আমার জ্ঞানের পরিধি খুব সীমিত। তবুও খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে করোনা ভাইরাস (COVID-19) প্রতিরোধে খাদ্যাভাস নিয়ে কিছু কথা লিখছি।
খাদ্য তালিকা তৈরির পূর্বে জানা প্রয়োজন কেন এই খাবারগুলো খাবেন,কিভাবে খাবেন,কতটুকু খাবেন এবং খাবারগুলো কিভাবে কাজ করবে।
করোনা ভাইরাস মূলত দেহে প্রবেশ করে ফুসফুসকে আক্রান্ত করে শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে যাদের ইমিউনিটি সিস্টেম দূর্বল তাদের সহজেই এই ভাইরাস কাবু করে ফেলতে পারে। অপরদিকে বাচ্চাদের এবং তরুনদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি হবার ফলে তারা সহজেই এই সংক্রামক ভাইরাসকে মোকাবেলা করতে পারে।
কাজেই বুঝতে পারছেন, এই মুহুর্তে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে ইমিউনিটি সিস্টেম কে শক্তিশালী করা। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এরকম খাবার খেতে হবে প্রতিদিন। তবে মাত্রাতিরিক্ত খাওয়া যাবে না। ততটুকুই আপনার শরীরে কাজ করবে যতটুকু প্রয়োজন৷ কাজেই প্রয়োজনের অধিক গ্রহন করলেও তা কাজে দিবেনা। দেহ চাহিদার কম খাদ্য গ্রহন যেমন অপুষ্টি তেমনি অধিক খাদ্য গ্রহন ও অপুষ্টি। তাহলে দেহ চাহিদা কি বা কতটুকু? দেহ চাহিদা হচ্ছে আপনার ওজন, উচ্চতা এবং পরিশ্রমের উপর নির্ভর করে আপনার কতটুকু খাদ্য গ্রহন করতে হবে সেটি। একজন রিক্সাচালক এবং একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার পুষ্টিচাহিদা এক নয়।
রিক্সাচালকের পুষ্টিচাহিদা বেশি কারণ তার পরিশ্রম তুলনামূলক বেশি করতে হয়। আবার শুধু চাহিদা অনুযায়ী খাবার খেলেই হবেনা। সুষম খাদ্য খেতে হবে। অর্থাৎ খাবারে ভাত/রুটি,মাছ/মাংস, সবজি, ফল (ভিটামিন, প্রোটিন,শর্করা, খনিজ,পানি) ইত্যাদি থাকতে হবে।
যদি সাধারণভাবে বলি তবে গড়ে প্রাপ্তবয়স্ক নারী,পুরুষের চাহিদার কথা বলতে হবে। দেহের ইমিউনিটি সিস্টেম তথা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিকারী কিছু উপাদান হচ্ছে – Vitamin ‘C’, Vitamin ‘D3’, Vitamin ‘E’ Zinc, Magnesium, Selenium, Carotene etc.
আমি মনেকরি বিভিন্ন ঔষধ কিংবা কৌটাজাত ভিটামিনের গুড়ার চেয়ে সরাসরি খাবার থেকে ভিটামিন সহ অন্যান্য উপাদান গ্রহন করা শ্রেয়।
ভিটামিন সি (Vit-C) :
আমলকি,কমলা,মাল্টা, জাম্বুরা,পেঁপে, লেবুসহ টক জাতীয় ফলে ভিটামিন সি পাওয়া যায়।
একজন বয়স্ক লোকের প্রতিদিন ৩০ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ দরকার। দিনে দুটো আমলকি খেলে এ পরিমাণ ভিটামিন ‘সি’ পাওয়া যায়।
আমলকিতে কমলার চেয়ে ১৫ থেকে ২০ গুণ বেশি, আপেলের চেয়ে ১২০ গুণ বেশি, আমের চেয়ে ২৪ গুণ এবং কলার চেয়ে ৬০ গুণ বেশি ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে। একটা কমলায় প্রায় ৭০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি আছে। ১০০ গ্রাম মাল্টায় আছে ৩২ মিলিগ্রাম এবং ১০০ গ্রাম জাম্বুরায় আছে ৬১ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি।
প্রতি ১০০ গ্রাম পেঁপেতে ৬০ মিলিগ্রামের মতো ভিটামিন সি পাবেন।১০০ গ্রাম লেবুতে ৫৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি পাবেন।
ভিটামিন ডি(Vit D) এবং জিংক:
সামুদ্রিক মাছ, সামুদ্রিক মাছের তেল, ডিমের কুসুম, মাশরুম, পনির,গরু-খাসির কলিজা, আটা-ময়দার রুটি, দুগ্ধজাত খাদ্য, শিমজাতীয় উদ্ভিদ, মসুর ডাল, চীনাবাদাম, লবস্টার ইত্যাদি জিংকের খুব ভালো উৎস।
এছাড়াও খেতে পারেন Cod liver oil। এতে Vitamin ‘A’, Vitamin D3, Vitamin E আছে।
সুস্থতার জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর প্রতিদিন ৮ মিলিগ্রাম ও পুরুষের জন্য ১১ মিলিগ্রাম জিংক গ্রহণ করা প্রয়োজন।
একটি বড় ডিমে থাকে ০.৬ মিলিগ্রাম জিংক। কুমড়ার বীচিতে থাকে ২.২ গ্রাম জিংক।
এক কাপ ফ্যাটমুক্ত দুধে রয়েছে ১ মিলিগ্রাম জিংক। এক কাপ টকদইয়ে রয়েছে ২.২ মিলিগ্রাম জিংক।যেসব ডার্ক চকোলেটে ৬০-৬৯ ভাগ কোকো, সেগুলোয় ০. ৮ মিলিগ্রাম জিংক থাকে। অন্যদিকে যেসব ডার্ক চকোলেটে ৭০-৮৫ ভাগ কোকো, সেগুলোয় ০.৯ মিলিগ্রাম জিংক থাকে। তিন আউন্স লবস্টারে রয়েছে ৩ দশমিক ৪ মিলিগ্রাম জিংক।
ম্যাগনেসিয়াম :
বাদামী চাল, মসুর ডাল, ঢেঁড়স, রসুন, ডার্ক চকলেট, কলা, পালং শাক, কাজু বাদাম, আমন্ড, অ্যাভোকাডো, ডুমুর ইত্যাদিতে ম্যাগনেসিয়াম পাওয়া যায়।
চাহিদার ২১% মেলে এক কাপ ব্রাউন রাইসে।এককাপ সেদ্ধ ঢেঁড়সে আপনি পাবেন চাহিদার ১৪%।এক কাপ মসুর ডালে রয়েছে চাহিদার ১৮%।ডার্ক চকলেটে ৫৮%, মাঝারি আকারের কলায় ৮%,এক আউন্স কুমড়ো দানায় ১৯%,
এক কাপ পালংশাক ৩৯%,এক আউন্স কাজু দৈনন্দিন চাহিদার ২০% পূরণ করে।চাহিদার অর্ধেক পূরণ হয় হাফ কাপ রোস্টেড সয়াবিনে।এক আউন্স (২৮.৩৪ গ্রাম) অ্যামন্ডে দৈনন্দিন চাহিদার ১৯% পূর্ণ হবে।একটি আভোকাডোতে ১৫%, এক কাপ ডুমুরে আছে চাহিদার ২৫% ম্যাগনেসিয়াম।
সেলেনিয়াম:
সেলেনিয়ামের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উৎস হচ্ছে ব্রাজিলিয়ান নাটস।প্রতিদিন মাত্র ২ টি নাটস খেলে পূরণ হবে দৈনিক সেলেনিয়ামের চাহিদা।এছাড়া,টুনা,টার্কি মুরগী,চিংড়ি,ডিম প্রভৃতিতে সেলেনিয়াম রয়েছে।
ভিটামিন ই (Vitamin E) :
ভিটামিন ই শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা সংক্রমণের সঙ্গে লড়াইয়ের ক্ষমতা বাড়ায়। আমন্ড, কাজু, আখরোট, চিনেবাদাম, পালং শাকের মতো খাবারে প্রচুর পরিমাণে এই ভিটামিন রয়েছে।
ক্যারোটিন:
রঙিন শাক সবজি, বিট, গাজর, মিষ্টি আলু, লেটুস পাতা, ক্যাপসিকাম ইত্যাদিতে ক্যারোটিন রয়েছে।
ভিটামিন শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। তাই প্রতিদিন সবুজ শাক সবজি, ফল খাদ্যতালিকায় রাখুন। এবং উপরোক্ত উপাদান গুলোর প্রতিটিই ঘুরেফিরে খাদ্যতালিকায় রাখুন।
পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খান, সুস্থ থাকুন। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে খাদ্য রান্না -পরিবেশন-গ্রহন করুন। ঘরের ভিতর থাকুন।
লেখক: খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগ (৩য় বর্ষ),
বাংলাদেশ গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ।