কাছের লোক কৃষি জমির ‘টপ-সয়েল’ উজাড় করছে, চেয়ারম্যান নিজেই জানেন না এসংক্রান্ত আইন!
সাভারের আশুলিয়ার শিমুলিয়া ইউনিয়নের গোহাইলবাড়ি গাজিখালি খাল সংলগ্ন বিস্তীর্ণ কৃষিজমির ‘টপ-সয়েল’ এবং এর নিচের অনেক গভীর থেকে তুলে নেয়া মাটি ইটভাটায় বিক্রী করছে একটি চক্র। ফলে কৃষিজমি বিলীন হবার পাশাপাশি সর্বশান্ত হচ্ছেন কৃষকরা। ফারুক প্রকাশ ফারুক মেম্বার নামের এক ব্যক্তি শিমুলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম সুরুজ এর কাছের মানুষ এবং যিনি পরিষদের রানিং ইউপি সদস্য শাহ আলম ওরফে সালুর পরিবর্তে কাজ করছেন। অবাক করার মত বিষয় হলো এই ফারুক নিজেকে প্যানেল মেম্বার হিসেবেও পরিচয় দেন।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ইউনিয়নের গাজীখালি খালের পাশে অধিকাংশ কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি নেই। আর অনেক জায়গায় আনুমানিক ৪০ ফুট পর্যন্ত গর্ত করে ভেকু (খননযন্ত্র) দিয়ে মাটি কেটে নেয়া হয়েছে। এরপর ট্রাক ও পিক-আপে করে ইটভাটাগুলিতে ওই মাটি স্থানান্তর করা হচ্ছে। এসব মাটি শিমুলিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রী করে ফারুক ও আনিস ভুইয়া সহ স্থানীয় একটি চক্র নিজেরা লাভবান হচ্ছে।
এব্যাপারে মাটি কেটে নেয়া ফারুকের নিকট জানতে চাইলে তিনি জানান, শিমুলিয়া ভূমি অফিসে আমাদের নিজেদের জায়গার কাগজপত্র জমা দিয়েছি এবং আমরা আমাদের জায়গা থেকে মাটি কাটছি, তাতে সমস্যা কোথায়?
নিজের জমি থেকে টপ-সয়েল কাটা যে বালুমহাল আইনে অবৈধ এটা ফারুক নামের ওই ব্যক্তি জানেনই না বলে এই প্রতিবেদককে জানান।
আরো অবাক করার মত বিষয় হলো, শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম সুরুজ নিজেও এই জমির উপরিভাগের মাটি কাটার তথা বালুমহাল আইন সম্পর্কে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ফারুক এই কাজের সাথে জড়িত নন, যারা মাটি কেটে নিচ্ছে তারা খাস জায়গা থেকে কাটছে না বলেও জানান।
এই প্রতিবেদকের লাইভ প্রোগ্রামে ভেকু ও পিক-আপ ড্রাইভারগণ ফারুক এর নির্দেশে তারা মাটি কেটে নিচ্ছেন এবিষয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন এটা মুঠোফোনে চেয়ারম্যান সুরুজ এর নিকট জানালে তিনি একপর্যায়ে বলেন, ‘আপনি লাইভ করেন আর যাই করেন, আমি মিথ্যা বলছি না। ফারুক মাটি কেটে নিচ্ছে না, আর খাস জায়গা থেকেও সে মাটি কাটছে না।,’
তবে ফারুক চেয়ারম্যানের কাছের মানুষ এবং সে অসুস্থ ইউপি সদস্য শাহ আলম সালুর বদলী দায়িত্ব পালন করছেন – এই প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চেয়ারম্যান সুরুজ কলটি কেটে দেন।
তবে, ঘটনাস্থলে গিয়ে ভেকু ড্রাইভার সহ মাটি স্থান্তরের কাজে ব্যবহৃত পিক-আপ ড্রাইভারগণ ভিডিও বক্তব্যে জানান, এই মাটি তারা ফারুক মেম্বারের নির্দেশে কাটছেন এবং ভাটায় পৌঁছে দিচ্ছেন।
ঘটনাস্থল থেকে বিষয়টি মুঠোফোনে আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদ এর নিকট জানালে তিনি তার অধীনস্থ শিমুলিয়া ভূমি অফিসের ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মোঃ মাজহারুল ইসলাম কে ঘটনাস্থলে পাঠান।
তবে এভাবে নির্বিচারে কৃষি জমির ‘টপ-সয়েল’ কেটে নেবার বিষয়ে শিমুলিয়া ভূমি অফিসের ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মোঃ মাজহারুল ইসলাম জানান, এটা সম্পূর্ণ আইন বিরুদ্ধ। বালু মহাল আইনে যারা মাটি কেটে নিচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে মামলাযোগ্য অপরাধ। আশুলিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিষয়টি আমলে নিয়েছেন এবং বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, এই মাটি কেটে নেয়া চক্রটি প্রথমে বিভিন্ন কৃষকদের থেকে অল্প জায়গা ক্রয় করে, সেই জায়গার মাটি গভীরভাবে কেটে ইটভাটায় বিক্রী করে। ফলে ক্রয়কৃত ওই জায়গার পাশের চারদিকের জমি ভেঙ্গে বিলীন হয়। তাই বাধ্য হয়ে ওইসব জমির মালিক অসহায় কৃষকদের জমি পানির দামে বিক্রী করে দেয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
এব্যাপারে, আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদ জানান, বিনা অনুমতিতে নিজের জায়গা থেকেও এভাবে মাটি কেটে নেবার এখতিয়ার কারও নেই। বালুমহাল আইনে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বার্তাবাজার/এসজে