১. এই ছবিটি যখন তোলা হয় তখন তৃষার বয়স মাত্র ১০ বছর। ছোট্ট একটা মফস্বল শহর গাইবান্ধার মধ্যপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। সময় তখন ২০০২ সাল। এই গল্পটা ১৭ বছরের পুরনো, ১৭ বছরের পুরনো একটা হাহাকারের গল্প।
২. ১৭ জুলাই, ২০০২। বিকাল চারটায় স্কুল ছুটির পর আর সবার মতোই খুব আনন্দ নিয়ে, ব্যাগ কাঁধে, দু’পাশে দুটি ঝুঁটি দুলিয়ে বাড়ি ফিরছিলো মেয়েটা। পুরাতন হাসপাতালের ওখানে আসতেই মেয়েটার পথরোধ করে তিনজন ‘পুরুষ’। রান্নাবাটি খেলার বয়সী মেয়েটার কাছে রাখে প্রেমের প্রস্তাব! প্রেম-অপ্রেম বোঝার বয়স না হলেও মেয়েটার ভেতরে সুপ্ত নারী সত্তাটা জেগে উঠে। মেয়েটা জেনে যায় এই পৃথিবীটা মেয়েদের নিরাপদ আবাস নয়। বুকের গভীরে কেউ চিৎকার করে জানায়, ‘তৃষা, তুমি পালাও!’
৩. পালাতে পারেনি মেয়েটা। না ধরাও পড়েনি ‘পুরুষ’ নামের পশুর হাতে। ছোট্ট মনে ভর করা ভীষণ আতঙ্কে মেয়েটা ঢুকেছিলো এমন গলিতে যেটা গিয়ে মিশেছে একটা পুকুরে। সামনে ভরা বর্ষায় থৈ থৈ করতে থাকা পুকুর, পেছনে তিনজন হায়েনার মতো লালা ঝরাতে ঝরাতে এগিয়ে আসা ‘পুরুষ’। মেয়েটা সম্ভ্রমের কী বুঝতো কে জানে, তবু শেষ চেষ্টায় পুকুরেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। অতোটুকুন হাত-পায়ে সাঁতরে ওপারে যেতে পারেনি। ড্রবে মরেছিলো মেয়েটা মাঝপুকুরেই। ঘড়িতে সময় তখন বিকাল সাড়ে চারটা।
৪. ছোট্ট শহরটা পরেরদিন সকাল হতেই জেনে যায় সবটা। তীব্র বিষাদ ঘিরে থাকা দিনে তবু মানুষ ফুসে উঠে, ফাঁসির দাবিতে। বিষণœতার নগরীতে নেমে আসে অদ্ভুত রূপকথা। সেইদিনই ধরা পড়ে তিন হায়েনা। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় মামলা কোর্টে উঠে। অভিযুক্ত আসামিদের পক্ষে মামলা লড়ার জন্য কোনো উকিল দাঁড়ায় না। কী অবিশ্বাস্য সময়! আদালত দেখায় ন্যায়বিচারের অপূর্ব এক দৃষ্টান্ত। মাত্র ৯২ দিনের মাথায়, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০০২ তারিখে তিন আসামির ফাঁসির আদেশ হয়। তৃষা হেসে ওঠে দূর কোনো নক্ষত্র থেকে।
৫. গল্পটা এখানেই শেষ হবার কথা ছিলো। কিন্তু শেষ হলো না। জেলা জজ কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হয়। হাইকোর্ট ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন। আকাশ থেকে তাকিয়ে দেখা তৃষা হাততালি দিয়ে উঠে। ন্যায়বিচার পাবার খুশিতে।
৬. ভাবছেন গল্পটা শেষ হলো। উহু! হয়নি। মাথার উপরে বসে আছে আরেক অবতার সুপ্রিম কোর্ট। আপিল চলতে থাকে সেখানে। আমরা একে একে বড় হয়ে যাই, আমাদের বয়স কৈশোর ছাড়িয়ে যৌবনে চলে যায়। যুবক তখন মধ্য পুরুষ। সময়কাল ২ জুন, ২০১২। সুপ্রিম কোর্ট ফাঁসি রদ করার আদেশ দেন। জী, আসামিদের শাস্তি কমিয়ে ১৪ বছরের কারাদ-ে দ-িত করা হয়। ততোদিনে সবাই ভুলে গেছি আমরা ছোট্ট মেয়েটার কথা, তার হত্যাকারীর ফাঁসি দেখবে বলে অপেক্ষায় থাকা ফুটফুটে মেয়েটার কথা। ফলাও করে কোথাও ছাপা হয়নি এই খবর, কেউ লেখেনি একটা নক্ষত্রের ফুল সেদিন খুব কষ্টে নিভে গিয়েছিলো অনন্ত আকাশের ভেতর।
৭. ২০১৯ সালে এসে কী আশা করেন আপনারা? গল্পটা বদলাবে? বাস্তবতায় আসুন। নুসরাতও বিচার পাবে না। এই অভাগা দেশের বুকে খুনি হায়েনারা হেঁটে যাবে প্রতি মূহুর্তে। ওরাই ভালো থাকবে। আপনি-আমি ভীষণ অভিশাপে দগ্ধ হবো। মহাকালের গহীন অন্ধকার থেকে আসা অভিশাপ, তৃষা-নুসরাতের দীর্ঘশ্বাসের অভিশাপ…
৮. তৃষার হত্যাকারী তিনজনের নাম শাহীন, আশা ও মডার্ন। ২০১৬ সালে ১৪ বছর সাজা কাটিয়ে মুক্ত বাতাসে ওরা হাঁটছে। সিরাজ উদদৌলাও হাঁটবে অল্প ক’দিন পরই। মুক্ত হায়েনাদের সঙ্গে মিলেমিশে কাটানোর যে নতুন বছর এলো, সেই বছরের শুভেচ্ছা সবাইকে। ফেসবুক থেকে
সূএ: আমাদের সময়.কম