অপকর্মের টাকায় কোটিপতি পাপিয়া, ভয়ংকর ‘কিউ এন্ড সি’ বাহিনী দিয়ে চলতো যত অপকর্ম
সদ্য বহিষ্কৃত নরসিংদী জেলা যুবমহিলা লীগ নেত্রী শামিমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে র্যাব। এর মধ্যে নিজের আধিপত্য বিস্তারের জন্য পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী নরসিংদীতে গড়ে তোলে ভয়ংকর ‘কিউ এন্ড সি’ নামের ক্যাডার বাহিনী।
রোববার (২১ফেব্রুয়ারি) কাওরান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাব-১’র অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল শাফী উল্লাহ বুলবুল।
শাফী উল্লাহ বুলবুল জানান, মূলত নরসিংদী জেলাজুড়ে নিজের আধিপত্য বিস্তারের জন্য পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ‘কিউ এন্ড সি’ নামের ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলে। এই বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যের হাতে ট্যাটু করা। এই ‘কিউ এন্ড সি’ ক্যাডার বাহিনী দিয়ে পাপিয়া নরসিংদীতে চাঁদাবাজি, মাসোহারা, অস্ত্র ও মাদকের ব্যবসা পরিচালনা করতো। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য বিভিন্ন অপকর্ম করতো এই কিউ এন্ড সি বাহিনী।
কিউ এন্ড সি বাহিনীকে গ্রেফতারের জন্য রোববার ভোরে নরসিংদীতে অভিযান চালায় র্যাবের একটি আভিযানিক দল। তবে পাপিয়া গ্রেফতারের পরপরই তারা এলাকা থেকে সটকে পড়েছে। এই বাহিনীর সদস্যদের গ্রেফতারের জন্য র্যাবের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানায় র্যাব।
শুধু কিউ এন্ড সি বাহিনীই নয়। র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার পাপিয়া আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। পাপিয়ার কোটি কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পেয়েছে র্যাব। যার সবই অবৈধভাবে অর্জন করেছে যুবমহিলা লীগের এই বহিষ্কৃত এই নেত্রী।
পাপিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের পর রোববার ভোরে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার ‘রওশন’স ডমিনো’ রিলিভো নামের একটি বিলাসবহুল ভবনে পাপিয়া ও তার স্বামীর দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালায় র্যাব। দুটি ফ্ল্যাট থেকে নগদ ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা হয় ৫টি পাসপোর্ট ও ৭ টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।
এছাড়াও ওই দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে ১টি বিদেশি পিস্তল, ২টি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড গুলি, ৫ বোতল বিদেশি মদ ও বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি ভিসা ও এটিএম কার্ড উদ্ধার করা হয় বলে জানায় র্যাব।

বিভিন্ন প্রলোভনে অর্থ হাতিয়ে নিত পাপিয়া দম্পতি
র্যাব জানায়, শামিমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ ও তার স্বামী সুমন চৌধুরী বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিত। এর মধ্যে পুলিশের এসআই ও বাংলাদেশ রেলওয়েতে চাকরি দেয়ার কথা বলে মোট ১১ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়। একটি কারখানায় অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেয়ার কথা বলে ৩৫ লক্ষ টাকা ও একটি সিএনজি পাম্পের লাইস্নেস করে দেয়ার কথা বলে ২৯ লক্ষ টাকাসহ ঢাকা ও নরসিংদী এলাকায় অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি বিভিন্ন অপরাধের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করে পাপিয়া দম্পতি।
কম বয়সী মেয়েদের জোরপূর্বক অনৈতিক কাজে বাধ্য করা
পাপিয়া ও তার স্বামীর আয়ের আরেকটি উৎস ছিল কম বয়সী মেয়েদের দিয়ে অনৈতিক কাজ করানো। নরসিংদী থেকে চাকরি দেয়ার কথা বলে ঢাকায় এনে কম বয়সী মেয়েদের দিয়ে বিলাসবহুল হোটেলে জোরপূর্বক অনৈতিক কাজে বাধ্য করতো পাপিয়া দম্পতি। অনৈতিক কাজে কোন মেয়ে অস্বীকার জানালে তাদেরকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হতো।
কোটিপতি পাপিয়ার সম্পদের পাহাড়
রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার রওশন’স ডোমিনো রিলিভো ভবনে দুটি ফ্ল্যাট এবং নরসিংদী শহরে দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে পাপিয়া ও স্বামীর। এছাড়াও এই দম্পতির রয়েছে নিজস্ব বিলাসবহুল ব্যাক্তিগত গাড়ি।
নরসিংদীর বাগদী এলাকায় ২ টি প্লটও রয়েছে এই দম্পতির। যার মূল্য ২ কোটি টাকা বলে জানায় র্যাব। এছাড়াও তেজগাও এলাকায় এফডিসি গেট সংলগ্ন ‘কার একচেঞ্জ’ নামের গাড়ির শোরুমে তাদের ১ কোটি টাকার বিনিয়োগ আছে। নরসিংদীর কেএমসি কারওয়াশ এন্ড অটো সলিউশান’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে ৪০ লক্ষ টাকার বিনিয়োগ আছে। র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন চৌধুরী এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) দেশ ত্যাগের সময় শামিমা নূর পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন চৌধুরীসহ চারজনকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করে র্যাব-১ । গ্রেফতারের পর র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে।
বার্তা বাজার / ডব্লিও.এস