সিরাজদিখানে দুই গরু চোর আটক, আহত দুই গরু মালিক

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলায় চিত্রকোট ইউনিয়নের মরিচা ব্রীজের ঢালে অর্গানিক ভ্যালী নামের একটি গরুর খামার থেকে একটি গরুসহ দুই গরু চোরকে আটক করেছে গ্রামবাসী।

বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার দিকে গোয়ালখালী গ্রামের মৃত কালাচান রায়ের পুত্র কমলকান্ত রায় তাদের নিজের পুকুর পাড়ে গরু বেধে রেখে আসে । ১ ঘন্টা পর গরু আনতে গিয়ে দেখেন তার গরুটি যথাস্থানে নেই।

অনেক খোজাখুজির পর কিছুদুরে অর্গানিক ভ্যালীতে গরু খোজতে যায়। খোজার এক পর্যায়ে ভেতরের বাথরুমে গরুর ডাকের শব্দ শুনতে পেলে অর্গানিক ভ্যালীর কর্মচারী আজগর আলীকে গেইট খোলতে বললে সে জানায় প্রতিষ্ঠানের কেয়ারটেকা কেরাণীগঞ্জ উপজেলার লাখিররচর গ্রামের-নিষেধ আছে তালা খোলার জন্য।

এক পর্যায়ে দরজা খোললে দেখা যায় কমলকান্ত রায়ের গরুটি পা বাধা অবস্থায় সেখানে পড়ে আছে । সেখান থেকে বের হয়ে কমলকান্ত রায়ের ডাক চিৎকারে একজন দুজন করে গ্রামের লোকজনসহ আশেপাশের ৫গ্রামের সহস্রাধিক লোক হাজির হয়ে যায়।

ততক্ষনে গরুচোর মঙ্গল তার সিন্ডিকেটের লোকজনকে খবর দিলে তারাও একগ্রুপ চলে আসে ঘটনাস্থলে । তাদের বাড়ী কেরাণীগঞ্জ হওয়ায় প্রভাব সৃষ্টি করে ।

চিত্রকোট ইউনিয়নের কালিপুর গ্রাম থেকে চুরি যাওয়া গরুর খোজে আসা শফিকুল ইসলাম লেহাব ও দার পুত্র মো: ইমরান হোসেন উচ্চস্বরে চিৎকার করলে মঙ্গলের ফোনে আসা সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্যরা তাদের উপর চড়াও হয়ে হামলা করে রক্তাক্ত জখম করে । পরে তারা ইছাপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়।

ঘটনাস্থল থেকে গরুচোরের সর্দার ঢাকা জেলার কেরাণীগঞ্জ উপজেলার লাখিরচর গ্রামের মঙ্গল মিয়া (৪৫), দিনাজপুর জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার বাঙ্গালী বোস গ্রামের সোহরাব আলীর পুত্র আজগর আলী(৩৫)কে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
পরে ঘটনাস্থল থেকে গ্রামবাসী সিরাজদিখান সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রাজিবুল ইসলাম ও সিরাজদিখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: ফরিদউদ্দিনকে ফোন দিলে তারা পুলিশ পাঠিয়ে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রন আনেন।

ঘটনাস্থলে থাকা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও জনতার সামনেই শেখরনগর তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম চোরকে সেভ করার জন্য যথেষ্ঠ ভূমিকা রাখেন । অবশেষে সিরাজদিখান সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রাজিবুল ইসলাম ও সিরাজদিখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: ফরিদউদ্দিনের সহায়তায় পুলিশ মামলা নেয়।

এলকাবাসী জানায়, ২ মাস যাবৎ গরু চোর সিন্ডিকেট বেপরোয়া হয়ে উঠেছে । তাদের আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে এলাকার মানুষ। প্রতিরাতেই কোনো না কোনো গ্রামে হানা দিচ্ছে সংঘবদ্ধ চোরের দল। গত ২ মাসে প্রায় ৩৪টি গরু চুরি হয়েছে এতদঞ্চল থেকে। গভীর রাতে গোয়াল ঘর থেকে গরু চুরি করে নাম্বার বিহীন ট্রাক, পিকাপ, সিএনজিতে উঠিয়ে নিয়ে যায় চোরেরা।

আর এসব ঘটনায় খুব কম সংখ্যক মামলাই রেকর্ডভুক্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তরা প্রতিকার পাবেন না এ আশংকা বা পুলিশি হয়রানির ভয়ে থানায় অভিযোগও দেন না। ফলে চোরের দল পার পেয়ে যাচ্ছে নির্বিঘ্নে।

পুলিশের নজরদারির অভাব থাকার কারণে চুরি ঠেকানো যাচ্ছে না বলে অনেকের অভিযোগ। সংঘবদ্ধ চোরের দল নানা কৌশলে চুরি করে যাচ্ছে। আহত শফিকুল ইসলাম লেহাব জানায়, আমি শুনেছি অর্গানিক ভ্যালীতে গরুসহ চোর আটক হয়েছে।

তাই দেখতে গিয়েছি আমার হারানো গরু সেথানে আছে কিনা । যাওয়ার পর মঙ্গলের সন্ত্রাসী বাহিণী আমার ও আমার পুত্র ইমরানের উপর হামলা চালিয়ে আমাদের রক্তাক্ত জখম করে । এ ঘটনায় সিরাজদিখান থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করি।

মুক্তিযোদ্ধা হরিআনন্দ বাড়ৈ বলেন, অর্গানিক ভ্যালীতে অনেক অপকর্ম হয়। এ প্রতিষ্ঠানের মালিক আশা শাহাদাৎ একজন ভূমি দস্যুও । সে আমার ও আমার চাচাত ভাইদের জমি চোর করে মাটি কেটে জমি দখলে নেয়।

গোয়ালখালী ডাকপাড়া গ্রামের হালিম মিয়া জানান, অর্গানিক ভ্যালীর মালিক আশা শাহাদাত পুকুর খননের মাটি বিক্রি করার কথা বলে আমাদের থেকে ১০ লক্ষ টাকা নেয় । পরে বলে অধিগ্রহণের জমির মাটি কাটতে।

আমরা না কাটতে চাইলে সে আমাদের ডেকে নিয়ে ভাড়াটে মন্ত্রাসীদের দিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দেয় এবং কুকুর ছেড়ে দিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। গোয়ালখালী বাজার সমিতির সাধারণ সম্পাদক শংকর মন্ডল বলেন, আমার দোকানে ১ বছর হল দুর্ধর্ষ ডাকাতি হয়েছে কিন্ত পুলিশ কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

প্রতি রাতে গরু ঘরে চোরের দল হানা দিয়ে থাকে। যাদের গরু আছে তারা রাত জেগে পাহারা দেয়। চুরি যাওয়া গরুর মালিক সিরাজ মিয়া জানান, আমি একজন রিক্সা চালক । আমার একটি মাত্র ছেলে । সে বোবা। তার জন্য জমানো টাকা দিয়ে একটি গরুর বাছুর কিনি । সেটা বড় হলে।

গত কয়েকদিন আগের ফজরের আজানের আগে কয়েকজন টানতে টানতে আমার গরু নিয়ে অর্গানিক ভ্যালীতে ঢুকিয়ে দেয় । আমরা চিৎকার করিলে কুকুর ছেড়ে দিবে বলে ভয় দেখালে আমরা চলে আসি।

ঘটনাস্থলে থাকা চিত্রকোট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাসমুল হুদা বাবুল বলেন, গোয়ালখালী, কামারকান্দা,মরিচা, কমলপুর,কালিপুরসহ আমার ইউনিয়নের প্রায় গ্রামেই প্রায় ২ মাস যাবৎ গরু চুরি হচ্ছে।

গরীব মানুষ অনেকে এনজিও থেকে কিস্তি নিয়েও গরু কিনেছে বরে আমি জানি। এসব মানুষের গরু চুরি হওয়ায় একদিকে কিস্তি দিতে হচ্ছে অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। এ এলাকার মানুষ গরুর দুধ বিক্রি করে পরিবারের খরচের টাকা যোগায়। কৃষি নির্ভর পরিবারগুলো গরু দিয়ে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে।

আর গরু চোরেরা যখন এসব মূল্যবান গরু চুরি করে নিয়ে যায় তখন হতদরিদ্র এসব পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তিনি আরো বলেন, সার্কেল এএসপি ও ওসি সাহেবের ভূমিকা ভাল থাকলেও শেখরনগর তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম সাহেবের ভূমিকা দু:খজনক । তিনি প্রকাশ্যে চোরের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।

শেখরনগর তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম সবুজ সাংবাদিকদের কোন প্রশ্নের জবাব দিবেন না বলে জানান ।
সিরাজদিখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: ফরিদউদ্দিন জানান, গরু চুরির ঘটনায় একটি চুরি মামলা হয়েছে।

চুরির সাথে জড়িত দুজনকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে চুরি যাওয়া গরু। তবে মারামারির ঘটনায় এক পক্ষ অভিযোগ করেছে, এবং অর্গানিক ভ্যালী ভাংচুরের জন্য একটি অভিযোগ করেছে।

কেএ/বার্তাবাজার

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর