মোছাঃ আর্জিনা খাতুন সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ধানঘড়া ইউনিয়নের কাজিপুর ঝাপড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি পেশায় একজন গৃহিণী। গত তিন বছর ধরে তার নামে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীর ও এমএসের বরাদ্দকৃত চাল উঠছে। অথচ তিনিই জানেন না তার নামে কার্ড আছে।
হঠাৎ করে সোমবার (১৮ এপ্রিল) খবর পেয়ে ডিলারের ঘরে হাজির হন। দেখেন তিন বছর ধরে তার নামে চাল উঠে আসছে তিনি পান না। পরে তাকে ৩০০ টাকা দেয় ডিলার। আর বলা হয় এ কথা কাউকে না জানাতে, এখন তিনি নিয়মিত চাল পাবেন বলে জানানো হয়।
শুধু আর্জিনা নই আরও প্রায় ৫০ জনের অভিযোগ তিন বছর ধরে চাল উঠলেও তারা কিছুই জানেন না।
অনুসন্ধানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত তিন বছর ধরে অনেক গরীব ও অসহায় মানুষের নামে এভাবে ফেয়ার প্রাইসের ১০ টাকা কেজি চাল উত্তোলন করা হলেও কেউ কিছুই জানেন না।
অত্র ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ডিলার মো. রুস্তম আলী শেখ এর নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট গত তিন বছরে গরিবের চাল বিক্রি করে খাচ্ছে বলে স্থানীয় ভাবে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে সরকারি চাল, ত্রাণ ও সহায়তা নিয়ে কোন অনিয়ম চলবে না। এ বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হুশিয়ারি দেয়ার পর এখন অনেকের বাড়িতেই গোপনে চাল দিয়ে আসছেন বলে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
বিগত বছর গুলোতে অত্র ওয়ার্ডে গরিবের জন্য বরাদ্দকৃত চালের বড় অংশ ঢুকেছে ডিলার রুস্তম ও সিন্ডিকেটদের পেটে। এদিকে অত্র ডিলারের চাল বিতরণের সময় যে সরকারি প্রতিনিধি থাকেন তিনিও বিষয়টি অনেকটা অস্বীকার করে নিয়েছেন।
ট্যাগ অফিসারের দায়িত্বে থাকা উপজেলা উপ-সহকারি উদ্ভিদ সংরক্ষন কর্মকর্তা মো. গোলাম রব্বানীর সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, আমি সময়ের অভাবে সব সময় যেতে পারি না। অনেক সময় উপস্থিত থাকলেও একজনের কার্ড নিয়ে অন্যজন চাল নিয়ে যায় এমন ঘটনাও ঘটেছে। ডিলাররা কিভাবে কি করে সেটা তো আমি জানি না।
প্রতারণার শিকার আর্জিনা খাতুন, হোসেন আলী, জিন্নার খাতুন, রেজাউল করিম, বিদ্যুৎ, কোরবান আলী, আবু তালেব, মাজেদা বেগম, আস্তাবর আলী, হাসিনা বানু, আদুরি বেগম, সাফিয়া খাতুন ও বেলাতুন নেছা জানান, মীর ওবায়দুল ইসলাম মাসুম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর আমাদের একটি করে কার্ড করে দেয়।
একবার মাত্র চাল পেয়েছিলাম। তাও টাকা দিয়ে কিনে নিতে হয়েছিল। এরপর গত তিন বছরে তালিকায় নাম থাকার পরও কোনো চাল আমাদের কপালে জোটেনি। গত বুধবার চাল বিতরনের সময় আমরা উপস্থিত হয়ে তালিকা দেখতে চাইলে সরকারি কর্মকর্তা বলেন, আপনাদের নাম তালিকায় আছে। এরপর আমাদের ৩০০ টাকা করে দেয়া হয়। রোববার (১৯ এপ্রিল) সকালে ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন বঞ্চিতরা।
বঞ্চিত আর্জিনা খাতুন জানান, আমার মত ৫০ জন লোকের নামে কার্ড আছে অথচ চাল তারা পান না। অনেকেই এক ও দুইবার চাল পাওয়ার পর তাদের কপালে আর কোনো দিনই চাল জোটেনি। উপজেলা খাদ্য অফিস থেকে পাওয়া তালিকা ঘেটে এমন সত্যতা মিলেছে।
খাদ্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, ধানগড়া ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডে প্রতি বছর দুটি ধাপে ৩৬০ কার্ডধারীর অধীনে ফেয়ার প্রাইসের চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রতিকেজি চালের কেজি ১০ টাকা। প্রতি বছর দুটি সময়ে দেয়া হয়। প্রথম ধাপে মার্চ ও এপ্রিল এবং দ্বিতীয় ধাপে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে দেয়া হয়। করিলাবাড়ি বাজারে রুস্তম ডিলার চাল বিতরণ করে থাকেন।
অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর নতুন করে অনেকের কার্ড করা হয়। তালিকায় ৩৬০ জনের নাম রয়েছে। এদের বেশির ভাগ কার্ড হওয়ার পর প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তি চাল পাওয়ার পর এরপর তিন বছরে তাদের কপালে আর কোনো চাল জোটেনি। বরাদ্দকৃত চালের বেশির ভাগই নয়ছয় হয়ে গেছে।
অভিযুক্ত ডিলার রুস্তম আলী শেখ বলেন, ৫০টি নয়, ১০ থেকে ১২ টি কার্ড বাদ পড়তে পারে। নাম ডাবল হওয়ায় চেয়ারম্যান নিজে অনেক জনের নাম বাদ দেন। বর্তমানে আমি ৩৬০টি কার্ডের চাল দিচ্ছি।
এদিকে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দেওয়ান মোঃ আতিকুর রহমান বলেন, জানুয়ারী মাসে এখানে যোগদানের পর কার্ড সংশোধনে ইউপি চেয়ারম্যানদের তাগিদ দেয়া হলে শুধু চান্দাইকোনা ইউনিয়ন ছাড়া আর কেউ আসেনি।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামীমুর রহমান বলেন, ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ পেয়েছি, চাল নিয়ে অনিয়ম করার কোনো সুযোগ নেই। তালিকায় যাদের নাম আছে তারা কেন চাল পাচ্ছে না তা খতিয়ে দেখে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বার্তা বাজার/এম.সি