মহামারি করোনা ভাইরাস সংক্রমণে যুক্তরাজ্যে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজারের খুব কাছাকাছি। রয়টার্সের তথ্যমতে দেশটিতে করোনায় এই পর্যন্ত মারা গেছে ৯৮৭৫ জন মানুষ। শনিবারের (১১ এপ্রিল) তথ্যমতে দেশটিতে ৯শ’ জনেরও বেশি লোক মারা গেছে। যার ফলে মৃত্যু তালিকায় এখন ইংল্যান্ডের নাম আছে পঞ্চমে।
আক্রান্তদের সুস্থ করে তুলতে কোনো ত্রুটি করছেন না সে দেশের চিকিৎসকরা। রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন তারা। কিন্তু সরকারের যথাযত পদক্ষেপ না থাকায় ডাক্তাররা বাধ্য হচ্ছেন রোগীদেরকে বাড়িতে ফিরিয়ে দিতে।
দেশটিতে করোনা রোগীর সংখ্যার বিস্ফোরণ ও স্বাস্থ্যসেবার এমন দুরবস্থায় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং তার দল কনজারভেটিভ পার্টিকে দায়ী করেছেন অ্যান্ড্রু মেয়ারসন নামে যুক্তরাজ্যের এক নবীন চিকিৎসক।
ওরচেস্টারশায়ার রয়্যাল হাসপাতালে করোনা রোগীর সেবায় নিয়োজিত তিনি। বরিস জনসনকে উদ্দেশ্য করে বলা অ্যান্ড্রু মেয়ারসনের সেই বক্তব্য গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান প্রকাশ করেছে।
তার বক্তব্যটা হুবহু তোলে ধরা হলো-
‘প্রিয় বরিস জনসন,
রাজনীতিতে আজকাল যা চলছে, চিকিৎসায় ঠিক তার বিপরীত ঘটছে। এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েছি, যাকে ‘দৃষ্টান্তহীন ঘটনা’ বলা যায়। এমন পরিস্থিতি তখনই তৈরি হয়, যখন নানা প্রটোকলের কারণে রোগীকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। দৃষ্টান্তহীন এসব ঘটনা এতটাই ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে যে, রোগীর সেবায় জড়িত বেশিরভাগ চিকিৎসক তাদের বাকি কর্মজীবনে এর ভার বহন করবেন। অনেক নবীন চিকিৎসক দুর্ঘটনা ও জরুরি বিভাগে কর্মিস্বল্পতা নিয়েও টানা কাজ করছেন। আমি দেখেছি অত্যধিক চাপে থাকাবস্থার ফল কী হয়। আমার বিশ্বাস, এটিকেও ‘দৃষ্টান্তহীন ঘটনা’ হিসেবে লেখা উচিত। ২০১৬ সাল থেকে এক ইংল্যান্ডেই অন্তত ৫ হাজার ৫০০ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করার ফলে মারা গেছেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ১৯৭০ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। আমাদের তো ক্ষোভপ্রকাশ করাই উচিত!’
অ্যান্ড্রু মেয়ারসন এরপর লেখেন– ‘প্রধানমন্ত্রী, আপনি কি দয়া করে একমুহূর্তের জন্য নিজেকে একজন ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) প্যারামেডিক, চিকিৎসক বা নার্স হিসেবে কল্পনা করতে পারেন? আমরা করিডোরে ট্রলিতে রোগীদের মারা যেতে দেখছি। দয়া করে মাত্র একমুহূর্তের জন্য এনএইচএসে অপর্যাপ্ত বরাদ্দের মানবিক পরিণতি সম্পর্কে ভাবুন। এনএইচএস মারাত্মকভাবে তহবিল ও কর্মিস্বল্পতায় ভুগছে। এর জন্য আপনি ও আপনার সরকার দায়ী। প্রধানমন্ত্রী আপনার অবহেলায় মানুষের মৃত্যু ঘটছে।’
যুক্তরাজ্যের বর্তমান স্বাস্থ্যসেবা খাত নিয়ে অ্যান্ড্রু বলেন, ‘আপনি ও আপনার দল স্বাস্থ্যসেবা খাতে কতটা ব্যর্থ হয়েছেন, যা আমরা এনএইচএস হাসপাতালে প্রতিদিনই দেখছি। ইংল্যান্ডে ৪০ হাজার নার্স ও ১০ হাজার চিকিৎসক কম রয়েছে। এঅ্যান্ডইতে অপেক্ষা করার হার এনএইচএসের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে। ক্যান্সারের রোগীদের আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সামাজিক সেবা সেভাবে হচ্ছে না। মানসিক সেবা তো পাওয়াই যায় না। প্রধানমন্ত্রী, এনএইচএস আপনার হাতে নিরাপদ নয়। আপনার এবং আপনার দলের গত এক দশকের অবহেলা প্রায় ৫ হাজার ৫০০ রোগীর মৃত্যুতে অবদান রেখেছে। আপনি যদি আমার মতো নবীন চিকিৎসক হতেন, তবে আপনার লাইসেন্সটি এখন বাতিল করে দেয়া হতো এবং আপনাকে কারাগারে পাঠানো হতো। এনএইচএস হাসপাতালে আমাদের কী প্রয়োজন তা নিয়ে আপনি আর বক্তৃতা দেয়ার উপযুক্ত নন।’
এর পর অ্যান্ড্রু বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী, আপনি যদি এই সমস্যার উন্নয়ন চান, তবে লুকিয়ে লুকিয়ে ছবি তুলতে আমাদের হাসপাতালে আসা বন্ধ করুন। এর পরিবর্তে আমাদের বিশেষজ্ঞদের কথা শুনুন। প্রশ্নের জবাব দিন।’
বার্তাবাজার/এসজে