অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিছিন্ন না করে হালখাতায় মেতেছে তিতাস

দেশে যখন গ্যাসের জন্য হাহাকার। বাড়ছে গ্যাসের দাম। গ্রাহক গুনতে হচ্ছে জরিমানা। প্রতি বছর অধিক হারে বাড়ছে দাম। এই নিয়ে সংসদ থেকে প্রতিটি পাড়া মহল্লায় মাতামাতি। কখনো বা দাম কমাতে মানববন্ধন ও মিছিলে রাস্তা অবরোধ।

ঠিক তখনি দেশের নাভী রাজধানীতে বসেই চলছে অবৈধ গ্যাসের রমররমা ব্যাবসা। যার সংবাদ প্রকাশের পরও রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকায় গ্যাসের অবৈধ সংযোগ দেওয়া অব্যহত রয়েছে। গ্যাস অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা, কয়েকটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান, একটি সিএনজি ফিলিং ষ্টেশন ও হাউজিং মালিক সমিতি নিয়ন্ত্রিত একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে গ্যাসের এসব অবৈধ সংযোগ দিয়ে দূর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।

২০১২ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত র্দীঘ প্রায় ৮ বছর ধরে এসব গ্যাসের অবৈধ সংযোগের বিল ওই প্রভাবশালী সিন্ডিকেট চুলাপ্রতি মানি রিসিটের মাধ্যমে উত্তোলন করে নিজেরা ভাগাভাগি করে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক বুনে গেছেন। রাষ্ট্র হারিয়েছেন রাজস্ব। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধানে নামে আমাদের বার্তা বাজারের অনুসন্ধানী টিম।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধের তুরাগ হাউজিং, একতা হাউজিং, ঢাকা উদ্যান, নবীনগর হাউজিং, চন্দ্রিমা মডেল টাউন, চাঁদ উদ্যানসহ মেট্রো হাউজিং এলাকায় হাজার হাজার গ্যাসের অবৈধ সংযোগের প্রমাণ মিলেছে বার্তা বাজারের অনুসন্ধানী দলের অনুসন্ধানে। গ্যাসের এসব অবৈধ সংযোগে বাড়িপ্রতি নেওয়া হয়েছে ২৭,৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ১,৫০,০০০ পর্যন্ত।

এছাড়াও রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চুলাপ্রতি ৫০০ টাকা মাসিক বিল নিচ্ছেন এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট। বার্তা বাজারে গত ২২ ফেব্রুয়ারীতে “অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিচ্ছে ফিলিং ষ্টেশনগুলো”- শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর মোহাম্মদপুরের অত্র এলাকা জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তিতাস কর্তৃপক্ষ অদৃশ্য কারণে ব্যবস্থা গ্রহণ না করলেও অবৈধ গ্যাস ব্যবহারকারীদের মধ্যে অনেকেই নিজ উদ্দ্যেগে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রেখেছেন বলে তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে।

তবে, নতুন করে গ্যাসের অবৈধ সংযোগ দেয়ার তথ্যচিত্রও বার্তা বাজার-এর অনুসন্ধানী দলের হাতে এসে পৌঁছেছে। জানা যায়, গত ২৪ শে ফেব্রুয়ারী সোমবার ঢাকা উদ্যান এলাকার সি ব্লকের ২ নং রোডে আদাবর থানার এক আওয়ামীলীগ নেতার মায়ের দুটি বাসায় অবৈধ ভাবে গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়।

অবৈধ ভাবে গ্যাস সংযোগ দিয়ে এই নেতার বিরুদ্ধেও দূর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমান অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বার্তা বাজারের অনুসন্ধানী দল সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে রাস্তা কেটে উক্ত দুই বাড়িতে অবৈধ ভাবে দেয়া গ্যাস সংযোগের তথ্যপ্রমাণ পায়।

তবে, সেই নেতার বাড়ি এবং বাগানবাড়িতে একাধিক বার গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। আমাদের অনুসন্ধানী টিম-কে জানানো হয়- তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। মুঠোফোনে পরিচয় নিশ্চিত হলেও পরবর্তীতে গ্যাসের বিষয়টি নিয়ে কথা বলতেই তিনি নিজের পরিচয় এবং ঠিকানা অস্বীকার করেন।

