চারিদিকে করোনা ভাইরাস (কভিড-১৯) আতঙ্ক। অনেকটা লক ডাউন অবস্থা। এর মধ্যেই কেউ মানছেন, কেউবা পেটের দায়ে রাস্তায় নেমেছেন- একবেলা খাবারের সন্ধানে। করোনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন উত্তাল। সবাই বিভিন্ন রকম পোস্ট করছে। আজ একটি পোস্ট দেখে চোখ আটকে গেল।
পোস্টটি করেছেন দক্ষিনখান এবং উত্তরখান জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার এএসএম হাফিজুর রহমান। তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে পোস্টটি সরাসরি পেস্ট করা হলোঃ
গতকাল রাত সাড়ে দশটা।খবর পেলাম দক্ষিণখান এলাকার অল্প কিছু এলাকায় এখনো কিছু দোকানপাট(নিত্যপ্রয়োজনীয় নয়) খোলা আছে।দেরী না করে ছুটলাম।৭-৮ জন ফোর্স নিয়ে সেসব এলাকায় যেতেই নিমিষেই ঝটাঝট সব বন্ধ হয়ে গেল।
হঠাৎ চোখ পড়লো এক অশীতিপর রিক্সাওয়ালার দিকে।মলিন মুখ।ক্লান্ত শরীর।সাদা চুলগুলোতে ধূলোর আস্তরণ।আঁটিপাড়া মোড়ে চুপচাপ বসে আছেন।সবাই ছুটাছুটি করলেও তিনি যেন শান্ত সমুদ্র হয়ে গেছেন।
একদম নির্বিকার।
-চাচা লোকজন তো কেউ নাই।একদম জনশূন্য।ভাড়া মারতে পারবেন না আর।বাসায় চলে যান।
-বাড়িত ত যামো রে বাবা,কিন্তু খাইমো কি, কনদিখি।আইজকা কোমরটাত ব্যাথা আছিল খুব;তাই সারাদিন রিক্সা নিয়া বাইর হতে পারি নাই।চাইরপাশত কী যে শুরু হইল বাবারে।
সামাজিক দূরত্বে তার সাথে আলাপ জমে উঠে।কখনো হাসেন তো কখনো তিস্তা নদীর মতো টলটলা হয়ে উঠে তার মহাকালের চোখ দুটো। চাচা একা।স্ত্রী শিমুল মারা গেছেন বছর সাতেক হলো।মেয়ের নাম খোদেজা।
বিয়ে দিয়েছেন পাশের গ্রামেই।জামাই ভটভটি চালাতো।দু’বছর হলো এক্সিডেন্ট করে পড়ে আছে।ছেলে গ্যাসলাইট মেকার।মাঝে মাঝে গরুর হাটে দালালীও করে।ওর নেশাপানির টুকটাক অভ্যাসটা বয়স বারো-তের থেকেই।
কে তার আপনজন?রিক্সার প্যাডেলেই এখন মিশে থাকে চেনা ক্ষুধা।অপার্থিব জীবীকা।অচেনা শহর।ঝিমানো সরু গলীপথ।স্ত্রী শিমুলের তিলকালো মুখ।মেয়েটার ‘বাবা’ ডাক।প্রিয় নাতিটার টেমটেমি গাড়ি।ফেলে আসা সব দিন।
-ছেলেটার কথা মনে পড়েনা চাচা?
– ধুরো,ওইটা একটা জঞ্জাল।শুনছি গাঞ্জা খাওয়া শুরু কইরছে।আমার কাছে ফোন দিয়া ওরে টাকা পাঠাইতে কয়;কনদিখি ক্যামন লাগে।শালায় দালাল হয়া গেছে গায়ে-গতরে।
রাত বাড়ে।চাচার কথা আরো কাতর হয়ে উঠে।একজন পুলিশ সদস্যের হুইশেলে ধ্যান ভাঙে।চাচাকে মাস্ক আর সামান্য শুকনো খাবার কিনে দিতেই আবারো বলে উঠলেন-
-বাবা এই ভাইরাসটা কবে দূর হবে বলতে পারেন নাকি?হামরাগুলার কী হবে?ক্যামনে পেট চইলবে?
কিছুদিন অপেক্ষা করেন চাচা।সরকার সব ব্যবস্থা করবে।সবার খাবারের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।আপনারা শুধু সরকারি বিধি-নিষেধগুলো মেনে চলেন।দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
রাত বাড়ে।চাচা মাস্ক পড়ে মিহি গলায় কি একটা বলতে বলতে এগিয়ে যায় ময়নারটেকের দিকে। আমি আনমনে তাকিয়ে থাকি তার যাওয়ার দিকটায়। পৃথিবীতে এখনো ভালো মানুষ আছে। পুলিশ জনগনের বন্ধু। এটা আবারো প্রমান হলো।
কেএ/বার্তাবাজার