সিঙ্গাপুরসহ একাধিক দেশে ক্যাসিনো খালেদের বিপুল পরিমাণ সম্পদের সন্ধান

যুবলীগ থেকে বহিষ্কৃত নেতা খালেদ মাহমুদ ভূ্ঁইয়া ওরফে ক্যাসিনো খালেদের বিদেশে বিপুল পরিমাণ সম্পদের সন্ধান পেয়েছে পুলিশের অপরাধ বিভাগ (সিআইডি)। গত চার মাসের তদন্তে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে তার অবৈধ সম্পদের সন্ধান পায় সংস্থাটি।

সিঙ্গাপুরে মেসার্স অর্পণ ট্রেডার্স প্রাইভেট লিমিটেডসহ আরও বেশ কিছু কোম্পানির মালিক ক্যাসিনো খালেদ। মালয়েশিয়ার আরএইচবি ব্যাংকের জাহুরবারু শাখায় মোটা অঙ্কের এফডিআর পাওয়া গেছে তার। এছাড়াও থাইল্যান্ডের বেশ কয়েকটি ব্যাংকে খালেদের বিপুল পরিমাণ টাকার সন্ধান পেয়েছে সিআইডি। এসব তথ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ক্যাসিনো খালেদের বিরুদ্ধে আদালতে করা মানি লন্ডারিং মামলার চার্জশিটে এমন বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন শাখায় এই চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। আজ (রোববার) আদালতে ওই চার্জশিট উপস্থাপন করা হবে। চার্জশিটে খালেদ ছাড়াও তার দুই ভাইসহ আরও ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে ক্যাসিনো খালেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, সংঘবদ্ধভাবে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং ক্যাসিনো ব্যবসা থেকে অবৈধ আয়ের প্রমাণ মিলেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

চার্জশিটে অভিযুক্তরা হলেন, ক্যাসিনো খালেদ, তার দুই ভাই মাসুদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও হারুনুর রশিদ ভূঁইয়া। এছাড়াও অন্যান্য অভিযুক্তরা হলেন, হারুন রশিদ, শাহাদাৎ হোসেন উজ্জ্বল, ও মোহাম্মদ উল্যাহ খাঁন।

সিআইডির ডিআইজি (স্পেশাল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন) ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘খালেদের মানি লন্ডারিং মামলার চার্জশিট চূড়ান্ত হয়েছে ১৯ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন আদালতের পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন শাখায় দাখিল করা হয়। ’ আজ রোববার (২৩ ফেব্রুয়ারি) আদালতে তা উপস্থাপন করা হবে বলেও জানান সিআইডির এই কর্মকর্তা।

সিআইডি সূত্র জানিয়েছে, ক্যাসিনো খালেদের বিরুদ্ধে তদন্তে তার ভ্রমণ বৃত্তান্ত ও জব্দকৃত পাসপোর্ট দেখা হয়েছে। পাসপোর্টে কোন বিদেশি মুদ্রা এনডোর্সমেন্ট ছাড়াই বহুবার বিদেশ ভ্রমণ করেন খালেদ। নগদ বিদেশি মুদ্রা বিদেশে পাচারের জন্যই এসব এসব অর্থ সাথে নিয়ে যেত বলে জানা যায়।

খালেদের বিএম০২৮৯২৮১ নম্বর পাসপোর্টের ৩১ নম্বর পৃষ্ঠায় মালয়েশিয়ার ভিসা লাগানো ছিল। ভিসা নম্বর পিই০৫১১১৬৪। এই ভিসাটি ইস্যু করা হয়েছিল ২০১৮ সালের ৪ মে। ২০২১ সালের ৪ মে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। তার ওই ভিসায় ‘MYS MY 2 HOME’ লেখা পাওয়া যায়, যা সেকেন্ড হোম ভিসা নামে পরিচিত। মূলত এই ভিসা নেওয়ার শর্ত হিসেবেই মালয়েশিয়ার আরএইচবি ব্যাংকের জাহুরবারু শাখায় এফডিআর করে রাখেন খালেদ, যা তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে মালয়েশিয়ায় পাচার করেছেন। এই অর্থের পরিমাণ তিন লাখ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত। তার কাছ থেকে যেসব বিদেশি ব্যাংকের ডেবিট কার্ড জব্দ করা হয় তার মধ্যে আএইচবি ব্যাংকের কার্ডও ছিল।

সিঙ্গাপুরে মেসার্স অর্পণ ট্রেডার্স নামে ক্যাসিনো খালেদের একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির সন্ধান পেয়েছে সিআইডি কর্মকর্তারা। এই কোম্পানি সিঙ্গাপুর সিটির জুরাং ইস্ট এলাকায়। এই কোম্পানির মূলধনও হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করেছেন খালেদ। তার নিজের ও কোম্পানির নামে থাকা ব্যাংক হিসাবেরও প্রমাণ মিলেছে। প্রমাণ হিসেবে সিঙ্গাপুরের ইউওবি ব্যাংকের ডেবিট কার্ড জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া তার নামে থাইল্যান্ডের ব্যাংকক ব্যাংকে একটি অ্যাকাউন্টে ২০ লাখ টাকার সমপরিমাণ থাই বাথ জমা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংকক ব্যাংকের তার আরও দুটি ডেবিট কার্ড জব্দ করা হয়েছে।

খালেদের নির্দেশে বিদেশি মুদ্রা কিনতেন মোহাম্মদ উল্যাহ। আদালতে ১৬৪ ধারায় বিদেশি মুদ্রা কেনার ব্যাপারে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দিও দিয়েছে মোহাম্মদ উল্যাহ। তদন্তে খালেদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে মাদক, অস্ত্র, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবজিসহ অবৈধভাবে আয় করা টাকা স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি মুদ্রায় অবৈধভাবে বিদেশে পাচার ও পাচারের চেষ্টায় জমা রাখার অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানান, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার মালিকানাধীন ভূঁইয়া অ্যান্ড ভূঁইয়া ডেভেলপার লিমিটেড, মেসার্স অর্পণ প্রোপার্টিজ ও অর্ক বিল্ডার্স নামে তিনটি ফার্মের জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে ২০১২ সাল থেকে মোহাম্মদ উল্যাহ কর্মরত ছিলেন। খালেদের অবৈধ আয়ের টাকা সংগ্রহ করতেন ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ উল্যাহ। পরে খালেদের ভাই মাসুদ মাহমুদ ভূঁইয়ার সঙ্গে গিয়ে এনসিসি ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় এবং ব্র্যাক ব্যাংকের মালিবাগ শাখায় অপরাধের টাকা জমা রাখতেন মোহাম্মদ উল্লাহ।

মোহাম্মদ উল্লাহর বিরুদ্ধে ক্যাসিনো খালেদকে মানি লন্ডারিংয়ে সহায়তা করার অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। একই অভিযোগে অন্যান্য অভিযুক্তরা পরস্পর যোগসাজশে খালেদের সব অপরাধের প্রত্যক্ষ সহযোগী ছিলেন বলে প্রমাণ পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গত বছরের ১৮ই সেপ্টেম্বর গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়। পরবর্তীতে শুদ্ধি অভিযানে ক্যাসিনো সম্রাট খ্যাত তৎকালীন মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতিসহ আরও বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ।।বাংলাদেশ প্রতিদিন।।

বার্তা বাজার / ডব্লিও.এস

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর