সুন্দরবনের গোলপাতা সংগ্রহের, মৌসুম শেষ, অর্জিত হয়নি লক্ষ্যমাত্রা

এক সময় ঘরের চালে গোলপাতা ব্যবহার খুব জনপ্রিয় ছিল। প্রচন্ড গরমে অখবা প্রচন্ড শীতে গোলপাতার ঘরে বসবাস অনেকেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করতো। কালের বিবর্তনে গোলপাতা ও মাটির টালীর ব্যবহার কমে গেছে।

বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় উচ্চবিত্ত থেকে সাধারণ খেট খাওয়া মানুষের ঘরের চালে উঠে এসেছে ছাদ, এসবেস্টরস ও ঢেউ টিন। ফলে সুন্দরবনের বাওয়ালীরা পেশা পরিবর্তণ করে অন্য পেশায় ঝুঁকছে। গোলপাতা থেকে অর্জিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না বনবিভাগের।

সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবার ২৮ জানুয়ারি থেকে গোলপাতা কাটার পাস (অনুমতি) দেওয়া শুরু হয়। শেষ হয়েছে ২৬ মার্চ। চলতি মৌসুমে ৪০ হাজার মণ গোলপাতা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। প্রতি ৫০০ মনের নৌকার জন্য সর্বোচ্চ ছয় জন লোক বনে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এবার ৮১টি নৌকার পাস নিয়ে ৩৭৯ জন বাওয়ালী সুন্দরবনে গোলপাতা সংগহ করতে যায়। নির্ধারিত সময়ে গোলপাতা সংগ্রহ করা হয়েছে ৩৫ হজার ৯৭৮ মণ। রাজস্ব আদায় হয়েছে তিন লাখ ৯১ হাজার ৭৫১ টাকা।

শ্যামনগর উপজেলার হরিনগর বাজারের আইয়ুব আলী বলেন, তিনি এবার তিনটি নৌকার পাস পেয়ে সুন্দরবনে গোলপাতা কেটেছেন। বুনা শুয়ার ও ঘুর্ণিঝড় বুলবুল এর কারণে গোলগাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ভাল মানের পাতা কমে গেছে। এক একজন শ্রমিককে ২৮ দিনের ট্রিপের জন্য দিতে হয়েছে ১৪ হাজার টাকা। একটি নৌকার পাস নিতে রাজস্ব, নৌকা মেরামত, ছয় জন শ্রমিক ও তাদের এক মাসের রসিদ যোগাতে খরচ হয় থাকে প্রায় দেড় লাখ টাকা।

একটি নৌকার পাতা (১০০ কাওন ) বিক্রি হতে পারে এক লাখ ৮০ হাজার টাকায়। মান অনুযায়ি এক কাওন পাতা এক হাজার ৮০০ থেকে দু’ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। তাদের কাছ থেকে কিনে খুচরা বিক্রতারা কাওন প্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা লাভ করে থাকে।

তিনি আরো বলেন, পাকা ঘরের ছাদ, টিন ও এসবেস্টরস ব্যবহার দীর্ঘদিন থেকে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তবে সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল, কুষ্টিয়া ও মাগুরার পোল্ট্রি শিল্প মালিকরা শ্যামনগর থেকে এ গোলপাতা কেনায় ও স্থানীয় হতদরিদ্র মানুষ এখনো গোলপাতার ঘরে বসবাস করায় কিছু বাওয়ালীর জীনজীবিকা বেঁচে আছে।

এ ছাড়া আগে বনকর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে গোলপাতার নৌকায় মলম লাগিয়ে অতিরিক্ত পাতা ও গরান কাঠ নিয়ে আসা হতো। ফলে লাভ হতো অনেক বেশি। এ বছর গরান কাঠের পাস বন্ধ থাকা ও বনবিভাগের কঠোর নজরদারি থাকায় অনিয়ম করা সম্ভব হয়নি। ফলে এবারের গোলপাতা ব্যবসায় লাভ হবে সামান্য।

শ্যামনগরের কাশীমাড়ি ইউনিয়নের ঝাপালী গ্রামর বাওয়ালী জালালউদ্দিন বলেন, তিনি দীর্ঘ ২২ বছর ধরে সুন্দরবনে গোলপাতা ও মধু আহরণ করে আসছেন। বনবিভাগর চাখ এড়িয় অনক গোলবাগানের মাইজপাতা ও ঠসপাতা কেটে থাকেন। এবার বনবিভাগ সতর্ক থাকায় সেটা সম্ভব হয়নি।

তবে বেসরকারি সংস্থা লিডার্সের পরিচালক মোহন কুমার মন্ডল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনে গরান কাঠের লাইসেন্স না দেওয়ায় ওই গাছ বড় হয়ে মাটিতে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। এগুলো কাটার জন্য নিয়ম মেনেই পাস দিতে হবে। এ ছাড়া ঘুর্ণিঝড় সিডর, আইলা ও বুলবুল এর আঘাতে সুন্দরবনের ভিতরে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই দেশের দুর্যোগ মোকাবেলায় সুন্দরবনকে আবারো ভালভাবে সাজানোর জন্য সরকারের দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে। সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিতে হবে।

সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারি বনসংরক্ষক এমএ হাসান খুলনা বিভাগীয় বণ কর্মকর্তা বশিরুল আলম মামুনের বরাত দিয়ে বলেন, এবার প্রতিটি স্টেশন ও কুপ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে বিএলসি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কুপ বিএলসি’র সাথে নৌকার মিল রেখে গোলপাতা কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। মলম বাণিজ্য রোধে বিশেষ নজরদারি রাখা হয়। গোলাপাতা সম্পর্ক কোন অভিযোগ ছাড়াই শেষ হয়েছে এবারের মৌসুম।

কেএ/ বার্তাবাজার

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর