“আক্রান্তের পরিবারকে মানসিক নয়, শারীরিক আইসোলেশনে থাকতে দিন”

বাবার দাফন শেষ করে বাসায় ফিরছেন আবির। সাথে তার ভাই। গতকাল রাতে বাবা মারা গেছেন। হাসপাতালের আইসোলেশন বেডে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে শেষমেশ মৃত্যুই আপন করে নিলেন। নমুনা পরীক্ষা করে জানা গেছে, বাবার করোনা ভাইরাস ছিলো। তারপর, নিয়মমাফিক সব দায়িত্বশীলরাই দাফন করলেন। তাদের দুই ভাইসহ পরিবারকে বলা হলো, বাসায় আইসোলেশনে থাকতে।

বাসায় তাই ফিরছিলেন আইসোলেশনের জন্য। কিন্তু বাসায় আসতে দেখা গেলো, তাদের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি হয়েছে। বাসায় তাদের ঢুকতে দেওয়া যাবে না। তাদেরও আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালারা। বাবার বিয়োগে কাতর দুই ভাই একদিকে শোক, আরেকদিকে এমন ঘটনায় অনেকটা ভেঙে পড়ার অবস্থা। ভাড়াটিয়ারা জড়ো হলে হৈচৈ শুনে পাশের বাসা থেকে সেখানে যান বন্ধু রাকিব। ও আবার পাশের বাসার বাড়িওয়ালার ছেলে। আবিরের বন্ধু। বন্ধু হলেও ও-কে ফোন দেয়নি। এমন অবস্থায় মানসিক অবস্থা কেমন থাকে তা বুঝা না গেলেও অনুমেয়। রাকিব যেয়ে সবাইকে বুঝিয়ে ঢুকার ব্যবস্থা করে দেন। সেই বাসার বাসিন্দাদের দাবি, এদেরও রোগ থাকতে পারে। লিফটে যাবে, সুইচ টিপবে। সিঁড়িতে গেলে সিঁড়ি ধরবে। অন্যান্য জায়গায় তাদের সারফেস থেকে যাবে। এতে, আমরাও আক্রান্ত হতে পারি।

ঘটনাটি গতকাল রাতের। ঢাকার গোপীবাগ এলাকার৷ ঘটনাটি সত্য হলেও কেবল আবির নামটি ছদ্মনাম হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। এমন ঘটনা প্রায় সবখানেই। কেবল এই চিন্তা আর মানসিকতা থেকেই ডাক্তার, নার্সদের বাড়িতে থাকতে দিচ্ছে না কেউ। কেউ আবার মানসিকভাবে চাপে ফেলছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের।
অথচ, বিশ্বব্যাপী ঘটনা ভিন্ন। করোনা সমস্যা প্রায় সব দেশেই। কিন্তু তারা এভাবে মানসিকভাবে আঘাত হানছেন না। তারা মানসিকভাবে পাশে থাকছেন। স্পেনে সন্ধ্যায় একসাথে সবাই মিলে তালি দিয়ে ডাক্তারদের উৎসাহ দিয়ে থাকেন। মালদ্বীপের এমন একটি ভিডিও দেখলাম। চায়নায় বীরের সম্মাননা দিয়েছে ডাক্তার নার্সদের। ইতালিতেও একইভাবে সম্মান জানানো হয়।
অথচ, আমাদের ভিন্ন। কেবল আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কায় তাদের পাশে থাকা দূরে থাক, মানসিক আঘাত করছি। যেখানে সম্মুখ যোদ্ধা ডাক্তারদের এই অবস্থা, সেখানে অন্যদের অবস্থা আবিরদের মতোই হবে, স্বাভাবিক।

অথচ, ঘটনাটি হওয়ার কথা ছিলো ভিন্ন। আক্রান্ত পরিবারের অন্য সদস্যদের আক্রান্তের সম্ভাবনা থাকায় সচেতন থাকা যায় ভালোই। একজন চিহ্নিত চোর অপেক্ষা অচিহ্নিত চোর ভয়ংকর। আমাদের দেশে চিহ্নিত না করা আক্রান্তের সংখ্যা কত, তা জানা নেই কারো। সেক্ষেত্রে, আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা চিহ্নিত করা গেলে সুরক্ষা নেওয়া যায় কার্যতভাবেই।

তারা উঠার পরে লিফট, সিঁড়ি পুরো জায়গা জীবাণুনাশক দিয়ে স্প্রে করা যায়। তাদের বাজারগুলো দরজার সামনে দিয়ে আসা যায়। যাতে তাদের বের হতে না হয়। এই কাজও সকালে রাকিব করেছে।

বাসায় আইসোলেশনে থাকার ব্যবস্থা সারা বিশ্বেই। যেভাবে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে কষ্ট হয়ে পড়ছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দেশে তাই একই সিদ্ধান্ত। কেবল, শারীরিক অবস্থা অবনতি হলে হাসপাতালের শরণাপন্ন হতে বলছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা লকডাউন দ্রুত খুলে দেওয়ার একটা সুত্র বলছে, টেস্ট, ট্রেস, আইসোলেশন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে একই কথা। যেসকল দেশ খুব বেশি এই সংকট সামলে নিতে পেরেছে, তাদের টেস্ট সংখ্যা অনেক। ইউরোপের দেশ জার্মানি। অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের মতো মৃত্যু না হওয়ার পিছনে অনেকেই কারণ দেখছেন, টেস্ট। স্পেন, ইতালি থেকে তাদের টেস্ট সংখ্যা অনেক বেশি। রাশিয়ায় একই। সাউথ কোরিয়া প্রতিদিন ১৫ হাজার টেস্ট করতেন প্রথম থেকে। কেরালা একই কাজ করেছেন। এসব দেশে মৃত্যু হার অনেক কম তাই।

ট্রেসের ক্ষেত্রে, চায়না ফেস ডিটেকশন করে সংস্পর্শে আসা মানুষদের চিহ্নিত করে আইসোলেশনে দিয়েছেন। চায়নায় পড়া ফাহিম বিশ্বাস জানিয়েছেন, চায়না প্রথম থেকেই সম্ভাব্য মানুষ চিহ্নিত করে তাদের সংখ্যাও উল্লেখ করেছে। যেটি অন্য দেশ করেনি। কানাডা আইপি ট্রেস করে সম্ভাব্য ব্যক্তি চিহ্নিত করেছে। সিঙ্গাপুর সামাজিক মাধ্যম, টেক্সট ট্রেস করে সম্ভাব্য ব্যক্তি খুঁজে বের করেছে। বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন এমন কৌশল গ্রহণ করেছে, করছে।

আমাদের এসব কিছুই হচ্ছে না। আমাদের সীমাবদ্ধতা অনেক। বাজারে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে না বুঝে বা উপসর্গ আমলে না নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তথ্য গোপন করে চিকিৎসা নিতে যেয়ে ডাক্তারদের আক্রান্ত করছে। সেখানে আবিররা নিরাপদ। তাদের চিহ্নিত করতে হচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। চিহ্নিত না করা মানুষ থেকে আবিররা নিরাপদ। ডাক্তাররা নিরাপদ। এদের তাই নিরাপদে থাকতে দিন। আক্রান্তের পরিবারকে মানসিক নয় শারীরিক আইসোলেশনে থাকতে দিন।

বার্তা বাজার/এম.সি

*প্রকাশিত মুক্তমত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বার্তা বাজার-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বার্তা বাজার কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর