করোনা আতঙ্কে জনশূণ্য হয়ে পড়ছে রাজধানী

রাজধানীর রাজপথে এখন আর আগের চিরচেনা প্রাণচাঞ্চল্য নেই। ব্যস্ততম এলাকাগুলো হয়ে পড়েছে জনশূণ্য, ব্যস্ততম সড়কগুলো হয়ে পড়েছে যানহীন। করোনাভাইরাস আতঙ্কে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নগরবাসীর একটি বড় অংশই রাজধানী ছেড়ে চলে গেছে, আবার অনেকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যারা রাজধানী ছাড়েননি, তারাও প্রয়োজন ছাড়া বাসার বাইরে পা ফেলছেন না; জনসমাগমের স্থানগুলো এড়িয়ে চলছেন। সব মিলিয়ে পাল্টে যাচ্ছে রাজধানীর চিত্র। সন্ধ্যার পর আলো ঝলমলে, কোলাহলমুখর ঢাকা এখন অনেকটাই থমথমে হয়ে গেছে।

নগরবাসী জানায়, সরকারের নির্দেশনাও ঢাকার রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। সরকারি, বেসরকারি সব অফিসেই নির্ধারিত সময়ের আগে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। পথেঘাটে যেসব মানুষ দেখা যায়, তাদের অধিকাংশের মুখে উদ্বেগ। গন্তব্যে পৌঁছলে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচবেন।

রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষকে বৃহস্পতিবার ঢাকা ছাড়তে দেখা গেছে। ঢাকার এ নদীবন্দর থেকে প্রতিদিন ৬০-৭০টি লঞ্চ বিভিন্ন গন্তব্যে যায়। এর বাইরেও বিভিন্ন জেলাপর্যায়ে লঞ্চ চলাচল করে। ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া লঞ্চে যাত্রী থাকে গড়ে সহস্রাধিক আর ঢাকার বাইরে কয়েকশ। ঢাকার সদরঘাট থেকে বরিশাল, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি, ভোলাসহ বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন মানুষ। গতকাল দুপুরের পর থেকে মানুষের ঢল নামে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। ঠাসাঠাসি করে মানুষ বাড়ি যাচ্ছেন করোনা সংক্রমণের ভয়ে।

ঢাকা নদীবন্দরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক আরিফ উদ্দিন বলেন, রোগের সংক্রমণ ঠেকাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী টার্মিনালে সতর্ক বাণীসংবলিত প্রচার চালানো হচ্ছে। পরিচ্ছন্নতা ও স্যানিটাইজেশনের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এদিকে প্রতিদিন অন্তত ২ লাখ ৭০ হাজার মানুষ ট্রেনে ভ্রমণ করেন। বেশিরভাগ ট্রেনই চলে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে। আন্তঃনগর, লোকালসহ ৩৬০ ট্রেন দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচল করে। স্টেশন-প্লাটফর্মেও প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে। গতকাল ভিড় দেখা যায় ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে। কমলাপুর স্টেশনের ম্যানেজার আমিনুল ইসলাম জানান, ইন্টারসিটি, মেইল ও কমিউটার ৫২ জোড়া এবং ১৬ জোড়া লোকাল ট্রেন ঢাকা থেকে ছেড়ে যাচ্ছে। প্রতিটি ট্রেনেই মানুষের ভিড়। এই অবস্থার বড় কারণ করোনা ভাইরাসের প্রকোপ।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিটি ট্রেন ও স্টেশনে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। স্টেশন ও ট্রেনের ভেতরে হাত ধোয়ার জন্য পর্যাপ্ত হ্যান্ডওয়াশ-স্যানিটাইজার মজুদ রাখা হচ্ছে। ট্রেন ও স্টেশন এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। তবে রেল সচিব মোফাজ্জেল হোসেন জানান, পরিস্থিতি ভয়াবহ হলে ট্রেন বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না। আর রেলের মহাপরিচালক শামসুজ্জামান বলেন, স্টেশন ও ট্রেন নিয়মিত পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকালে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল গিয়ে দেখা গেছে, দূরপাল্লার বাসের জন্য অনেক যাত্রী অপেক্ষা করছেন। আলাপকালে একজন যাত্রী জানান, ছেলেমেয়েদের স্কুল বন্ধ। সে কারণে স্ত্রীসহ ছেলেমেয়েদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। গাবতলী বাস টার্মিনালের একজন বাস মালিক বলেন, গত দুই-তিন দিন ধরেই দূরপাল্লার বাসগুলোতে ভিড় লেগেই আছে। পরিবার-পরিজনকে মানুষ গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

করোনার ঝুঁকি এড়াতেই মানুষ ঢাকা ছাড়ছে। ঢাকায় চলাচলরত সিটি সার্ভিসের বাসগুলোতে যাত্রী সংখ্যা অনেকটাই কমে গেছে। কোন স্টপেজ থেকেই পর্যাপ্ত পরিমাণ যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে বাস চালকরা। যার কারণে মালিকরা বাসের ট্রিপও কমিয়ে দিয়েছেন।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির এক নেতা বলেন, গত কয়েক দিন ধরেই বাসগুলোতে যাত্রী সংখ্যা কমে গেছে। করোনা সংক্রমণের প্রস্তুতি না থাকার কারণেও অনেক যাত্রী গণপরিবহন এড়িয়ে চলছেন বলে জানান তিনি।
প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত রাজধানীর হাতিরঝিলে শত শত মানুষ হাঁটতে এবং দৌড়াতে বের হন। হাতিরঝিলের ওয়াকওয়েতে দৌড়াতে হয় সাধারণ মানুষের ভিড় ঠেলে। তবে বৃহস্পতিবার সকালের চিত্র ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। এদিন সকাল ৬টার দিকে হাতিরঝিলে গিয়ে দেখা যায়, মানুষের কোনো ভিড় নেই। সাড়ে ৭টা পর্যন্ত পুরো হাতিরঝিল এলাকায় হাতেগোনা কয়েকজনকে দেখা গেছে। যারা হাঁটতে বা দৌড়াতে বের হয়েছিলেন, তারাও দ্রুত বাসায় ফিরে গেছেন।

করোনা আতঙ্কে শুধু হাতিরঝিলই নয়, পুরো নগরীতেই প্রয়োজন ছাড়া কেউ বের হচ্ছেন না। সবার মধ্যেই আতঙ্ক বিরাজ করছে। গত দুদিন ধরেই নগরীর বিভিন্ন স্থানের চিত্র এমনই দেখা গেছে। এই দুদিন নগরীর বিভিন্ন এলাকায় যানজটও ছিল না বললেই চলে। এদিকে করোনা আতঙ্কে অনেকেই ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন। সকাল থেকেই বাস টার্মিনালগুলোতে দূরপাল্লার যাত্রীদের ভিড়ও দেখা গেছে।

করোনা আতঙ্কে প্রয়োজন ছাড়া নগরীর মানুষ রাস্তায় বের না হওয়ায় যানজটের নগরীতে যানজট ছিল না। গতকাল দুপুরে মগবাজার মোড়ে কথা হয় রফিকুল ইসলাম নামে এক পথচারীর সঙ্গে। তিনি বলেন, জরুরি কাজে তিনি মতিঝিলে গিয়েছিলেন। অন্যদিন মতিঝিলে যেতে সড়কের বিভিন্ন স্থানে যানজট থাকলেও এদিন তিনি কোনো যানজটে পড়েননি। মতিঝিলের মতো ব্যস্ত এলাকাতেও লোকসমাগম অনেক কম ছিল। তিনি আরও জানান, প্রয়োজন না হলে তিনিও বাসা থেকে বের হতেন না।

রাজধানীর বিভিন্ন শপিংমল, মার্কেট, ফুডকোর্ট, রেস্টুরেন্ট এবং বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রেও লোকসমাগম নেই। গত কয়েক দিন ধরে এসব স্থানে সাধারণ মানুষের আনাগোনা কমে গেছে। ক্রেতা না পাওয়ায় শপিংমলের অনেক দোকানই বন্ধ রাখা হচ্ছে। তবে ভিড় বেড়েছে কাঁচাবাজারে আর পাড়ার মোড়ের মুদি দোকানে। গতকাল সকাল ৮টার দিকে মহাখালী কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা যায়, সাধারণ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস কেনায় ব্যস্ত। ঘরে বন্দি থাকতে হবে এমন আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ এখন কাঁচাবাজারে ভিড় করছেন। ।। দৈনিক আমাদের সময়।।

বার্তা বাজার / ডাব্লিও.এস

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর