বর্তমানে সারা দেশে কোভিড-১৯ নামে করোনা আতঙ্কের মাঝে রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদানে ব্যস্ত বহু ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্য কর্মীদের পাশাপাশি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে মানবতার পরিচয় অক্ষুন্ন রাখতে অনড় ও বদ্ধপরিকর ভূমিকা পালন করছেন চট্টগ্রামের এক চিকিৎসক দম্পতি ডাঃ জাকির হোসেন ও ডাঃ রাহেলা বানু।
স্থানীয় এলাকাবাসী ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার ব্যতীত প্রতিদিন সকাল ৯টা হতে বের হয়ে হাসপাতালের রোগী দেখার পর রাত ১১টা পর্যন্ত এলাকার রোগীদেরও চিকিৎসা সেবায় অক্লান্ত পরিশ্রম করেন এই দুই চিকিৎসক। স্কুল পড়ুয়া দুই সন্তানকে বাসায় একা রেখে সারাদিন রোগীদের সেবায় ব্যস্ত থাকেন এই ডাক্তার দম্পতি।
বর্তমানে মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের ফিজিশিয়ান ডাঃ জাকির হোসেন একজন সুপ্রতিষ্ঠিত ও স্বাবলম্বী হওয়ার পরও সন্তানদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনরাত রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার কারণ কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি ডাক্তারি পেশাকে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে গ্রহন করিনি। আমার বাবা মরহুম আলহাজ্ব আব্দুল হক কোম্পানি ব্যক্তি জীবনে যথেষ্ট মানবিক ও সমাজসেবী ছিলেন। জনগণের সেবার উদ্দেশ্যেই তিনি আমাকে ডাক্তারি পড়ার পরামর্শ দেন এবং আমিও তাঁর আদর্শে অনুপ্রেরিত হয়ে মানবিক দৃষ্টিতে ও জনসেবার উদ্দেশ্যে ডাক্তারি নিয়ে পড়ালেখা করেছি এবং ডাক্তার হয়েছি। তাই ডাক্তারিকে আমার পেশা হলেও মূলত মানব সেবার দারুণ মাধ্যম বলে মনে করি।”
একই ব্যাপারে বিশিষ্ট নারী রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ রাহেলা বানুকেও প্রশ্ন করলে, তিনি বলেন কেবল মানব সেবার উদ্দেশ্যে ডাক্তারি পেশায় যোগ দিয়েছি। এখন দেশের এমন চরম সংকটাপন্ন মুহূর্তে আমরা যদি ঘরে বসে থাকি, নিজেদের স্বার্থ সুবিধা বিবেচনা করি। তাহলে দেশের সাধারণ মানুষ কাদের কাছে যাবে? আর আমাদের চিকিৎসকদের মানব সেবার ধর্মের মর্যাদাটাও কিভাবে ঠিক থাকবে।”
করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ঝুঁকি তো আছেই। তবে তাই বলে জনসাধারণের প্রয়োজনকে তো অদেখা করা যাবেনা। আর আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যাপারে সরকার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তো যথাসম্ভব সহযোগিতা করছেনই। এছাড়া দেশের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সুবিধার্থে সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ সহ বিভিন্ন সমাজসেবী সংগঠনের প্রতি তিনি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেন, দেশের এমন চরম সংকটাপন্ন মুহূর্তে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান যদি চিকিৎসকদের প্রতি আন্তরিক মনোভাব পোষণ না করতেন৷ তাহলে চিকিৎসকদের একক চেষ্টা ও মনোবলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিরাট ব্যাঘাত ঘটতো। তবে আশার বিষয় হলো আমাদের ঐকান্তিক ইচ্ছা মনোবল ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বয়ে আমরা রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে পারছি।
উল্লেখ্য, ডাঃ জাকির হোসেন ও ডাঃ রাহেলা বানু উভয়েই চট্টগ্রামের স্বনামধন্য পরিবারের সন্তান। ডাঃ জাকির হোসেন নগরীর মোল্লাপাড়াস্থ মরহুম আলহাজ্ব আব্দুল হকের ছেলে এবং ডাঃ রাহেলা বানু কদমতলী এলাকার মরহুম আলহাজ্ব আলমগীর চৌধুরী ও মরহুম আলহাজ্ব শাহনাজ বানুর বড় মেয়ে। ডাঃ জাকির হোসেন ও ডাঃ রাহেলা বানুর এক ছেলে ও এক মেয়ে। তারা দু’জনেই চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল প্রেসিডেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এন্ড কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থী।
বলা বাহুল্য, ডাঃ জাকির হোসেন পেশাদার ডাক্তার হলেও সকলের নিকট গরীবের ডাক্তার হিসেবে প্রিয় ও সুপরিচিত। সাথে তাঁর স্ত্রী ডাক্তার রাহেলা বানুও একই উদার মন মানসিকতার মানুষ।
করোনা আতঙ্কে দেশে লুকিয়ে থাকা বেশকিছু দায়িত্ব অসচেতন ডাক্তারদের সম্পর্কে জানতে চাইলে তাঁরা কারো বিরুদ্ধে কিছুই বলতে রাজি হননি। তাঁরা বলেন, যার যার স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে ভাবার অধিকার সকলের রয়েছে। কেহ যদি রোগীদের সংস্পর্শে থাকার দরুন নিজে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাবোধ করেন। তাহলে তা তাঁর ব্যক্তি স্বাধীনতার ব্যাপার। এ ব্যাপারে আমরা কাহকে ফাঁকিবাজ বা দায়িত্বহীন বলতে পারিনা। তাঁদের ব্যাপারে যা বলার তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন। তিনি দেশের সর্বোচ্চ অভিভাবক ও অভিজ্ঞ রাষ্ট্রপ্রধান। কাকে কি বলবেন ও কার ব্যাপারে কি করবেন তা তিনি আমাদের চেয়ে নিশ্চয় ভালো জানেন। এ ব্যাপারে কারো সমালোচনা করার ইখতিয়ার আমাদের নেই।
বার্তা বাজার/এম.সি