হাউমাউ করে কাঁদছিলেন বৃদ্ধ হাজী মোহাম্মদ হোসেন। বলছিলেন নাতির শৈশবের কথা। “মা মইরা গেলে মাজাহারুলরে কোলে পিডে কইরা বড় করছি। আদর যত্নতো কম করিনাই। লেহাপড়া করাইছি ডিগ্রী পর্যন্ত। আর হেই নাতি আমারে বাড়ি থাকতে দেয় না।” আশ্রয় নিয়েছেন অন্যের ঘরে। আশ্রয়দাতার আহারে কোনরকম দিন চলে যাচ্ছে তার। বুকের চাঁপা কষ্ট দিন দিন অসুষ্থ করে তুলছে তাকে। পা চলে মাটি ঘেষে। চোখের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছে হতাশা, ভয় আর উৎকণ্ঠা।
জীবনের প্রায় ৮০ শতাংশই কেটেছে সংসার, ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনী আর ব্যবসা নিয়ে। সারাজীবনের সফল পরিশ্রমে গড়েছেন অনেক সম্পদ। হয়তো নিজের বিশ্রামের সময়টা রেখে দিতে চেয়েছিলেন ক্রান্তিকালে। কিন্তু ভাগ্যের খেলায় হেরে গেলেন তিনি। যে সময়টায় বাড়িতে আরাম আয়েশে দিন কাটানোর কথা, সে সময় স্ত্রী, সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বয়োবৃদ্ধ হাজী মোহাম্মদ হোসেন। মাদকাসক্ত নাতির অত্যাচারে কষ্টে দিন কাটছে তাদের।

ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার আগমুসল্লি গ্রামের ১০৫ বছর বযসী বৃদ্ধ হাজী মোহাম্মদ হোসেন। তিন মেয়ে ও এক ছেলে আব্দুল হাই। ৬৫ বছর বয়সী আব্দুল হাই এর প্রথম স্ত্রীর একমাত্র সন্তান মাজহারুল হক(৪০)। ৬ মাসের শিশু মাজহারুলকে রেখে প্রথম স্ত্রী মারা গেলে হাসেনা বেগমকে বিয়ে করেন। সুখের সংসারে অশান্তি শুরু হয় বিয়ের পর মাজাহারুল পৃথক হওয়ার পর থেকে। একটা সময় মাজাহারুল জড়িয়ে পরে মাদকের নেশায়, প্রায়ই টাকার জন্য নির্যাতন করতো বাবা-মাকে। বাপ-দাদার সম্পত্তি লিখে নিতে পুরু পরিবারের উপর শুরু হয় অত্যাচার। অত্যাচারের মাত্র আরো বাড়ে যখন মাজাহারুল ২য় স্ত্রী লুৎফা আক্তারকে বাড়ীতে নিয়ে আসেন। সম্প্রতি অত্যাচার থেকে বাচতে সাত মাস ধরে স্ত্রী, সন্তান নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বৃদ্ধ হাজী মোহাম্মদ হোসেন।

মাজহারুলের পিতা আব্দুল হাই জানান, ছেলে মাদকাসক্ত। অত্যাচার থেকে বাচতে তাকে ভর্তি করানো হয় মাদকাসক্ত পুর্নবাসন কেন্দ্রে। অথচ থানায় বাবার বিরুদ্ধে মামলা করা হয় ছেলে অপহরণের। ছেলের ২য় স্ত্রী লুৎফা আক্তারের করা অপহরণ মামলায় ৫৬ দিন জেলহাজত কাটতে হয়েছে তাকে। ঘটনার এখানেই শেষ নয়। ১০৫ বছরের বৃদ্ধ দাদার কাছ থেকে সম্পত্তি লিখে নিতে মারধর চালিয়ে বের করে দেয়া হয় বাড়ি থেকে। মাদকাসক্ত ছেলের অত্যাচার থেকে বাচতে সাত মাস ধরে বৃদ্ধ বাবা-মা আর স্ত্রীকে নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অসহায় পিতা আব্দুল হাই। তিনি অভিযোগ করে বলেন, থানা পুলিশের সহযোগিতা চেয়েও কোন প্রতিকার পাননি তিনি। উল্টো বিনা দোষে জেল খেটেছেন ৫৬ দিন।

বাড়িতে গিয়ে খুজে পাওয়া যায়নি মাদকাসক্ত ছেলে মাজহারুলকে। ঘরটি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়, ঘরের বাহিরে দুটি বৈদ্যুতিক লাইট জ্বলছে । প্রতিবেশিরা জানান এখানে এখন কেউ থাকেননা।
হাজী মোহাম্মদ হোসেনের আকুতি নিজের ভিটাতেই যেনো মৃত্যু হয় আর সেখানেই যেনো দাফন হয়। সে আশায় দিন গুনছেন পুরু পরিবার।
ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার আহমার উজ্জামান বলেন, যারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তাদের আইনি সহযোগিতার পাশাপাশি ঘটনাটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বার্তা বাজার / ডব্লিও.এস