কে এই পাপিয়া?
যুব মহিলা লীগের একটা গুরুত্বপূর্ণ পদ নিজের নামের সাথে লাগিয়ে ঢাকার অভিজাত এলাকায় গড়েছিলেন সম্পদের পাহাড়। রাজনৈতিক নেতাদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় ছবি তোলে সবার কাছে নিজেকে পরিচয় দিতেন পাবলিক ফিগার হিসাবে। সবাইকে বুঝাতেন তার কাছে ক্ষমতার বিশাল এক ভান্ডার রয়েছে। আর লোক দেখানো এইসব ছবিই তার অপকর্ম করার রাস্তাটা সহজ করে দিয়েছিল। যাতে কেউ তার কোনো অপকর্মে বাঁধা না হতে পারে তার জন্যেই ছিল এইসব ফটোশেসন।
ধরা পড়ার কারন
পাপের স্বর্গে বসে ভালই কাটছিল তার নিজের সময়! কিন্তু বিলাসবহুল লাইফস্টাইল আর প্রচুর টাকা খরচ করাটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। গুলশানের ফাইভস্টার হোটেলে বিশাল অংকের বিল পরিশোধ করাটা নজর এড়ায়নি গোয়েন্দাদের। গোয়েন্দারা তখন থেকেই নামে অনুসন্ধানে। তাদের অনুসন্ধানে নামার সময় থেকেই শুরু হয় পাপিয়ার সাম্রাজ্যে ধ্বসের ক্ষনগননা।

তার যত অপকর্ম
সব ফাইভ স্টার হোটেলেই ছিল পাপিয়ার দেহ ব্যবসা। যেটাকে হালের আমলে বলা হয় ‘এস্কর্ট সার্ভিস’। নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক হলেও নিজেকে পরিচয় করাতেন কেন্দ্রের নেত্রী হিসাবে। গুজব রটিয়েছিলেন হয়ে যাবেন সংরক্ষিত আসনের সাংসদ। এমপি না হতে পারলেও তার অপকর্মের দৌরাত্ম এক মুহুর্তও থেমে থাকেনি। স্বামী মতি সুমন, স্বামীর পিএস তায়্যিবা, নিজের পিএস সাব্বিরসহ গতকাল সকালে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে আটক হন পাপিয়া। র্যাবের কাছে নিজের ক্ষমতার পরিচয় দিতে শুরু করে পাপিয়া। কিন্তু র্যাবের কর্মকর্তারা তার কথাকে পাত্তা না দিয়ে বের করতে থাকেন বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর তথ্য।

জানা যায়, ফাইভস্টার হোটেলের নারী ও মাদকের ব্যবসাই তার আয়ের মূল উৎস। দেশের হাই সোসাইটি ও বাইরের দেশের লোকরাই ছিল তার খদ্দের।
অনলাইনে এস্কর্ট সার্ভিস খোলে খদ্দেরদের কাছে সাপ্লাই দিতেন তাদের পছন্দসই নারী। অসহায় সুন্দরী মেয়েদের ব্রেইন ওয়াশ করে নিয়ে আসতেন দেহ ব্যবসায়।

প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিছানায় তাদের পাঠিয়ে কৌশলে ধারন করতেন তাদের সেই গোপন ভিডিও। ইতোমধ্যে সেইসব ভিডিও উদ্ধার করেছে র্যাব। গোপন ভিডিও ধারন করে প্রতারনা করতেন ধন্যাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে। হাতিয়ে নিতেন মোটা অংকের টাকা। বিভিন্ন হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটে তার নামে একটা রুম সবসময় বুকিং করা থাকতো। সেইসব রুমে অভিজাত লোকদের জন্য শয্যাসঙ্গীদের পাপিয়া নিজেই নিয়ে যেতেন।
মাঝে মাঝে বাঈজি সর্দার্নীর মত সাঁজতেন। হাতে থাকতো বেত। কোনো মেয়ে কথা না শুনলে তাকে বেত দিয়ে পিটিয়ে বাধ্য করতেন তিনি।
গত বছরের ১২ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ১৩ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একটা ফাইভ স্টার হোটেলে মোট ৫৯ দিন একটা ভিভিআইপি রুম বরাদ্ধ ছিল তার নামে। এই ৫৯ দিনে হোটেলের বিল বাবদ ৮১ লক্ষ ৪২ হাজার টাকা তিনি পরিশোধ করেছেন।
পাপিয়ার স্বামী সুমন
পাপিয়ার স্বামী মতি সুমন বেশিরভাগ সময় বারের ব্যবসা নিয়ে থাইল্যান্ডে থাকলেও এই বছরের প্রথম দিন ঢাকার একটি হোটেলের রুমে ৫/৬ জন সুন্দরী নিয়ে রাত কাটান। নরসিংদী পৌর ছাত্রলীগের সাবেক আহবায়ক সুমন একসময় প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেনের বডিগার্ডও ছিলেন। মেয়র লোকমানের মাধ্যমেই তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি। কৈশোরেই সন্ত্রাসের সাথে জড়িয়ে পড়া সুমনের নামে ২০০১ সালে পৌর কাউন্সিলর মানিক মিয়া হত্যার অভিযোগ পাওয়া যায়। খুন আর সন্ত্রাসের মাধ্যমেই আজকের এই সুমনের উঠে আসা। প্রেম করে ১০ বছর আগে পাপিয়াকে বিয়ে করেন সুমন।
মেয়র লোকমান খুন হওয়ার পর বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামানের সাথে ভাল সম্পর্ক গড়ে তোলে হয়ে যান মেয়রের এক নাম্বার ক্যাডার। কিছুদিন পর পাপিয়া সন্ত্রাসী হামলায় গুলিবিদ্ধ হলে তারা ঢাকা এসে সখ্যতা গড়ে তোলেন এমপি সাবিনা আক্তার তুহিনের সাথে। এরপর তাদের পাপের রাজ্যে খুব দ্রুত বর্ধন হতে থাকে। সাবেক এক এমপির সাথে পার্টনারশীপে গাড়ির শো’রুম দেন তারা। নরসিংদীতে শুরু করেন গাড়ির সার্ভিসিং ব্যবসা। সুমন আর পাপিয়া এরই মাঝে নিজের এলাকায় গড়ে তোলেন বিশাল কর্মীবাহিনি। মাঝে মাঝে তার বাহিনি নিয়ে শোডাউন দিলে রাস্তাজুড়ে বিশাল জ্যাম সৃষ্টি হয়ে যায়।
তাদের যত সম্পদ
নরসিংদী শহরে তার একটি পাকা ও একটি টিনশেড বাড়ি আছে। টিনশেডটি ব্যবহার হয় বিরোধীদের শায়েস্তা করার ‘টর্চার সেল’ হিসাবে। শহরের বেলদি এলাকাইয় ৫ কোটি টাকা মূল্যমানের দুটি প্লট আছে তার নামে। সুমনের বাড়ি ব্রাহ্মণদীতে আছে দু’তলা আলিশান বাড়ি। ঢাকার ইন্দিরা রোডে লাক্সারিয়াস ভবনে তার নামে দুটি ফ্ল্যাট আছে।
দুটো হায়েস মাইক্রোবাস, একটি নোয়া, একটী হ্যারিয়ার ও একটি ভিজেল গাড়ি আছে তার। নরসিংদীতে তার কর্মীদের অবাধে বিচরন করার জন্য পাঁচটি মোটরসাইকেল আছে। সেখানে সুমনের কার ওয়াশ ব্যাবসার আড়ালে চলে মাদকের রমরমা ব্যবসা।
থাইল্যান্ডে সুমনের মদের বারের ব্যবসা আছে। সাথে আছে একতি নাইট ক্লাবও। নরসিংদী এসএমই শাখায় গত বছরে জুনে সুমনের নামে ছিল ১ লাখ ২৩ হাজার ৮২৯ টাকা। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের নরসিংদী শাখায় পাপিয়ার নামে ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার ৭৭০ টাকা। এই একাউন্টগুলোতে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকার মতন ডিপোজিট পাওয়া যায়। ঢাকার এফডিসি গেইটে তাদের “কার এক্সচেঞ্জ’ নামের একটা গাড়ির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের খবর পাওয়া যায়।
বার্তা বাজার/এসজে