শেখ রিজাউল হক দিপু। একজন মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা। ঢাকার সাভার উপজেলার শিল্প অধ্যুষিত আশুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন। এই থানায় আসার পরে শিল্পাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা অবস্থার প্রভূত উন্নতি হয়েছে।
দেশের চলমান করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে আশুলিয়া এলাকার মানুষকে সরকারি বিধিনিষেধ মানতে এবং নির্দিষ্ট সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে তার পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে নানা সচেতনতামূলক কার্যক্রম নেয়া হয়েছে।
তবে সরকার ঘোষিত আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধকালীন সময়ে আশুলিয়া থানাধীন বসবাসরত বাসিন্দাদের বাসায় অবস্থান নেওয়ার ব্যাপারে এবং বাজার ও অন্যান্য এলাকায় একে অন্যের থেকে নির্দিষ্ট সামাজিক দূরত্ব (৩ ফুট) না মেনে নির্বিকার মনোভাব তাকে ব্যথিত করেছে।
শনিবার (২৮ মার্চ) তিনি তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের টাইমলাইনে এক স্ট্যাটাস দিয়েছেন। বার্তাবাজারের পাঠকদের জন্য ওই স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলোঃ
“আজ মার্চ মাসের ২৮ তারিখ । সারাদিন অন্তত ৪/৫শত ফোন এসেছে। সকল ফোনগুলিই ছিল দোকান খোলা কেন? মানুষ বাইরে কেন? আপনারা কেন এগুলি দেখছেন না? ইতালি ফেরত নাগরিক কেন ঘুরে বেড়াচ্ছে? বিভিন্ন জায়গায় কেন ক্যারম বোর্ড খেলা হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি জবাবদিহি মূলক প্রশ্ন।
একজন সচেতন শিক্ষিত নাগরিক আমাকে ফোন দিয়ে বললেন, ওসি সাহেব, লোকজনের জন্য হাঁটা যাচ্ছেনা দেখবেন প্লিজ। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, জনাব আপনি কেন বাহিরে এসেছেন? তিনি উত্তর দিলেন এই একটু এসেছি আরকি!
সত্যিই আজ অনেক জায়গায় দোকান খোলা ছিল অন্যদিনের থেকে বেশি । মানুষও অনেক বেশি চলাফেরা করছে কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোন সদস্য কারো সাথে শক্তি প্রয়োগ করেননি খারাপ আচরণ করেননি। ভালোভাবে সবাইকে বলেছি, ভাই ঘরে যান, দোকান বন্ধ করেন বাহিরে কেন আসছেন? কিন্তু কেউই কর্ণপাত করেনি কারণ শক্তি প্রয়োগ হয়নি।
আমি কোন নাগরিকের সাথে শক্তি প্রয়োগ বা খারাপ আচরণ করে সমালোচনার পাত্র হতে চাই না। তবে একটি কথা বলতে চাই, আমিও এ দেশের একজন নাগরিক। কোন রকম প্রটেকশন ছাড়াই আমরা যেভাবে রাষ্ট্রের নাগরিকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেটা আপনারা দেখেছেন।
আমি আশুলিয়া থানার ব্যারাকে থাকি, এখান থেকে আমার বাসা উত্তরা যেতে মাত্র ১০ মিনিট লাগে। আমি আজ ৮দিন আমার বাসায় যাই না; কারণ আমার নিরপরাধ স্ত্রী সন্তানদের অরক্ষিত করার ঝুঁকির মধ্যে ফেলানোর কোন অধিকার আমার নেই। আমাকে মানুষের মধ্যে থাকতে হয়, তাই শঙ্কায় আমি আমার পরিবারের নিকট যাই না।
ইতালি, ইউরোপ, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য থেকে যেসব নাগরিকরা এসেছেন তাদের প্রত্যেকের বাড়ি আমার সহকর্মীরা এবং আমি নিজেও একাধিকবার গিয়েছি। অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাদের অনুরোধ করেছি, ভাই ঘরে থাকেন।
কিন্তু তারা কি কেউ কথা রেখেছে? অনেকেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন রীতিমতো। অসহায় প্রতিবেশীরা আমাকে ফোন দিচ্ছেন, ওসি সাহেব, ইতালি প্রবাসী কেন ঘোরাফেরা করছে? কেন দেখেন না?
ভাই, আমিতো অনেকবার বলেছি। এখন দরকার শক্তি প্রয়োগ। বাধ্য করা ছাড়া তিনি কখনো ঘরে থাকবেন না। আমার একজন অফিসার এক অবাধ্য ইতালি প্রবাসীকে জোর করে ঘরে ঢুকিয়ে ঘরে তালা দিয়ে তার মায়ের কাছে চাবি দিয়ে এসেছেন।
সেই থেকে তিনি জ্বরে আক্রান্ত। যেটা তিনি ফেসবুকে লিখেছেন। তিনি হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন। আমরা তো ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছি। কতিপয় প্রবাসী কেন দেশের সকল নাগরিকদের বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন?
মনে রাখা উচিত, ভাইরাসটি চীনের শুধু একজন নাগরিকের হয়েছিল। সেখান থেকে সারা পৃথিবীর প্রায় ২০০ টি দেশের হাজার হাজার লোক আক্রান্ত। কত লোক মারা গিয়েছে আপনারা নিজেরাও দেখছেন। এটা কোন সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড় নয় যেটা দুর্বল হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশের একটা রাজ্য উড়িষ্যা হয়ে চলে যাবে। এটা আস্তে আস্তে বাড়বেই। ইতিহাস তাই বলছে।
এখনই যদি বাহিরে ঘোরাফেরা করা অবাধ্য নাগরিকদের ঘরে থাকতে বাধ্য করা না হয়, ভবিষ্যতে খুব ভালো কিছু আশা করছে বলে আমার মনে হয় না। রাষ্ট্র যখন কোয়ারেন্টাইনে এর জন্য বাড়ি প্রস্তুত করতে যাচ্ছেন, তখনই এলাকার লোকজন সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে বাঁধা দিচ্ছেন।
আক্রান্ত লোকদের রাখার জন্য হসপিটাল প্রস্তুত করতে গেলেও বাঁধা আসছে। আগামী দিনে যদি কেউ আক্রান্ত হয়ে মারা যান, তাদের জন্য কবরস্থান প্রস্তুত করতে গেলেও বাঁধা আসছে।
আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। একজন লোক মারা যাক আমি চাইনা। তবে ইতিহাস সেটা বলছে না। মৃত্যু যখন শুরু হবে তখন যেন বুদ্ধিমানেরা না বলেন, সরকার কেন আগে থেকেই কবরস্থান ঠিক করে রাখেনি? ভয়ঙ্কর এই ভাইরাসের পরিসমাপ্তি শুধুমাত্র প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কারের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটতে পারে যেটা হয়তো আল্লাহ একদিন আমাদের দিবেন ক্ষমতা। এর আগে আমাদের সকল প্রস্তুতি রাখা উচিত, ইতিহাস তাই বলে।
আমেরিকা, ব্রিটেন, ইতালি, স্পেন, চায়না পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে আমার অনেক আত্মীয় স্বজন থাকেন। তাদের কাছে শুনেছি কি ভয়ংকর দিন তারা পার করছে। বাংলাদেশের মানুষের মত এত কোমল হৃদয়ের মানুষ পৃথিবীতে আছে কিনা জানিনা।
কোন গরীব মানুষ ঘর থেকে বাহির না হতে পারলে না খেয়ে মারা যাবে এটা আমি বিশ্বাস করিনা। প্রতিবেশীরাই তাদের খাবার পৌঁছে দেবে। ইতিমধ্যে অনেকে দিচ্ছেনও।
এখনই যদি অবাধ্য জনস্রোত নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, আমাদের জন্য সামনে ভয়ঙ্কর কিছু আশা করছে। এখন দরকার শুধু কঠোর হওয়া। প্রয়োজনে নির্মম হওয়া। কারণ দেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে। এটাকে কোনভাবেই তাচ্ছিল্য করে সংক্রমিত হতে দেওয়া যাবে না।”
কেএ/বার্তাবাজার