সিরাজদিখানে কমে যাচ্ছে ফসলি জমি, বাড়ছে হাউজিং ও ইট ভাটা

করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্যাভাবের মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে, এমন সতর্কতা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনো জমি অনাবাদি না রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষিদের জন্য ৫ শতাংশ সুদে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছেন।শেখ হাসিনা বলেছেন কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে কৃষিকাজ অব্যাহত রাখাতে হবে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সেই ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন সরকার। করোনাভাইরাস সারা বিশ্বকে এমনভাবে নাড়া দিয়েছে, এখানে কিন্তু খাদ্যাভাব মারাত্মকভাবে দেখা দিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে আমাদের মাটি আছে, মানুষ আছে। আমাদের মাটি উর্বর। আমরা কিন্তু নিজেদের চাহিদা পূরণ করে অনেককে সাহায্য করতে পারব যদি আমরা যথাযথভাবে খাদ্য উৎপাদন করতে পারি। সেই উৎপাদন করতে যাতে দেশের মানুষ কষ্ট না পায়। কারও জমি যেন অনাবাদি না থাকে এসব কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

অথচ বিগত কয়েকবছরে শুধু মাত্র মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলায় চার ফসলি হাজার হাজার বিঘা জমি হাতিয়ে নিয়েছে ভূমিদূষ্যরা। সরকারী অনুমোদন ছাড়া বিঘা বিঘা ফসলি জমি দখল করে অসংখ্য অবৈধ হাউজিং প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে সিরাজদিখানের আনাচেকানাচে, সরকারের বিধি নিষেধ তোয়াক্কা না করে প্রশাসনের নাকের ডগায় দাপটের সাথে উজাড় করছে বছরে চারটি ফসল উদপাদন করার মতো ফসলি জমিজিরাত। একসময় সিরাজদিখানের অধিকাংশ জমিতে দেখা যেতো আলু ধান শর্ষের বিস্তীর্ণ মাঠ সেখানে এখন অধিকাংশ জমিতে দেখা যায় বালু ভরাট করে হাউজিং প্রকল্পের সাইনবোর্ড টানিয়ে কতিপয় ভূমিদূষ্যরা করছে রমরমা ব্যবসা।

শুধুমাত্র উপজেলার বালুচর ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে চান্দের চর খাসকান্দি পাইনাচর গোলগুলিয়া চর মদিনা পাড়ার এক সময়ের ফসলি জমিগুলোতে এখন তাকালেই দেখা যায় বালু ভরাট করে ঝুলিয়ে রেখেছে বিভিন্ন হাউজিং প্রকল্পের অবৈধ সাইনবোর্ড।এলাকাবাসীর সাথে কথা বললে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের বাপ দাদার সহায় সম্পত্তি গুলোতে এলাকার মখোশধারি ভূমি দূষ্যদের চোখ পড়েছে উজাড় করে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের চারফসলি জমি এইসব কালো থাবা থেকে আমরা মুক্তি চাই। স্থানীয়রা দাবী করে বলেন এইসব অবৈধ হাউজিং প্রকল্প করার জন্য উপজেলার জনপ্রতিনিধিরা তাদের সহযোগিতা করছে প্রকাশ্যে। এতে করে উপজেলার সহস্রাধিক সাধারণ মানুষ তাদের ফসলি জমি হারিয়ে পথে বসেছে বলে জানান তারা। তারা জানান, একসময় আমাদের এই জমিনগুলোতে ধান শর্ষে পাট আর আলুর চাষ হতো ব্যাপক, এখন সেগুলোকে বালু দিয়ে ভরাট করে বানানো হয়েছে হাউজিং।

ছবি: বার্তা বাজার

সরেজমিনে ঘুরে এবং উপজেলা ও ইউনিয়ন সূত্রে জানা যায় শুধুমাত্র বালুচর ইউনিয়নের ১ ২ ৩ নং ওয়ার্ডেই রয়েছে ১৫ থেকে ২০ টি ফসলি জমি ভরাট করা হাউজিং প্রকল্পের সাইনবোর্ড, যার মধ্যে দু একটা ছাড়া কাররই কোন সরকারি অনুমোদন ও কোন বৈধ কাগজ পত্র নেই। হাউজিং গুলো খাস ও ফসলি জমি ও সংরক্ষিত জলাভূমি ভরাট করে অবৈধভাবে হাউজিং ব্যবসা করছেন দাপটের সাথে।

সরকারি খাস জমি ও অন্যের জমি জোর করে মাটি ভরাটের প্রতিযোগিতায় এক ধাপ এগিয়ে রয়েছে এইসব প্রকল্প প্রতিষ্ঠান। এই মহামারি করোনাকালে যেসব জমিনের ধানে ভরপুর থাকতো উপজেলার প্রতিটি জনগণের বাড়ি সেখানে এখন বাসা বেঁধেছে দুঃস্বপ্নের হানা। জানা যায় উপজেলার ১৪ টি ইউনিয়নেই দিন দিন কৃষি জমির পরিমান কমছে। এতে পরিবেশের উপর যেমন বিরূপ প্রভাব পড়ছে, তেমনই ফসলি জমি কমছে আশংকাজনক হারে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, গৃহ নির্মাণ ও ইটভাটায় মাটি বিক্রির কারনে উপজেলা জুড়ে কৃষি জমি কমতে শুরু করেছে।

এছাড়া কৃষি জমি ভরাট করে হাউজিং কোম্পানী গুলো গড়ে তুলছে প্লট ও ফ্ল্যাট ব্যবসা। এভাবে চলতে থাকলে এ উপজেলায় ফসল উৎপাদনে কৃষি জমি হারাবে কৃষককুল। একই সঙ্গে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পরিবেশে বিপর্যয় নেমে আসবে অচিরেই। ভবিষ্যতে উপজেলার বৃহত জনগোষ্ঠীও বিপর্যয়ের কবলে পড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

আবার ক্রমাগত কৃষি জমি কমতে থাকলে বৃহত জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্যের জোগান দেওয়া রীতিমতো অসম্ভব হয়ে পড়বে। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার বালুচর, লতব্দী, বাসাইল, কেয়াইন, চিত্রকোট ইউনিয়নে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের দু’পাশে নামে-বেনামে গড়ে উঠছে শতাধিক হাউজিং কোম্পানী। মহাসড়কের দুই পাশে কৃষি জমি বালু ভরাট করেই মূলত: কোম্পানী তাদের প্লট ও ফ্ল্যাট ব্যবসা চালাচ্ছে। স্বল্প দামে কৃষি জমি কিনে বালু ভরাট করছে হাউজিং কোম্পানী গুলো।

এরপর সেখানে অত্যাধুনিক ফ্যাট গড়ে তুলতে স্থাপনা নির্মাণ শুরুর পাশাপাশি স্কুল-কলেজ ও হাট-বাজারেসহ নানা সুযোগ সুবিধা রয়েছে দেখিয়ে ফ্যাট ব্যবসা করছে নামে-বেনামী অসংখ্য হাউজিং কোম্পানী। অধিক মুনাফার লোভে কোম্পানী গুলো এক প্রকার দৌরাত্মে চালাচ্ছে কৃষি জমির উপর। কৃষকদের নানা লোভের ফাঁদে ফেলে একের পর এক কৃষি জমি হাতিয়ে নিচ্ছে ওই সব কোম্পানী। এরা এতই শক্তিশালী যে সরকারি অনুমতি ছাড়াই কৃষি জমিতে বালু ভরাটের মধ্য দিয়ে ব্যবসার প্রসার ঘটিয়ে চলেছে। এদিকে, উপজেলার বালুচর, লতব্দী, বাসাইল ও কেয়াইন ইউনিয়ন গড়ে উঠেছে প্রায় ৬০ টি ইটভাটা। এ সব ইটভাটায় ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। দিন দিন জমির উপরিভাগের মাটি কেটে নিয়ে যাওয়ায় উর্বরাশক্তি হারাচ্ছে ফসল উৎপাদনে। ক্রমাগত এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে কৃষি কাজে জমির সংকট সৃষ্টি হবে বলে মনে করছে উপজেলার কৃষককুল।

উপজেলা আওয়ামীলীগ সাধারন সম্পাদক ও বালুচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিক বলেন, গেল এক দশকে ফসলি জমির পরিমান ক্রমেই কমে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরিকল্পিত আবাসন ও নগরায়নের ফলে ক্রমাগত কৃষি জমি কমছে।কবে কোথায় কিভাবে তারা এগুলো করছে কে তাদের অনুমতি দেয় কিছুই জানিনা।আমি এইসব অবৈধ হাউজিং এর বিপক্ষে সবসময়ই স্বোচ্চার ছিলাম এখনো আছি এবং ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ ইতোমধ্যে নিয়েছি।

সিরাজদিখানের কৃষি কর্মকর্তা সুবোধ চন্দ্র রায় বলেন, িপাঁচ বছর আগেও উপজেলায় কৃষি জমির পরিমাণ ১৪ হাজার হেক্টর। কী পরিমাণ ফসলি জমি ভরাট হয়েছে সেই সঠিক তথ্য জানতে আমাদের একটু সময় লাগবে। তবে বিষয়টি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপকে অবহিত করেছি এবং মাসিক সমন্বয় মিটিংয়েও বিষয়টি তুলে ধরেছি।

বার্তা বাজার/এম.সি</strongৎ

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর