ঢাকা থেকে পালিয়ে আসা করোনা আক্রান্ত দম্পতি রাজবাড়ীতে আটক

ঢাকা থেকে পালিয়ে কুষ্টিয়ায় আসার সময় পথিমধ্যে রাজবাড়ী জেলায় পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত স্বামী-স্ত্রী।
রাজবাড়ী জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ আক্রান্ত স্বামী-স্ত্রীকে তাদের জেলায় চিকিৎসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় এ নিয়ে কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ী জেলার মধ্যে টানাপোঁড়েন সৃষ্টি হয়।

দফায় দফায় আলোচনা ও নানা ঘটনার পর শেষ পর্যন্ত শুক্রবার(২৪ এপ্রিল) রাতে আক্রান্ত স্বামী-স্ত্রীর ঠাঁই হয়েছে কুষ্টিয়া জেলায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য নির্ধারিত আইসোলেশন ওয়ার্ডে।

আক্রান্ত তফিকুল ইসলাম (৩১) ও তার স্ত্রী শিল্পী আরা খাতুন (২৫) তাদের একমাত্র পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে ফাতেমাকে নিয়ে রাজধানী ঢাকার কামরাঙ্গীর চর এলাকায় বসবাস করে আসছেন।

পেশায় প্রাইভেট কার চালক তফিকুল ইসলাম কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর গ্রামের ভেগল মালিথার ছেলে।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত তফিকুল ইসলাম শুক্রবার রাতে এ্যাম্বুলেন্স যোগে কুষ্টিয়ায় আসার পথে মুঠো ফোনে কথা হয় এ প্রতিবেদকের সাথে।
কথা প্রসঙ্গে তিনি জানান, গত ১৬ এপ্রিল হঠাৎ করে তার গৃহিনী স্ত্রী শিল্পী আরা খাতুন জ্বরে আক্রান্ত হন। ঔষধ খাওয়ার পর তিন দিনের মাথায় জ্বর ভালো হয় যায়।

শুধু কাশি থেকে যায়। স্ত্রীর জ্বর ভালো হয়ে গেলে তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। দু’দিনের মধ্যে তার জ্বর ও ভালো হয়ে যায়।
স্বামী-স্ত্রী দুজনের জ্বর হওয়ার বিষয়টি তফিকুল ইসলাম তার মালিক (যার প্রাইভেট চালান) স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা: ওমর ফারুককে জানালে তিনি তাদেরকে করোনা টেষ্ট করার কথা বলেন।

১৯ এপ্রিল তফিকুল পিজি হাসপাতালে গিয়ে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়ে আসেন। একদিন পর ২১ এপ্রিল পিজি থেকে জানানো হয় তার করোনা পজিটিভ।

পরের দিন ২২ এপ্রিল স্ত্রী শিল্পী আরা খাতুন আর মেয়ে ফাতেমাকেও করোনা পরীক্ষা করা হয়। পরের দিন ২৩ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯ টার দিকে পিজি হাসপাতাল থেকে মুঠো ফোনে জানিয়ে দেওয়া হয় তার স্ত্রীর করোনা পজিটিভ।

তবে মেয়ে ফাতেমার নেগেটিভ রিপোর্ট এসেছে। তফিকুল এবং তার স্ত্রী কিভাবে কার সংস্পর্শে এসে করোনায় আক্রান্ত হলেন তা জানাতে পারেননি।

তফিকুল বলেন, বেশ কিছু দিন ধরে তিনি স্ব পরিবারে বাসায় অবস্থান করছিলেন। করোনার প্রার্দুভাবের কারণে তিনি প্রাইভেট কার চালানোর ডিউটি থেকেও বিরত ছিলেন।

তবে তিনি যেখানে বসবাস করেন সেই কামরাঙ্গীর চর এলাকাটা অনেক ঘিঞ্জি ও ঘনবসতিপূর্ণ। তার ধারণা এলাকার কাউরের সংস্পর্শে এসে তারা স্বামী-স্ত্রী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

তিনি জানান, করোনা পজিটিভ হলেও তারা মোটামুটি সুস্থ আছেন। তাদের শরীরে তেমন কোন উপসর্গ নেই।

ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ায় আসার কারণ কি জানতে চাইলে বলেন, মেয়েকে কে দেখবে? দু’জনই যেহেতু আক্রান্ত মেয়ের কথা চিন্তা করেই মূলত তারা কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে আসার সিদ্ধান্ত নেন।

তফিকুল জানান, শুক্রবার সকাল ৭ টার দিকে ঢাকা থেকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে কখনো ট্রাকে করে আবার অটোতে করে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাটে এসে পৌছান বিকেল ৫ টার দিকে।

ফেরিতে করে রাজবাড়ী বড় পুল এলাকায় এসে পৌছালে পুলিশের হাতে আটক হন। এ সময় জিজ্ঞাসাবাদে তারা পুলিশের কাছে তাদের করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি জানিয়ে কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে যেতে দেওয়ার অনুরোধ করেন।

রাজবাড়ী জেলায় পুলিশের হাতে করোনা আক্রান্ত স্বামী-স্ত্রী আটক হওয়ার পর এ নিয়ে সেখানে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। করোনা আক্রান্ত স্বামী-স্ত্রীকে নিয়ে বেকায়দায় পড়ে যায় পুলিশ।

রাজবাড়ী জেলার স্বাস্থ্য বিভাগও আক্রান্ত স্বামী-স্ত্রীকে তাদের জেলায় চিকিৎসা প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানায়। উপায়ান্তর না পেয়ে পুলিশ তাদেরকে ঢাকায় ফেরৎ পাঠানোর উদ্যোগ নিলে তারা ঢাকায় ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানায়।

রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বিষয়টি কুষ্টিয়ার সংশ্লিষ্টদের অবহিত করেন। কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ঢাকা ফেরৎ করোনায় আক্রান্ত স্বামী-স্ত্রীকে কুষ্টিয়ায় ঢুকতে দেবেন না বলে অনঢ় থাকেন।

কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডাঃ এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম জানান, আমরা রাজবাড়ী জেলার প্রশাসনকে অনেক অনুরোধ করেছি তাদেরকে ঢাকায় ফেরৎ পাঠানোর জন্য।

কিন্তু আক্রান্ত স্বামী-স্ত্রী কোনভাবেই ঢাকায় ফিরে যেতে রাজী হননি। তিনি জানান, আমরা কোনভাবেই তাদেরকে কুষ্টিয়ায় আসতে দিতে চাইনি।
সিভিল সার্জন জানান, বিকেল থেকে অন্তত দুই/তিন ঘন্টা দফায় দফায় এ নিয়ে রাজবাড়ী ও কুষ্টিয়া জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সিভিল সার্জনের সাথে মুঠোফোনে আলাপ-আলোচনা চলে।

সিভিল সার্জন জানান, শেষ পর্যন্ত কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনের সংসদ সদস্য আ ক ম সরোয়ার জাহান বাদশার অনুরোধে মানবিক দিক বিবেচনায় আক্রান্ত স্বামী-স্ত্রীকে কুষ্টিয়া জেলায় ঢুকতে দেয়া হয়েছে।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এস এম তানভীর আরাফাত সাংবাদিকদের জানান, আমরা কেউই চায় না আক্রান্ত অন্য কোন ব্যক্তি আমাদের জেলায় ঢুকে পড়ুক।

কিন্তু অনেক সময় অনুরোধে এবং মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটাতে হয়। আক্রান্ত স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটিই হয়েছে।
রাজবাড়ী জেলার সিভিল সার্জন নূরুল ইসলাম জানান, দুই জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সিভিল সার্জনের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে যেহেতু তাদের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া জেলায় সার্বিক বিষয় বিবেচনায় তাদেরকে একটি এ্যাম্বুলেন্স যোগে কুষ্টিয়ায় পাঠানো হয়েছে।
রাজবাড়ী জেলার সিভিল সার্জন মন্তব্য করেন, এভাবে করোনা আক্রান্ত রোগী পালিয়ে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় আসার বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক।

কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডাঃ এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম জানান, শুক্রবার রাত ৯ টার দিকে আক্রান্ত স্বামী-স্ত্রী রাজবাড়ী জেলা থেকে এ্যাম্বুলেন্স যোগে কুষ্টিয়ায় এসে পৌছানোর পর তাদেরকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে।

স্বামী-স্ত্রী দুজনকে দিয়ে কুষ্টিয়া জেলায় শুক্রবার পর্যন্ত করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৭ এ গিয়ে দাঁড়ালো। এদিকে করোনা আক্রান্ত দু’জনকে কুষ্টিয়ায় আনা নিয়ে কুষ্টিয়াবাসীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

বার্তা বাজার/এম.সি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর