দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) এক সহকারী অধ্যাপকের বিরুদ্ধে একই বিভাগের ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮তম রিজেন্ট বোর্ডে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন রিজেন্ট বোর্ডের একটি বিশ্বস্থ সূত্র।
এর আগে ২০১৭ সালের ২৩ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের মাস্টার্সের এক ছাত্রী তার মাস্টার্স প্রোগ্রামের তত্ত্বাবধায়ক ও বিভাগের শিক্ষক ড. মো. রমজান আলীর বিরুদ্ধে রেজিস্ট্রার এবং পোস্ট গ্রাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদের ডীন বরাবর যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন।
লিখিত অভিযোগে ওই ছাত্রী বলেন, ‘অভিযুক্ত শিক্ষক আমাকে প্রায়ই তার বাসায় যেতে বলেন। একবার তিনি আমাকে গবেষণা কাজের জন্য একটা নমুনা বীজ সংগ্রহ করতে বলেন। আমি ঝিনাইদহের এক ব্যবসায়ীর খোঁজ তাঁকে দিই। তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে এক সঙ্গে থাকার প্রস্তাব দেন। আমি অনাগ্রহ প্রকাশ করি। কিছুদিন ধরে কয়েক দফায় তিনি আমাকে খাতা দেখার জন্য ও গবেষণাপত্র লেখার জন্য তার বাসায় যাওয়ার জন্য জোর করেন। ওই শিক্ষক আমাকে বলেন, গবেষণার কাজ বাসাতেই করতে হবে। এর জন্য নিরিবিলি পরিবেশ দরকার। অনেক সময় তোমাকে আমার সঙ্গে বাইরে যেতে হবে। এক পর্যায়ে ওই শিক্ষক আমাকে কুপ্রস্তাব দেন।’
ঐ ছাত্রী আরো অভিযোগ করেন, ‘তার এমন প্রস্তাবে রাজি না হলে ডা. রমজান আলী প্রপোজাল জমা দেওয়ার অসহযোগিতাসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করেন।’
অভিযোগের প্রেক্ষিতে একই বছরের ২৪ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। অধ্যাপক ভবেন্দ্র কুমার বিশ্বাসের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যানসহ ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি ৩১ জুলাই তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে মো. রমজান আলী এক ছাত্রীকে অনৈতিক কাজে চাপ প্রয়োগ করার প্রমাণ পায়। ওই তদন্ত কমিটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে শিক্ষক রমজান আলীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন।
সুপারিশের প্রেক্ষিতে অভিযুক্ত শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তে রমজান আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা মিললেও শুধু সতর্ক করে দিয়ে এক বছর তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সে সময় রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. সফিউল আলমের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে এযাবৎ যত গুলো ঘটনা ঘটেছে সব গুলোই মানসিক নির্যাতন। কোনোটাই যৌন হয়রানি নয়।’
তার কয়েক মাস পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইউটিউবে ২৩ মিনিটের একটি অডিও ভাইরাল হয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে আবারো সমালোচনার ঝড় উঠে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়সহ দিনাজপুরে। ৪টি খন্ডের ওই অডিও থেকে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। ওই সময় থেকে অভিযুক্ত শিক্ষক রমজান আলীকে স্থায়ী বহিস্কার চেয়ে বিভিন্ন নারী ও সামাজিক সংগঠন আন্দোলন করে আসছিল। এছাড়াও গৃহকর্মীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টার অভিযোগ আছে ঐ শিক্ষকের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, শিক্ষক রমজান আলীর বিরুদ্ধে তার স্ত্রী যৌতুক আইনে মামলা করেছিলেন। দফায় দফায় রিজেন্ট বোর্ডে এবিষয়টি উত্থাপন করা হলেও এতদিন কোন সমাধান হয়নি। তবে শনিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ডে শিক্ষক রমজান আলীকে স্থায়ী বহিস্কার করা হয়।
এ বিষয়ে রিজেন্ট বোর্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘যৌন হয়রানির অভিযোগে আজকে (শনিবার) ৪৮তম রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষক রমজান আলীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিস্কার করা হয়েছে। যেহেতু আজকে সিদ্ধান্ত হয়েছে এজন্য এখনো চিঠি যায়নি। এক দু’দিনের মধ্যেই ওই শিক্ষকের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে চিঠি যাবে।’
বার্তা বাজার / ডব্লিও.এস