মৃ‌ত্যুপুরীর নাম ‘করোনা কুইন্স’

আপাতত আমি যেখানে আছি, সেই জায়গাটাকে বলা যায় মৃত্যুপুরী। লোকে নাম দিয়েছে ‘করোনা কুইন্স’। নিউ ইয়র্কের পাঁচটা বোরোর মধ্যে কুইন্সেই করোনা থাবা বসিয়েছে সবচেয়ে বেশি। মৃত্যুহারও সবচেয়ে বেশি। জাতীয় পর্যায়ে লকডাউন না হওয়ার ফলে মানুষের চলাচল কিছুটা হলেও আছে। যদিও আমি আমার দুই ছেলেকে নিয়ে ঘরবন্দি। নিজেরা সচেতন বলে। আমাদের কেউ জোর করেনি।

বরং আমি যে–‌কোম্পানিতে কাজ করি, তারা আমাকে ডাকাডাকি করছে কাজে যোগ দেওয়ার জন্য। আমি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি, এই অবস্থায় আমি বাইরে বেরোব না। জানি না আমার চাকরি থাকবে কি না। আমি ঢাকা থেকে নিউ ইয়র্কে এসেছি মাত্র বছর দুয়েক। আমরা এখানকার দীর্ঘ দিনের প্রবাসী ভারতীয় বা বাংলাদেশিদের মতো গ্রিন কার্ড হোল্ডার নই। অনেক সুযোগ–‌সুবিধা এখনও আমাদের নাগালের বাইরে। আমার দুই ছেলে কলেজে ও স্কুলে পড়ে। তাদের যে সরকারি সুবিধা পাওয়ার কথা, তারা পায়, সেটুকুই যথেষ্ট বলে মানি।

কুইন্স এলাকাটা যাকে বলে ডাউন মার্কেট। ঢাকার মানুষের কাছে চেনা জায়গা। কারণ, এখানকার জ্যাকসন হাইট্‌সে বাংলাদেশিরা থাকেন। এক–‌একটা গলিতে ঢুকলে মনে হবে ঢাকাতেই আছি। চারপাশে দেশের ভাষা, শাড়ি–‌গয়নার দোকান, বিরিয়ানির মশলা থেকে শুঁটকি মাছ— সব পাবেন এখানে। ভালই লাগে এত দূরে দেশের আবহ। দুধের স্বাদ ঘোলে তো মেটে!‌ কিন্তু কলকাতার বাঙালি, যারা নিউ ইয়র্কে আসেন, তারা ততটা পরিচিত নন কুইন্স এলাকাটার সঙ্গে। ডাউনটাউন ম্যানহাটান আর টাইম্‌স স্কোয়্যারের এত কাছে এ–‌রকম একটা জায়গা আছে, অনেকে ভাবতেই পারবেন না। এখানে অনেক কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ থাকেন, যারা খুব গরিব, সরকারি মাসোহারার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। ছোট ছোট সরকারি কোয়ার্টারে থাকে এক–‌একটা পরিবার, অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, অনেক বাড়ির ছেলেমেয়েরা স্কুল ড্রপ–‌আউট। এই বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য–‌সচেতনতা একেবারেই নেই। নিউ ইয়র্কের মতো শহরে তারা রাস্তায় জঞ্জাল ফেলে, নিজেরাও সারা দিন রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে। এরা অতিরিক্ত ধূমপান ও মদ্যপান করে। কুইন্স সম্পর্কে এতগুলো কথা বললাম এটা বোঝানোর জন্য যে, কেন এখানে করোনা সবচেয়ে ভয়াল আকার ধারণ করেছে। আমার মনে হয়, মূলত তিনটি কারণে। এক, নিউ ইয়র্কের দুটি বড় এয়ারপোর্ট জন এফ কেনেডি আর লাগর্ডিয়া এর কাছাকাছি। দুই, এখানকার বাসিন্দাদের একটা বড় অংশ সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মানে না। এবং তিন, অনিয়মিত জীবনযাপনের ফলে অনেকেরই শরীরের ইমিউনিটি কমে গেছে।

শনিবার পর্যন্ত পাওয়া হিসেব অনুযায়ী, নিউ ইয়র্ক শহরে যে ২৯,১৫৮টি করোনা পজিটিভ কেস ধরা পড়েছে, তার মধ্যে ৯২২৮টিই কুইন্সে। শুধু তা–‌ই নয়, করোনায় মৃতের সংখ্যাও কুইন্সেই সবচেয়ে বেশি— ১৪৩টি। আর নিউ ইয়র্ক স্টেটের কথা যদি ধরেন, রবিবারের হিসেব, করোনা–‌আক্রান্তের সংখ্যা ৬০,০০০ ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে ভয়ের কথা, খবরে বলছে, সাধারণ চিকিৎসা–‌সরঞ্জাম আর নাকি মাত্র সপ্তাহখানেকের মজুত আছে। আমরা যারা সীমাবদ্ধ আর্থিক ক্ষমতা নিয়ে বিদেশ–‌বিভুঁইয়ে পড়ে আছি, তাদের যেন প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুভয় গ্রাস করছে। যদিও দোকানপাট খোলা, তবু যাতে বেশি বেরোতে না হয়, সেজন্য আগেই বেশি করে চাল–‌ডাল, সবজি, ডিম কিনে রেখেছি। তার ওপর এখন আবার খামখেয়ালি আবহাওয়া। ঠান্ডা পুরোপুরি যায়নি। কখনও কড়া রোদ, আবার কখনও বৃষ্টি পড়ে তাপমাত্রা বেশ নেমে যাচ্ছে। রোজ ঢাকা থেকে ফোন করছেন আমার স্বামী। ছেলেরা যাতে কোনও ভাবেই না বেরোয়, সেটাই তাঁর চিন্তা। ওরা অবশ্য বাড়িতে বসে অনলাইন ক্লাস করাতে বাধ্য। সারা দিন টিভি চলছে, আপডেট দিচ্ছে, নিউ ইয়র্কে বেড়েই চলেছে সংক্রমণ আর মৃত্যু। আমাদের পাড়াতেও খবর পেয়েছি একজন মারা গেছেন। সবাই বলছে, লকডাউন ছাড়া এই মহামারি রোখা অসম্ভব। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তা বলছেন না। অতএব স্বেচ্ছাবন্দি হয়ে থাকা ছাড়া আর বাঁচার পথ কী?‌

বার্তাবাজার/কে.জে.পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর