“আপনি সত্যিই সুস্থ আছেন তো?”

রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো ছোট্ট দুটি বাচ্চা একরকম কুড়িয়ে এনে, জায়গা করে দিলাম অফিসের নীচে! বয়স সবে মাত্র তখন ২-৩ মাস। একজনের নাম হলো লালু আরেকজন কালু! ডিসি ওয়ারী অফিসের প্রত্যেক পুলিশ সদস্যের হৃদয়ে একরকম জায়গা করে নিয়েছিল ওরা!
প্রতিদিন সকালে অফিসে প্রবেশের আগে ওদের দুষ্টুমি উপভোগ করতাম।

আমরা যারা ওদের দুজনের খুব কাছের হয়ে গিয়েছিলাম তাদের সামনে পেলেই দুজন সমানে লেজ নাড়াতো। অদ্ভুত মায়া ও ভালবাসা জন্মে গিয়েছিল ওদের প্রতি। অফিসে দায়িত্বরত গার্ডরাও ওদের ভালবেসে ফেলেছিল! সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখতো। পুলিশের প্রতিটি গাড়ি সতর্কতার সাথে অফিসে ঢুকতো পাছে গাড়ি ওদেরকে আহত না করে ফেলে।

শীতের সময় একদিন বাইরে থেকে একজন বৃদ্ধ লোক গাড়ি নিয়ে এসে লালুর উপর তুলে দেন! চিৎকার শুনে নীচে দৌঁড়ে যেয়ে গাড়ি সরিয়ে ওর মাথায় হাত বুলালাম। দুইবার চোখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো। তাৎক্ষণিক গাড়ি করে পশু হাসপাতালে পাঠিয়েও লালুকে বাঁচানো যায়নি! লালুকে হারানোর পর থেকেই কালু ভীষণ একা হয়ে যায়, খাওয়া দাওয়া কমিয়ে দেয়, কারো কাছে যেতে চাইতো না একজন ছাড়া!

শীতের সময় বাচ্চা প্রাণীরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়, ওদের লালন পালন করতে যেয়েই একটু পড়াশুনা করেছিলাম এ বিষয়ে। লালুকে হারিয়ে কালু মানসিকভাবে অনেকটাই ভেঙে পড়ে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো, ওকে কাঁদতেও দেখেছি! লালুকে হারিয়ে আমরা কালুর প্রতি অনেক যত্নশীল হয়ে উঠেছিলাম। ওয়ারী বিভাগের অফিসের ডিসি স্যার থেকে শুরু করে সকলেই ওদের ভালবেসে খোঁজ খবর নিত।
কালু হঠাৎ করেই রোগাক্রান্ত হয়ে গেলো। ডাক্তারের পরামর্শে একের পর এক পথ্যের ব্যবহার ও সেবা যত্ন করার পরও কালু সুস্থ হচ্ছিল না। না খেয়ে খেয়ে এতটা অসুস্থ হলো উঠে দাঁড়াতে পারতো না! তাও একজনকে দেখে দাঁড়িয়ে যেয়ে আবার নুয়ে পড়তো। সিরিঞ্জে করে স্যালাইন খাওয়ানো থেকে শুরু করে নানামুখী চেষ্টার কমতি ছিল না! পুলিশের ব্যস্ততম পেশায় থেকে সকলের পক্ষে সময় দেয়া সহজ ছিল না তাই আমরা একজন ভদ্রলোকের শরণাপন্ন হই যিনি কালুকে রাখতে রাজি হন। টানা ১০ দিন ছোট্ট এই বাচ্চাটা জীবনের সাথে যুদ্ধ করেছে। কালুকে বাঁচাতে কনস্টেবল বুলবুল, পার্থ, আলমগীর কত নাম না জানা মানুষ খেটেছে। মনে হতে পারে একটি কুকুরের জন্য এতটা! জ্বি ঠিক পড়ছেন কুকুরের জন্যই এতখানি এফোর্ট দেয়া হয়েছিল। অবলা, নিরীহ এই প্রাণীদের যারা ভালবাসতে পারেনা তাঁরা মানুষকেও ভালবাসতে পারেন না!

অসুস্থ হওয়ার ঠিক ১০ দিনের মাথায় কালু আমাদের ছেড়ে চলে যায়। ওর মৃত্যু আমাদের চোখে দেখতে হয়নি, এটিই যা সান্ত্বনার! কিছু মানুষ এখনো মনে করেন কুকুর, বিড়ালকে আঘাত করলে আর কি হয়! তাঁদের জন্যই প্রাণী কল্যাণ সংক্রান্ত আইন আরও সুসংহতভাবে এসেছে। যে বা যারা নিরীহ এই প্রাণীদের ভালবাসতে পারেনা, আঘাত করেন তারাই সত্যিকার অর্থে মানুষকে ভালবাসতে ব্যর্থ হন।
মানুষকে ভালবাসুন, সেই সাথে আপনার বিশাল আকাশসম হৃদয় থেকে একটু ভালবাসা ছড়িয়ে দিন এই নিরীহ প্রাণীদের প্রতি! যদি সেটি না করতে পারেন তবে বাদ দিন ভালবাসা তবুও দয়া করে আঘাত করবেন না…

মহান স্রস্টার এই পৃথিবীতে জায়গা নিশ্চয়ই এতটা সংকুচিত হয়ে যায়নি এখনো, যেখানে প্রাণীর নিরাপদ জায়গা হবে না! একটু খেয়াল করে দেখুন না সুস্থ ওরা কিন্তু আপনাকে কামড়াতে আসেনা, বরং সুস্থ আপনি অযথাই ওঁদের দিকে ঢিল ছুড়ে মারেন!
তাই প্রশ্নটি এসেই যায়, “আপনি সত্যিই সুস্থ আছেন তো”?

লেখক: অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন), ওয়ারী বিভাগ, ডিএমপি, ঢাকা।

বার্তাবাজার/কে.জে.পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর