১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন সিংগাইর উপজেলার বলধারা ইউনিয়নের পারিল (বর্তমান রফিক নগর) গ্রামের রত্ন প্রথম ভাষা শহীদ রফিক উদ্দিন আহমেদ। বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে আমাদের দিয়ে যান মায়ের ভাষা বাংলা। স্বাধীনতার এতো বছর পরেও কেমন আছে তাঁর সমাধিস্থল, কেমন আছে জন্মভিটা, পরিবার-পরিজন তার খবর নিতে সরজমিনে গেলে জানা যায় প্রকৃত অবস্থা।
সেখানে গিয়ে জানা যায় শুধুমাত্র ভাষার মাস এলেই পরিবারটির কদর বাড়ে। জাতীয় দিবস ও ভাষার মাসে আসেন দেশের বিভিন্ন বিশিষ্ট্যজন ও মিডিয়ার লোকজন। এমাস গেলেই কেউ আর তাদের খোঁজ-খবর রাখে না। শহীদ রফিক উদ্দিনের বসত বাড়ি যাওয়ার সড়কেও পিচ উঠে আলগা হয়ে গেছে খোয়া। বাড়ির চারপাশে নেই কোন ইটের দেয়াল।

পাটখড়ি আর বাঁশের চাটায়ের বেড়া দিয়ে কোন রকম সংরক্ষণ করা হয়েছে বাড়ির সীমানা। জন্মভিটায় সরকারি অনুদান বলতে বাড়ির উঠানে নির্মিত শহীদ মিনার। ছোট ছোট দুটি ঘর পাঠাগারের জন্য করে দিয়েছে প্রশিকা(এনজিও) মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র। ২০০৭ সালে বাড়ির অদুরে পারিল গ্রামে মানিকগঞ্জ জেলা পরিষদের ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৫৭ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে রফিক উদ্দিন আহমেদ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি যাদুঘর।
১৯২৬ সালের ৩০ অক্টোবর সিংগাইর উপজেলার অজোপাড়াগাঁয়ে জন্ম গ্রহণ করেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ রফিক উদ্দিন আহমেদ। তার বাবার নাম আবদুল লতিফ ও মা রোমেজা খাতুন। সাত (৫ ভাই ও দু বোন) ভাই-বোনের মধ্যে রফিক উদ্দিন ছিলেন সবার বড়। ভাইদের মধ্যে একমাত্র জীবিত আছেন রফিকের ছোটভাই খোরশেদ আলম।
শহিদ রফিকের ছোটভাই খোরশেদ আলম বলেন- ভাই হারানোর কষ্ট আর বেদনায় আজো কেঁদে উঠেন তিনি। আমার বয়স তখন মাত্র আড়াই বছর। বড়ভাই রফিকের কোনো স্মৃতিই আমার মনে নেই। শুনেছি বড় ভাই রফিক ছোট বেলায় বেশ চ ল ছিলেন। লেখা-পড়ার পাশাপাশি সাহিত্য, ছড়া, রচনা, সেলাই, সুচি শিল্পে তিনি ছিলেন বেশ পারদর্শী। এলাকার মানুষের দুঃখ-কষ্টে সব সময় তিনি নিঃস্বার্থ ভাবে এগিয়ে যেতেন। সমাজকল্যাণমূলক কাজে থাকতেন সবার আগে।
তিনি আরও বলেন, শৈশবে গ্রামের স্কুলেই লেখাপড়া করেন তিনি। মরহুম আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী ও বীরেন্দ্র মোহন দত্ত শিক্ষকদ্বয়ের সুযোগ্য ছাত্র হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। সিংগাইর উপজেলার বায়রা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪৯ সালে মেট্রিক পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে বাণিজ্য বিভাগে অধ্যয়ন করেন। এরপর তিনি ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। ঢাকায় থাকাকালিন সময় লেখাপড়ার পাশাপাশি রফিক বাবার সঙ্গে প্রেসের ব্যবসায় সহযোগিতা করতেন।
এ সময় তার বিয়ের কথা চলছিল গ্রামের তার পছন্দের মেয়ের সঙ্গে। একই গ্রামের নাসির উদ্দিনের কন্যা পানু বিবির সঙ্গে বিয়ের দিন তারিখও ঠিক হয়। কিন্তু বিয়ের পিড়িতে বসা হয়নি তার। বিয়ের বাজার করতে ঢাকায় গেলে ২১ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ যোগ দেন ভাষা আন্দোলনের ছাত্র-জনতার মিছিলে। সেই মিছিলেই প্রথম শহীদ হন রফিক উদ্দিন আহমেদ।
ভাষা আন্দোলনের পর পেরিয়ে গেছে কয়েক’টি যুগ। বাড়ির ঐতিহ্য রক্ষা করতে শহিদ রফিকের ছোট ভাই মৃত আব্দুল খালেকের স্ত্রী গোলেনূর বেগম (৭২) বসবাস করছেন ওই ভিটায়। তিনি বলেন, এই বাড়ির স্মৃতি রক্ষায় আমাকে এখানে থাকতে হচ্ছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে যেসব মানুষ এসে শহিদ রফিক সম্পর্কে তথ্য চাচ্ছেন তা দিতে দিতেই আমি ক্লান্ত। আমি আজ হার্টের রোগী, খুবই অসুস্থ, কথা বলতে কষ্ট হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘রফিকের একমাত্র জীবিত ভাই খোরশেদ আলম মানিকগঞ্জ সদরে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত বাড়িতে থাকেন। সবাই আসেন সাহায্যের আশ্বাস নিয়ে। কেউ আমাদের খবর রাখেন না। শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমাদের কথা মনে পড়ে। রফিকের ছোট ভাইয়ের ছেলে শাহজালাল ওরফে বাবু, তার স্ত্রী ও গোলেনূর বেগম থাকেন এই বাড়িতে।
শহীদ রফিকের ভাতিজা শাহজালাল ওরফে বাবু বলেন, ফেব্রুয়ারি মাস এলেই এখানে মানুষের ঢল নামে। তাছাড়া সারাবছর আর কেউ খোঁজ রাখে না।
স্থানীয়রা জানান, ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ভাষার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন তিনি। আর এজন্য আমরা অনেক গর্ববোধ করি। আমাদের গ্রাম এক সময় অনেক অবহেলিত ছিল, বর্তমান সরকার রাস্তাঘাট সংস্কার করে দিলেও শহিদ রফিকের বশত বাড়ির সংস্কারের কোন উদ্যোগ নেয়নি। শহিদ রফিকের অবহেলিত বাড়িতে একটি ভবন তৈরী করে দেয়ার জন্য আপনাদের মাধ্যমে দাবী জানাচ্ছি এবং বাড়িটিতে ইটের সীমানা প্রাচীর করে সংরক্ষনের অনুরোধ করছি।
২০০৮ সালে গ্রামের নাম রফিক নগর করা হলেও হয়নি কাংক্ষিত উন্নয়ন। এলাকার সাধারণ জনগণের দাবি ৫২’র প্রথম শহীদ রফিক উদ্দিনের এলাকার উন্নয়ন এবং রফিকের স্মৃতি, সমাধিস্থল ও জন্মভিটা সংরক্ষণের, রফিকের বাড়ি থেকে জেলা সড়কের উন্নয়নের মাধ্যমে মান্ষুরে জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করেন। তারা এলাকার জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সরকার শহীদ রফিকের নামে তার নিজ গ্রামে জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই মহান শহীদের নামে মানিকগঞ্জের প্রধান সড়ক, সিংগাইর শহীদ রফিক সরনী নামকরণ করা হয়।এ ছাড়া মানিকগঞ্জ-সিংগাইর-হেমায়েতপুর সড়কে ধলেশ্বরী নদীর উপর নির্মিত সেতুটির নামকরণ করা হয়।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইঞ্জিনিয়ার তোবারক হোসেন লুডু বলেন, শহিদ রফিকের বশত বাড়িতে ভবন করতে সরকার উদ্যোগ নিলে সম্ভব। এছাড়া আরও বলেন, রফিকনগরে একুশে ফেব্রুয়ারি প্রভাত ফেরীতে রফিকের বাড়িতে শহিদ মিনারে পুস্পস্তবক অর্পনসহ যাদুঘরের পাশে দিনব্যাপী কবিতা আবৃত্তি, নাটক, গান ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
একুশে ফেব্রুয়ারী উপলক্ষ্যে যাদুঘর এলাকায় ১৫ থেকে ২২তারিখ পর্যন্ত ৭দিন ব্যাপী একুশে মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
বার্তাবাজার/এমকে