এদিকে, দেলোয়ার নামের এক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মালিক ও তিতাস গ্যাস অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজেশে মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান বাড়ি মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি এবং আনিস নামের এক ব্যক্তি দূর্নীতির মাধ্যমে পুরো এলাকা জুড়ে অবৈধ ভাবে গ্যাস সংযোগ দিয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে, চাঁদ উদ্যান বাড়ি মালিক কল্যাণ সমিতির অফিসে সভাপতি হাজী আলম এবং সেই আনিসের বাড়িতে বেশ কয়েকবার গিয়েও তাদের পাওয়া যায়নি। বেশ কয়েকবার কল দিলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। আনিসের গাড়ি চালকের সাথে সাক্ষাৎ করে অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে আনিসের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি সাক্ষাৎ কিংবা ফোনে কথা বলেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আনিসের বাড়ির এক ভাড়াটিয়া আমাদের অনুসন্ধানী দলকে জানান, গ্যাসের অবৈধ সংযোগ দিয়ে দূর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে চাঁদ উদ্যান এলাকায় ১৮ টি প্লট এবং বাড়ির মালিক হয়েছেন আনিস। অভিযোগ রয়েছে আনিস এবার ১৯ নম্বর প্লটে বাড়ির কাজ শুরু করবেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই আনিস নামের ব্যক্তি এক সময় গরুর ঘাস কাটতো। তারপর গরুর দুধ দহন করতো। তারপর নিজেই একটি গরুর ফার্ম দেয়।

ফার্মের পরপরই তিনি ঘাস কাটার পরিবর্তে গ্যাসের অবৈধ সংযোগ দেয়ার দূর্নীতি-তে নেমে পড়েন। এরপর থেকে তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। চাঁদ উদ্যান এলাকায় তাকে ঘাসকাটা আনিস ওরফে দুধ আনিস ওরফে গরু আনিস ওরফে গ্যাস আনিস বললে সবাই একনামে চিনে। এলাকাবাসীর প্রশ্ন, এই আনিস কিভাবে এতো টাকার মালিক হলো!

জানা যায়, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশনের মেট্রো ঢাকা বিপণন ও রাজস্ব বিভাগ-০৫, জোন-১০ ও ১১ এর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের সীমাহীন দূর্নীতিতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধের ঢাকা উদ্যান এলাকার মেসার্স বুড়িগঙ্গা ফিলিং ষ্টেশন নামক পাম্পের সংযোগ থেকে বাড়িওয়ালা রহিম প্রথমে এসব গ্যাসের অবৈধ সংযোগ দেয়া শুরু করেন।

বাড়িওয়ালা আব্দুর রহিম মুঠোফোনে এসব অভিযোগের সত্যতা অস্বীকার করে আমাদের অনুসন্ধানী দলকে বলেন, এখানে আমার একার কোন কাজ ছিল না। বুড়িগঙ্গা পাম্পের মালিক আবু সাইদ ব্যাপারীর কাছ থেকে হাউজিং-এ একটা পাইপের মাধ্যমে গ্যাসের অবৈধ সংযোগের কথাও তিনি স্বীকার করেন।

একই সাথে মাসিক বিল উত্তোলনের বিষয়টি তিনি স্বীকার করে তিনি আরও জানান, বুড়িগঙ্গা ফিলিং ষ্টেশন পাম্পের স্টাফ জুম্মন এবং তুরাগ হাউজিং মালিক সমিতির একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট মিলে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে গ্যাসের এসব অবৈধ সংযোগ দেয় এবং মাসিক বিল চুলাপ্রতি ৫০০ টাকা ১০০% উত্তোলন করা হচ্ছে। তিতাস অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা গ্যাসের এই অবৈধ সংযোগের সাথে জড়িত বলেও তিনি দাবী করেন।

বাড়িওয়ালা আব্দুর রহিম-এর কথার সূত্র ধরলে তিতাস কর্তৃপক্ষ এজন্যই মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন! এমন প্রশ্ন করা অবাঞ্ছনীয় হবে না নিশ্চয়! এসকল অভিযোগের সত্যতা জানতে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশনের মেট্রো ঢাকা বিপণন ও রাজস্ব বিভাগ-০৫, জোন-১০ ও ১১ ধানমন্ডি কার্যালয়ে পৌঁছালে ধানমন্ডি জোন-১১ এর বিপণন ডিজিএম প্রকৌশলী অশোক কুমার গোলদার ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজী হননি।

তবে, তিনি বার্তা বাজার কে জানান, আমরা খুব শীঘ্রই গ্যাসের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে কাজ করে যাচ্ছি।

কিন্তু, বার্তা বাজারে প্রকাশিত সংবাদ গত ২২ ফেব্রুয়ারী (শনিবার) অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর সোমবার রাজধানীর আদাবরে তিতাস গ্যাস টি.এন্ড.ডি কোঃলিঃ-এর সংযোগ বিচ্ছিন্নকারী দল-০২ এর একটি গাড়ি ঘুরাঘুরি করলেও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিতাস কর্তৃপক্ষ সংযোগ বিচ্ছিন্নের নামে এই ফাল্গুনে বৈশাখী হালখাতা করে গেছেন।

বার্তাবাজার/কেএ

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর