আমাদের ইউএনও পারভেজুর রহমান

একজন লোক কাজ করছেন, ভালো কাজ করছেন। করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) এর এই কার্যত লকডাউন অবস্থায় মৃত্যুভয়ে ভীত এক জনপদে দিনরাত সমানে কাজ করে যাচ্ছেন। আমি ঢাকার সাভার উপজেলার কথা বলছি। এখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করার পর থেকে এই উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রভূত উন্নতি হয়েছে। একজন মফস্বল সাংবাদিক হিসেবে এই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যেদিন এখানে যোগদান করেছেন, সেদিনই তার সাথে পরিচয়। এরপর কেটে গেছে অনেকদিন। সময়ের সাথে সাথে খুব কাছ থেকে সাংবাদিকের চোখ দিয়ে তাকে গভীর পর্যবেক্ষণ করতে থাকি। একজন সহজ-সরল এবং কর্তব্যনিষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তার প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে তাকে চিন্তা করলেই। তিনি আমাদের সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পারভেজুর রহমান।

বর্তমান করোনা পরিস্থিতি, লকডাউন, স্বাস্থ্যসেবা, মোবাইল কোর্ট ইত্যাদি কর্মকান্ডের মাধ্যমে সাভারের পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক আছে এই লোকটার জন্য। যেখানে আমাদের পাশের কেরানীগঞ্জ ও সিঙ্গাইর উপজেলার পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ।

ছবি: বার্তা বাজার

তিনি তাঁর জায়গায় কতটুকু দায়িত্বশীল এবং কর্তব্যপরায়ণ তার একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। মাত্র কয়েকদিন আগে তার আপন ভাই মারা গেছেন। তিনি শুধু জানাজা এবং দাফন করে আবার নিজ কর্মস্থলে ফিরে এসেছেন শুধুমাত্র তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য। এই অবস্থায় আপনি কি করতেন পাঠক?

বড় ভাইয়ের মৃত্যু পরবর্তী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের টাইমলাইনে তিনি একটি ‘স্ট্যাটাস’ দিয়েছিলেন, তার শুরুর কিছু অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরলাম-

“সদ্য ভ্রাতৃহারা পাষাণ আমি। আজ এক সপ্তাহ হল আমি আমার ভাইকে হারিয়েছি অথচ দায়িত্ব ও কর্তব্যের খাতিরে শোক করার অবকাশও নেই!! এই প্রথম অনুধাবন করলাম সবকিছু অবহেলা করা যায় কিন্তু রাষ্টীয় দায়িত্ব সেটা অবহেলা করা যায় না যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। সাভারের ষাট লক্ষাধিক মানুষের নিরাপত্তার কাছে আমার এই শোকের মাতম খুবই তুচ্ছ!!! চুয়াল্লিশ বছর বয়সী ভাইয়ের অকাল মৃত্যুতেও কত নির্বিকার আমি!! এতগুলো মানুষের নিরাপত্তা, বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণ, সাময়িক বেকার পরিবার গুলোর বাড়ি বাড়ি খাবার সরবরাহ, জনসমাগম রোধে চেকিং, প্রবাসীদের হোমকোয়ারেন্টাইন নিশ্চিতকরন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে সহায়তা করা, লকডাউন নিশ্চিতকরন, চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতকরন, ডাক্তারদের সুরক্ষা নিশ্চিতকরন, আজ আমি নাকি মানবতার ফেরিওয়ালা!!! অথচ আমি নিজের পরিবারের প্রতি কতটা অমানবিক??!!!?”

ছবি: বার্তা বাজার

এমনই চিন্তাধারার একজন মানুষ আমাদের সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পারভেজুর রহমান। সবাই যখন নিজেকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টায় লিপ্ত, ঠিক তখনি এই মানুষটি নিজের পরিবারের নিরাপত্তার কথা না ভেবে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাবারের প্রয়োজন, ঠিক তেমনি খাবারের যোগানের সাথে প্রয়োজন নিরাপত্তারও। আর এই সবগুলোর সমন্বয় করে প্রশাসন। আর একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে এই সমন্বয়ের অংশ হিসেবে সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার পারভেজুর রহমান জুম্মন রাতের অন্ধকারে নিজের নিরাপত্তা আর পরিবারের কথা না ভেবে খাদ্য নিরাপত্তায় ত্রান সামগ্রী বিতরণ থেকে মানুষকে সচেতনতা আর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রনে সাভারের পথে প্রান্তের ঘুরে বেড়াচ্ছেন। করোনার ভয় কে উপেক্ষা করে মানুষের বাড়ি বাড়ি হেঁটে হেঁটে ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছেন। চাইলে তো অন্য কাউকেও পাঠিয়ে তদারকি করতে পারতেন; কিন্তু তা করেন নি। ত্রাণ সামগ্রীর যাতে সুষ্ঠ বন্টন হয় এবং তিনি নিজেও পরিস্থিতি বুঝতে পারেন তাই নিজেই প্রতিবার গিয়েছেন এবং যাচ্ছেন। এমন কোন দিন নাই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাইরে বাইরে টহল দেয়া, ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা, বাজার ‘মনিটরিং’ করা ছাড়া বাসায় অলস সময় কাটিয়েছেন তিনি! এমনকি জাতীয় পর্যায়ে 333 থেকে তাঁর কাছে ত্রাণের তালিকা আসে, সেটাও তিনি নিজে দেখে পৌঁছে দিয়ে আসেন!!

এরকম একজন মানুষের বিরুদ্ধে সম্প্রতি একটি পত্রিকার ‘অনলাইন সংস্করণে’ এবং আরেকটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে কিছু মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে সত্য এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের নিজের দায়বদ্ধতা থেকেই নিজে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করার ইচ্ছে জাগে।

এবার আসা যাক, পত্রিকা/অনলাইন পোর্টাল দুইটিতে কি অভিযোগ করা হয়েছিলো? নিউজের শিরোনাম ছিলো- ‘ত্রাণের নামে টাকা আদায়ের অভিযোগ সাভারের ইউএনওর বিরুদ্ধে’। প্রতিবেদক এই নিউজে উল্লেখ করেছেন- “করোনায় সহযোগিতার জন্য ফান্ডের কথা বলে একাধিক ইউপি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে আদায় করার অভিযোগ উঠেছে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পারভেজুর রহমানের বিরুদ্ধে।”

এখানে অভিযোগগুলো কারা করেছেন দেখে আসা যাক। প্রতিবেদক যে সব চেয়ারম্যানের ‘রেফারেন্স’ দিয়ে এই অভিযোগের তীর নিক্ষেপ করেছেন তাদের ভিতরে রয়েছেন- সাভারের বনগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ সাইফুল ইসলাম, শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম সুরুজ, আশুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন মাদবর, পাথালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পারভেজ দেওয়ান এবং ভাকুর্তা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন। তবে প্রতিবেদক ভাকুর্তা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এর বক্তব্যে জানিয়েছেন যে তিনি লকডাউনের কারণে নির্বাহী কর্মকর্তাকে টাকা পৌঁছে দিতে পারেননি এবং আগামী দু-একদিনের মধ্যে টাকা পৌঁছে দেবেন। এছাড়াও প্রতিবেদক শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুরুজ এর বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন যে ধামসোনার চেয়ারম্যান ও আশুলিয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নির্বাহী কর্মকর্তাকে এক লাখ টাকা করে দিয়েছেন।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের শুরুতে গতকাল শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) বনগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ সাইফুল ইসলামের নিকট এসম্পর্কে তার বক্তব্য গ্রহনের জন্য বনগাঁও ইউনিয়ন পরিষদে যাই। সেখানে বার্তা বাজার ফেসবুক লাইভে তিনি সাভারের ইউএনও পারভেজুর রহমানকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন এমন কথা সরাসরি অস্বীকার করেন এবং জানান তার নাম ব্যবহার করে অনলাইন পোর্টালগুলো মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করেছে।

ছবি: বার্তা বাজার

পরবর্তী ধাপে শনিবার (১৮ এপ্রিল) মুঠোফোনে শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম সুরুজ এর নিকট ত্রাণের নামে সাভারের ইউএনও কে ৫০ হাজার টাকা প্রদানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনিও ঘটনা সত্য নয় উল্লেখ করে টাকা প্রদানের বিষয়ে উল্লেখ করেন। এসময় তিনি আরও জানান যে, সাংবাদিক তার নাম জড়িয়ে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করেছে এবং তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার ফেসবুক আইডিতে এসংক্রান্ত একটি ‘স্ট্যাটাস আপডেট’ করেছেন।

ছবি: বার্তা বাজার

এব্যাপারে মুঠোফোনে পাথালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাভার উপজেলা চেয়ারম্যান এসোসিয়েশনের সভাপতি পারভেজ দেওয়ানের নিকট জানতে চাইলে এই প্রতিবেদককে তিনিও তার নাম ব্যবহার করে ওই পোর্টালে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে বলে জানান। এসময় তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ত্রাণের নামে সাভারের ইউএনও কে তিনি কোনো টাকা প্রদান করেন নাই এবং তিনিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে তার আইডি থেকে এ বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন।

ছবি: বার্তা বাজার

ভাকুর্তা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন এবং ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামের মুঠোফোনে কয়েকবার কল করা হলেও তারা কল রিসিভ না করায় এবিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ভাকুর্তা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এর ফেসবুক আইডি থেকে সাভারের ইউএনওকে ত্রাণের নামে টাকা প্রদানের ব্যাপারে তাকে জড়িয়ে যে সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে তা সত্য নয় বলে জানানো হয়।

আশুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন মাদবর এর মুঠোফোন বন্ধ থাকায় এব্যাপারে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার বরাত দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টাকা প্রদানের বিষয়টি সত্য নয় বলে জানানো হয়।

এব্যাপারে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পারভেজুর রহমান এর নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনও চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ত্রাণের নামে চাঁদা গ্রহণ করা হয় নাই। সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত ৪ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা হতে ২ লক্ষ টাকা খরচ করা হয়, বাকি ২ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা এখনো উত্তোলনই করা হয়নি। উপজেলা প্রশাসন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ২০ মেট্রিক টন চাল দুই হাজার পরিবারের মধ্যে বিতরণ করেছিলেন। এই চালের সঙ্গে ৩ কেজি আলু, ১ কেজি ডাল, ১ লিটার তেল, ১ কেজি লবণ এবং একটি কাপড় কাচার সাবান বিতরণ করা হয়।

তিনি আরও জানান, সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত চাল বাদে আলু, তেল লবণ, সাবান ও ডাল কিনতে ৭ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। এরমধ্যে সরকারি ২ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। আর বাকী পাঁচ লক্ষ টাকার মালামাল সাভার উপজেলা চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজীব নিজে ক্রয় করে ইউএনও এর কাছে হস্তান্তর করেছেন।

ত্রান সামগ্রী না পাওয়ার দরুন এবং ৩ জন ভুয়া সাংবাদিক দের জরিমানা করায় কিছু ভুয়া সাংবাদিক ভুয়া খবর প্রচার করছে বলেও জানান তিনি।

সাভারের ইউএনও’র বিরুদ্ধে এধরণের বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ বিভিন্ন মহলে বিষয়টি নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

 

<strong>বার্তা বাজার/এম.সি</strong>

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর