করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে বিশ্বের বহু দেশ লক-ডাউন করা হয়েছে। এসময়ও ঘরে শিশু ও নারীরা পারিবারিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন সংগঠন বলছে সাধারণ ও স্বাভাবিক সময়ে এসব নির্যাতন থেকে বাঁচতে শিশু ও নারীরা বিভিন্ন সংস্থার সহায়তা বা সাহায্য নিতেন।
কিন্তু লকডাউনের কারণে কেউ বাইরে যেতে পারছেন বা সংস্থাগুলোও সাহায্য করতে পারছে না, কারণ সব কিছু বন্ধ, স্থবির হয়ে পড়েছে সমগ্র দুনিয়া। ব্রিটেনে নির্যাতনের ঘটনা অনুসন্ধানের জন্য জাতীয় পর্যায়ে হটলাইনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, সেখানে সপ্তাহে ৬৫ শতাংশ বেশি টেলিফোন কল আসছে যা নির্যাতন সম্পর্কিত। এই সহিংসতা নানান রূপে, নানান ভাবে সমাজের সামনে প্রতিয়মান হয়ে সামাজিক ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে এধরনের সহিংসতাকে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে উপেক্ষা করা হয়।
প্রায় একই অবস্থা বাংলাদেশে হলেও নারীর সমঅধিকারের কথা বলা হয়েছে বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে। আবার নারীর অনগ্রসরতা বিবেচনায় নারীদের প্রতিষ্ঠিত করা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সংবিধানের ২৮ (৪) অনুচ্ছেদে। তাছাড়াও নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের জন্য বাংলাদেশে একাধিক আইন রয়েছে। দন্ডবিধি ১৮৬০, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০, যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০, এসিড অপরাধ দমন আইন ২০০২, ইত্যাদি।
১. পারিবারিক সহিংসতা কি?
পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ এর ধারা ৩ অনুযায়ী, পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে এমন কোন ব্যক্তি যদি পরিবারের অন্য কোন নারী বা শিশু সদস্যের উপর শারীরিক বা মানসিক বা যৌন নির্যাতন বা আর্থিক ক্ষতিগ্রস্থ করা। এখানে পারিবারিক সম্পর্ক বলতে রক্তের বা বৈবাহিক বা দত্তক বা যৌথ পরিবারের সদস্য হওয়ার জন্য যে কোন প্রতিষ্ঠিত সম্পর্ককে বোঝানো হয়েছে।
২. অভিযোগ দায়েরঃ
পারিবারিক সহিংসতার শিকার যেকোন ব্যক্তি বা তার পক্ষে কোন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা বা অন্য কেউ বা সহায়তা প্রদানকারী যে কোন ব্যক্তি অভীযোগ দায়ের দাখিল করতে পারবে। এই আইনের অধীনে পারিবারিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তি জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট বা ক্ষেত্রবিশেষে মেট্রোপলিটান জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট আবেদন করতে পারবে। আবেদনকারী বা প্রতিপক্ষের বসবাসের জায়গা, যে জায়গায় ঘটনাটি ঘটেছে বা নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি যেখানে অস্থায়ীভাবে থাকেন, যেকোন জায়গার আদালতে আবেদন দাখিল করা যাবে।
৩. আইনের অধীনে কর্তব্যরত ব্যক্তি পক্ষের দায়দ্বায়িত্ব সমুহঃ
পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ এর তৃতীয় অধ্যায়( ধারা ৪ থেকে ৯) অনুযায়ী, সহিংসতা প্রতিরোধে পুলিশ, প্রয়োগকারী কর্মকর্তা (মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা) এবং সেবা প্রদানকারীর দায়দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। পুলিশের কর্মকর্তা পারিবারিক সহিংসতার খবর পাওয়া মাত্র সহিংসতার শিকার ব্যাক্তিকে আাইন অনুসারে প্রতিকার, চিকিৎসাসেবা, যদি প্রয়োজন হয় তাহলে বিনা খরচে আইনি পরামর্শ ও সহায়তা প্রাপ্তিতে সহযোগিতাসহ অন্যান্য দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করবেন।
এই আইনের ৫ ও ৬ ধারায় বলা হয়েছে প্রতিটি উপজেলা, থানা, জেলা বা মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য এক বা একাধিক প্রয়োগকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হবে। প্রয়োগকারী কর্মকর্তা সহিংসতার ঘটনা থানাকে অবহিত করবেন, নির্যাতিত ব্যক্তি চাইলে আদালতের কাছে সুরক্ষা আদেশের জন্য আবেদন করবেন, আদালতের কাছে প্রতিবেদন পেশসহ অন্যান্য দায়িত্ব পালন করবেন। আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী সেবা দান কারী সংস্থা নির্যাতিত ব্যক্তির অনুমতি সাপেক্ষে নির্যাতনের ঘটনা, আদালত এবং প্রয়োগকারী কর্মকর্তাকে অবহিত করবে, স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করার পাশাপশি এর রিপোর্ট থানায় এবং প্রয়োগকারী কর্মকর্তা নিকট পাঠাবে, এবং আশ্রয় নিবাসে প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য থানা কে জানাবেন।
৪. সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতের আদেশ ও শাস্তিঃ
উক্ত আইনের চতুর্থ অধ্যায়ে (ধারা ১০ থেকে ১৯) সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতের আদেশের কথা বলা হয়েছে। আদালত নির্যাতিত ব্যক্তির তৎক্ষণাৎ কিছু অধিকার ও বিচার চলাকালিন সময়ে নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য বেশকিছু আদেশ প্রদান করতে পারবেন।
যেমনঃ ধারা ১৩ অনুযায়ী সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদন পত্রের সাথে উপস্থাপিত সকল তথ্য ও আলামত পর্যালোচনা করে আদালত যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে পারিবারিক সহিংসতা হয়েছে বা হওয়ার সম্ভাবনা আছে তাহলে আদালত একরফাভাবে অন্তুর্বতীকালীন সুরক্ষা আদেশ দিতে পারবেন। একই সাথে পারিবারিক সহিংসতামূলক কাজ না করার বা সংঘটনে সহায়তা না করার বা প্ররোচনা প্রদান না করা বা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সাথে কোনো ভাবে যোগাযোগ (সরাসরি/লিখিত/মোবাইল/অন্য কোন উপায়ে) না করা বা সুরক্ষা আদেশে উল্লিখিত অন্য কোন কাজ না করার আদেশ প্রদান করতে পারবেন (ধারা ১৪)।
ধারা ১৫ অনুযায়ী আদালত সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত করার জন্য আদেশ প্রদান করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে অংশীদারী বাসগৃহে বসবাস ও যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা বা বাসগৃহ থেকে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে বেদখল বা ভোগ দখলে বাঁধা না দেওয়ার আদেশ দিতে পারবেন। যদি তা সম্ভব না হয়ে তবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির জন্য প্রয়োগকারী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে নতুন বাসগৃহের ব্যবস্থা করা সাথে তার ব্যক্তিগত ও মালিকাধীন সকল জিনিস পত্র (পেশাগত দলিলাদি/ পাসপোর্ট/নগদ টাকা/স্বর্ণালংকারসহ অন্যান্য ) সংগ্রহ করা এবং উক্ত ভাড়া প্রতিপক্ষকে বহন করার আদেশ প্রদান করতে পারবেন।
এছাড়াও ১৬ ধারায় বলা হয়েছে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যদি ১১ ধারার অধীনে আবেদনের সাথে পৃথক দরখাস্তে ক্ষতিপূরণের আবেদন করেন। আদালত সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, আর্থিক, স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষতি বিবেচনা করে প্রতিপক্ষকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ দিতে পারবেন।
এই আইনের ১৭ ধারা অনুযায়ী অন্য কোন আইনে যাই থাকুক আদালত আবেদন বিবেচনা করে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সন্তানকে তার বা তার পক্ষে অন্য কারো নিকট অস্থায়ীভাবে জিম্মায় রাখার আদেশ দিতে পারবেন তবে প্রতিপক্ষ আদলতের আদেশক্রমে সন্তানের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবেন। উক্ত আইনের ১৯ ধারায় বলা হয়েছে ১৪ ধারার অধীনে প্রদানকৃত আদেশ ততক্ষন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে যতক্ষন না সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি উক্ত আদেশ প্রত্যাহারের জন্য আদালতে আবেদন করবেন এবং তা গৃহীত হবে।
৫. প্রতিকার:
পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ এর অধীনে সংগঠিত সকল অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং আপোষযোগ্য (২৯ ধারা) ।
এই আইনের অধীনে যেকোন আবেদন ফৌজদারী কার্যবিধির CHAPTER XXII (SUMMARY TRIALS) অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত বিচার পদ্ধতিতে বিচার করতে হবে (ধারা ২২) । পক্ষগণের সম্মতিতে বা আদালত নিজে যদি মনে করেন যে বিচার কার্যক্রম রুদ্ধদ্বার কক্ষে (trail in camera) করা উচিৎ তবে আদালত তা করতে পারবেন (ধারা ২৩) । প্রতিপক্ষ আদালতে উপস্থিত হওয়ার নোটিশ পাওয়ার পরও যদি আদালতে উপস্থিত না হন তবে প্রতিপক্ষের অনুপস্থিতিতেই একতরফাভাবে আবেদন নিষ্পত্তি করা যাবে (ধারা ২৬) ।
এই আইনের ২০ ধারায় বলা হয়েছে, ক্ষতিপূরণের আদেশ ব্যতিত অন্যান্য ক্ষেত্রে নোটিশ জারির তারিখ থেকে সর্বোচ্চ ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে আদালত মামলা নিষ্পত্তি করবেন। তবে প্রয়োজনে আরো সময় বাড়ানো যাবে কিন্তু সময় বাড়ানোর বিষয়টি আপীল আদালতকে অবহিত করতে হবে।
ধারা ৩০ অনুযায়ী, সুরক্ষা আদেশের শর্ত না মানলে অনধিক ৬ মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক দশ হাজার টাকার অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলে অনধিক ২ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক এক লক্ষ টাকা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। তবে আদালত যদি মনে করে, প্রতিপক্ষকে শাস্তি না দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের তত্বাবধানে বিভিন্ন ধরণের সমাজ কল্যাণমূলক কাজের আদেশ দিতে পারেন। এই কাজ থেকে যে অর্থ আয় হবে তা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ও তার সন্তানদের দেয়ার জন্য আদেশ দিতে পারেন (ধারা ৩১)।
উক্ত আইনের ৩২ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির ক্ষতি করার জন্য মিথ্যা আবেদন করলে অনধিক ১ (এক) বছর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ড হতে পারে।
পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ এর ২৮ ধারায় বলা হয়েছে, আদেশের বিরুদ্ধে যেকোনো পক্ষ ৩০ দিনের মধ্যে আপীল করতে পারবেন। আপীল দায়েরের ৬০ দিনের মধ্যে আপীল আবেদন নিষ্পত্তি করতে হবে।
কেএ/বার্তাবাজার