দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার পরীক্ষিত এবং আস্থাভাজন ‘ভ্যানগার্ড’ ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ কর্মী থেকে নিজ যোগ্যতা প্রদর্শন করেই নেতায় পরিণত হয়েছেন। এরপর কেবলি সামনে এগিয়ে যাওয়া।
ছাত্রলীগের ব্যানারে এই পথ পরিক্রমায় পালন করেছেন বিভিন্ন ইউনিট সহ কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদ। এর ভিতরে রয়েছে- আশুলিয়া থানা ছাত্রলীগের ১নং যুগ্ম-আহ্বায়ক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সদস্য, উপ-ত্রাণ ও দূর্যোগ বিষয়ক সম্পাদক এবং বর্তমানে হয়েছেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সহ-সভাপতি।
রাজনৈতিক কর্মকান্ডে তাঁর বিচক্ষণতায়ই তাকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৯ আসনের কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্র ভিত্তিক কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন।

এরকম অনেক কিছুই অর্জন রয়েছে আপাতদৃষ্টিতে সাদামাটা এবং অনাড়ম্বর জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই মানবিক ছাত্রলীগ নেতার। রয়েছে অনেক অনেক মানবিকতা প্রদর্শনের আদ্যোপান্ত। আজকের প্রতিবেদনে এমনই কিছু বিষয় পাঠকের সামনে উপস্থাপন করতে যাচ্ছি।
করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) নিয়ে সারাদেশ লকডাউন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষিত ‘করোনাযুদ্ধে’ মৃত্যু ভয়ে ভীত এক জনপদে তাঁর আস্থাভাজন সৈনিক বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বিভিন্ন ইউনিট ইতোমধ্যে দেশের নিজ নিজ এলাকায় সাধারণ মানুষের খাদ্য সামগ্রী প্রদান এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে তাদেরকে সচেতন করা সহ সামগ্রিক সরকারী ঘোষণার বাস্তবায়নে কাজ করছে। এই যুদ্ধে কীভাবে বসে থাকেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের এই ছাত্র নেতা? নিজের মেধার সর্বোচ্চ প্রয়োগে তাঁর ইউনিটের সকল সদস্যদের নিয়ে নেমে পড়লেন মাঠে।

সবার আগে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন তথা কাজ শুরু করা উচিৎ নিজ বসবাসের এলাকা থেকে। প্রজ্ঞাবান এই ছাত্রলীগ নেতাও সেভাবে শুরু করলেন। শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় সাধারণ মানুষকে এই ভাইরাসের প্রকোপ থেকে রক্ষায় তাঁর উদ্যোগে গঠিত হলো মেডিকেল ক্যাম্প। তার বসবাসের এলাকা আশুলিয়া ইউনিয়নের হাটবাজার এলাকায় ক্যাম্পের অন্যান্য সদস্যগণকে সাথে নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি তাদের মাঝে হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং পরিধানের মাস্ক বিতরণ শুরু করলেন।
শুধু তাই নয়, আশুলিয়া বাজারে আসা সব শ্রেণিপেশার মানুষ যাতে সুলভ এবং অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্যাদি কিনতে পারেন, মওকুফ করালেন এই হাটবাজারের সকল দোকানদারদের খাজনা! যেখানে ইজারাদার তাঁর বড় ভাই, তাকেই খাজনা মওকুফ করার নির্দেশনা দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না; বরং এই করোনা সংকট যতদিন থাকবে ততদিনই যেন খাজনা না নেওয়া হয় সেটাও নিশ্চিত করলেন!!

আমাদের সাথে তো অনেকেরই পরিচয় থাকে, সময়ের সাথে সাথে মেলামেশা না থাকায় এদের অনেককেই আমরা বিস্মৃত হই স্মৃতির মনিকোঠা থেকে। কিন্তু সাইদুর রহমান সম্রাট কোনো কিছুই সহজে বিস্মৃত হননা। এর ফলে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র অনেক আনুষঙ্গিক বিষয়ের জের ধরে অনেকে এরকম সাহায্য সহযোগিতা লাভ করে যা তাদের ধারণারও বাইরে থাকে। করোনার এই লকডাউন অবস্থায় শুধুমাত্র ফোন করেই আরেক জেলার অনেক আগের পরিচিত এক অসহায় পরিবারকে ভীষণ বিপদের হাত থেকে উদ্ধার করলেন। বলতে গেলে তাদের প্রাণ মহান আল্লাহপাক এই ছাত্রলীগ নেতার মাধ্যমেই রক্ষা করালেন। মানবিকতা প্রদর্শন এর এই বৃত্তান্তটুকু এই প্রতিবেদককে তিনি যেভাবে বলেছেন হুবহু সেভাবেই পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হলোঃ
” দিনটি ছিল মঙ্গলবার। বিকাল চারটা বাজে। হঠাৎ একটা অপরচিত ফোন ভেসে ওঠলো আমার মোবাইলের ডিসপ্লেতে। সাধারণত অপরিচিত নাম্বার হলে আমি ফোন কল রিসিভ করতে অভ্যস্ত নই। কিন্তু যখন একাধিকবার ফোন বাজছিলো, তখন আমার মনে হলো কেউ হয়তো বিপদে পড়েছে কিংবা হয়তোবা কেউ আমার বাজারে ব্যবসার জন্য একটা দোকান চাইতে ফোন করছে। ভাবনাটা কিছু মায়ারও জন্ম দিলো তাৎক্ষণিকভাবে।
কলটা রিসিভ করলাম। অপর পাশ থেকে সালাম দিয়ে আমাকে জানালো তার নাম সৌরভ এবং সে আমার এলাকায় ২০১১ সালে একটা হোটেলের সিঙ্গারা পুরির কারিগর ছিলো। মুহুর্তে তাকে চিনে ফেলে সে কেমন আছে জানতেই ফোনের ওপাশ থেকে হাউমাউ করে কান্নার শব্দ আসতে লাগলো। ছেলেটির কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করতেই সে যা জানালো তাতে আমার নিজেরই চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে গেলো।
সৌরভ নামের ওই ছেলেটি জানালো, গত দুইদিন ধরে সে তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে না খেয়ে আছে! শুনে আমি বিস্মিত হলাম। আমার প্রশ্নের উত্তরে সে আরও জানালো যে সে এখন মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে আছে। সেখানে একটা মুদির দোকান চালায়। কিন্তু লকডাউনের কারনে তার দোকানটি এখন বন্ধ। এজন্য ওর উপার্জন নাই। জমানো যা টাকা পয়সা ছিলো, এই ক’দিনে সব খরচ করে ফেলেছে। তাই চাল কিনতে পারে নাই বিধায়ই না খেয়ে আছে জানিয়ে আবার বলে কেঁদে উঠলো।

তখন আমি বললাম, তুই কোনো ত্রাণ পাসনি? এখন তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘরে ঘরে স্থান পৌঁছে দিচ্ছে। উত্তরে সে জানালো, অন্য জেলার মানুষ হিসেবে সে ওখানে ভাড়াটিয়া থাকার কারনেই তাকে কেউ ত্রাণ দেয়নি। আমি জানলাম ওর স্ত্রী কয়েক মাসের গর্ভবতী। শুনে হৃদয়টা কেঁপে উঠলো। নিজের অজান্তেই তখন ওকে ধমক দিয়ে বললাম, কি বলছিস তুই? ত্রাণের তো অভাব নাই। মেম্বার, চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, এমপি- সবাই ত্রাণ দিচ্ছে। তোকে দেয় নাই, মিথ্যা বলছিস না তো?
সে তখন বললো, ভাই আজ তিন চার দিন ধরে আপনার নাম্বার টা খুঁজতেছি, কেউ দেয় না। চারদিন আগে শেষ সম্বল ৫০০ টাকাও দিছি একজনকে বিকাশে। সে নাম্বার জোগাড় করে দিবে বলেও দেয়নি নাম্বারটা। পরে অনেক কষ্টে আরেকজনের থেকে আপনার নাম্বারটা পেয়েছি।
ওর বাড়িওয়ালাকে বলেছে কিনা ওর এই দূরাবস্থার কথা এটা জিজ্ঞেস করলে সৌরভ জানায়, তিনি ঢাকা থাকেন, তাই বলতে পারি নাই। তখন আমার ওর কথা তেমন বিশ্বাস হচ্ছিলো না। তাই আমি ওর সাথের অন্য কোনো একজন ভাড়াটিয়াকে ফোন ধরিয়ে দিতে বিলতেই একজন ভাড়াটিয়াকে আমার সাথে কথা বলিয়ে দেয়।
সেই লোকের সাথে আমি কথা বলে নিশ্চিত হলাম ঘটনা সত্য। বাহিরের লোক হওয়ার কারনে ওরা ত্রান পায়নি। শুনে সৌরভ নামের ছেলেটাকে ওর কাছাকাছি কোনো একটা বিকাশ নাম্বার দিতে বলে সেখানে ওর জন্য ২০০০ টাকা পাঠিয়ে দিয়ে ওকে বললাম আগে কিছু খাবার কিনে তার স্ত্রীর কাছে নিয়ে যেতে। আর আমাকে তার এলাকার চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মোবাইল নাম্বারটা ব্যবস্থা করে দেবার জন্য জানালে সে পরে আমাকে জোগাড় করে দেয়। তখন ওকে ওর স্ত্রীর ডেলিভারির কয়েকদিন আগে আমাকে আবার ফোন দিতে জানিয়ে ফোন রাখলাম।
এরপর ওর এলাকার চেয়ারম্যান ও সিঙ্গাইর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে কথা বললাম। এর ঠিক তিনদিন পর আবার সৌরভের ফোন।

আবেগাপ্লুত হয়ে সে জানালো যে, ওর বসবাসের ঐ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ওকে ২০ কেজি চাউল ও জীবন ধারনের জন্য যা প্রয়োজন তা দিয়ে গেছে! ওগুলো শেষ হলে আবার দিয়ে যাবে বলেও জানিয়ে গেছে।কথাটি শুনে আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে গেছি। মনে মনে আল্লাহপাকের কাছে শুকরিয়া জানিয়েছি এবং ঐ ইউনিয়ন পরিষদের সম্মানিত চেয়ারম্যান এবং ইউএনও কে অসহায় ওই পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর জন্য অনেক দোয়া করেছি।”
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের এই সহ-সভাপতি এই প্রতিবেদককে আরও জানান, আসলে ইচ্ছা থাকাটাই আসল। আপনি কোথায় আছেন কিংবা কিভাবে করবেন ভাবনার চাইতে ‘আপনাকেই কিছু করতে হবে’ এরকম মনোভাব পোষণ কারীদের জন্য সবকিছুই সম্ভবপর। সেটা আপনার ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ, দেশ এমনকি দেশের গন্ডী পেরিয়ে আরও বহুদূর পর্যন্তই বিস্তৃত হোকনা কেন।