ভারত বাংলাদেশ-মিয়ানমারের একমাত্র সত্যিকার বন্ধুদেশ: শ্রিংলা
আমরাই বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার উভয়েরই একমাত্র সত্যিকার বন্ধু দেশ। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি যে, শুষ্ক মৌসুমে আমাদের পানিসংকটের সর্বোত্তম সমাধান খুঁজতে এবং আমাদের পানি ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়ন করতে আমরা বদ্ধপরিকর, যেন অভিন্ন নদীগুলো আগামী প্রজন্মেও জীবিকার উৎস হয়ে থাকতে পারে। এমন মন্তব্য করেন বাংলাদেশ সফরে আসা ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা।
আজ সোমবার (০২ মার্চ) ঢাকায় পৌঁছার পর তিনি এসব কথা বলেন।
শ্রিংলা আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান আমাদেরও জাতীয় বীর। তাই বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে যৌথ প্রযোজনায় বিশেষ চলচ্চিত্র নির্মাণসহ জন্মশতবর্ষের বিভিন্ন আয়োজনের অংশীদার হতে পেরে আমরা গর্বিত। এখানে তার বক্তব্য হুবহু তুলে ধরা হলো:
শ্রিংলা বলেন, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল বলেছিলেন, “আমরা সবাই সুখ-দুঃখ সমানভাবে ভাগ করে নিই”। এই বাণী যেন আমাদের সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে যে, এই বিশ্বায়নের যুগে সুখ-দুঃখ কোন সীমান্ত মানে না এবং সবার দ্বারপ্রান্তেই আসে। বাংলাদেশের প্রতি আমাদের মনোভাব সবসময় এই চেতনা দিয়েই প্রকাশিত হবে। আমার বিশ্বাস, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সফরটিতে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের নিরন্তর শুভেচ্ছা, বিশ্বাস ও সম্মানের পূর্ণ প্রতিফলন হবে।
হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা আরও বলেন, ঢাকায় আসতে পারা আমার জন্য খুবই আনন্দের কারণ ঢাকা আমার কাছে নিজের শহরের মতোই। ঢাকা ও বাংলাদেশের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। আমি হাই কমিশনার হিসেবে এখানে কাজ করেছি এবং আমার কর্মজীবনের অন্যতম সন্তুষ্টিদায়ক পোস্টিং ছিল এটি।
এখানে আসার আগেও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিষয়ে কাজ করার সময়ে অনেকবার আমি এই সুন্দর দেশে এসেছিলাম। সুতরাং পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে ঢাকা আসতে পেরে আমি আনন্দিত।
আমি প্রথমেই বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল এন্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজকে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বাংলাদেশে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় সফরের প্রস্তুতি নিতে ঢাকায় আসা হলেও এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এতসব পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা করার সুযোগ দেয়ার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।
আপনারা জানেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে এই মাসে মুজিববর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমরা এই সফরের প্রত্যাশায় রয়েছি কারণ, আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই সম্পর্কের প্রতি অগ্রাধিকার দেন এবং এর চেয়েও বড় কারণ, বঙ্গবন্ধু একজন বিশ্বনন্দিত নেতা এবং বাংলাদেশ ও আমাদের উপমহাদেশের মুক্তির প্রতীক। ভারতে তাঁর নাম বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
তিনি বাংলাদেশে যেমন সম্মান লাভ করেন তেমনি ভারতেও তিনি সমান শ্রদ্ধার পাত্র। সুতরাং আমি এই জ্ঞানী, নির্ভীক, দৃঢ়প্রত্যয়ী এবং সর্বোপরি এমন একজন বীর যিনি শোষণের হাত থেকে একটি জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন, সেই মহান বঙ্গসন্তানের জন্মশতবর্ষে আপনাদের শুভকামনা জানাই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান আমাদেরও জাতীয় বীর। তাই বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে যৌথ প্রযোজনায় বিশেষ চলচ্চিত্র নির্মাণসহ জন্মশতবর্ষের বিভিন্ন আয়োজনের অংশীদার হতে পেরে আমরা গর্বিত।
সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বিশ্বে আমাদের বৃহত্তম উন্নয়ন অংশীদার ও এই অঞ্চলে আমাদের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। আমাদের দুই দেশের সরকারের মধ্যকার সম্পর্ক একইসাথে বিস্তৃত ও সমন্বিত যার মধ্যে রয়েছে ৭৫টি আলোচনার বিষয় যা আমাদের স্থায়ী অংশীদারিত্বের একটি শক্তিশালী কাঠামো গঠনের জন্য আমাদের জনগণ ও সরকারকে যুক্ত করেছে। মানুষে মানুষে বন্ধনের এই পর্যায়ে সারা বিশ্বে বাংলাদেশেই রয়েছে ভারতের সবচেয়ে বেশি ভিসা কার্যক্রম এবং ভারতে বিদেশী ভ্রমণকারীদের সবথেকে বড় সংখ্যক হচ্ছেন আমাদের বাংলাদেশী বন্ধুগণ।
এখানে আমি স্পষ্ট করেই বলতে চাই, আমাদের প্রধানমন্ত্রী বারবার বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আশ্বস্ত করেছেন যে, এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সুতরাং বাংলাদেশের জনগণের উপর এর কোন প্রভাব থাকবে না। আমরা এই ব্যাপারে আপনাদের আশ্বস্ত করছি।
এছাড়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মানবিক সংকট এবং বাংলাদেশের উপর এর প্রভাব বিষয়ে আমাদের অবস্থান সম্পর্কে অনেকের আগ্রহ এবং ভিত্তিহীন ধারণাও আছে। আমি স্পষ্টভাবেই বলতে চাই, ভারত বাংলাদেশের মানবিক বোধের গভীর প্রশংসা করে, যার কারণে তারা প্রায় ১০ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে। আপনারা যে বোঝা বহন করছেন আমরা তা স্বীকার করি ও সমবেদনা জানাই। আমরাই বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার উভয়েরই একমাত্র সত্যিকার বন্ধু দেশ। যেখানে অন্যদেশগুলো চায় আপনারা এই সমস্যা অনির্দিষ্টকালের জন্য বয়ে চলুন, সেখানে আমরা পারস্পরিক গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে একটা সমাধান চাই এবং এই বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোর রাখাইনে দ্রুততম প্রত্যাবাসন ও সম্মানজনক জীবন ফিরে পেতে সহায়তা করতে আমরা অঙ্গিকারবদ্ধ। এই প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ ও টেকসই।
আমরা ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে ত্রাণসামগ্রীর পাঁচটি চালান সরবরাহ করেছি এবং ভবিষ্যতেও আরও সহায়তার জন্য আমরা প্রস্তুতি রয়েছি। একইসাথে আমরা রাখাইনে বসতঘর নির্মাণসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও বিনিয়োগ করছি যাতে করে সেখানে মানুষ ফিরে যেতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং স্বল্প সম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবার পরিবর্তে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগের প্রতি মনোযোগ দেয়।
অন্যদিকে, আমরা মিয়ানমার সরকারের সাথে সব পর্যায়ে ধারাবাহিক আলোচনা চালাচ্ছি যেখানে আইডিপি ক্যাম্প বন্ধ করা, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পে সহায়তা করা এবং বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ফিরে যাবার জন্য একটা উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করায় গুরুত্ব দিয়েছি। সূত্র: মানবজমিন
বার্তাবাজার/এমকে