তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভূখণ্ডগত ব্যবধান যেমন ছিল তেমনি ছিল মানসিকতাগত দূরত্বও। শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকেই যে উদারতার প্রয়োজন ছিল তা দেখাতে ব্যর্থ হয়। তাদের মানসিকতায় উপনিবেশিক আমলের ধ্যান-ধারণা ষ্পষ্ট ছিল।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাস করলেও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ করতো পাক শাষকরা। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে পাকিস্তানি শাসকদের একচোখা মনোভাব স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ করে তোলে সবাইকে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই তাই দূরদর্শী ব্যক্তিরা দেশটির ভবিষ্যত নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল পালিত হয়। এই হরতালটি ছিল পাকিস্তানোত্তর এ দেশে প্রথম হরতাল। তমদ্দুন মজলিস ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ যৌথভাবে এই হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করে। যৌথভাবে ডাকা হরতাল সমগ্র সফলভাবে হরতাল পালিত হয়পূর্ববাংলায় ।
১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তমদ্দুন মজলিস ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের মধ্যে যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১১ মার্চ পূর্ববাংলায় হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত হয়।
যেদিন হরতাল পালিত হয় (১১ মার্চ) ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা হবে’ মর্মে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কর্মপরিষদের একটি লিখিত চুক্তি স্বাক্ষর হয়। মূলত এই স্বাক্ষর ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রথম বিজয়। ১৯৫২ সালের আগ পর্যন্ত প্রতি বছর ১১ মার্চকে ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হতো।
কিন্তু রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কর্মপরিষদের সাথে করা চুক্তি ভুলে গিয়ে খাজা নাজিমুদ্দিন ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে এক জনসভায় ঘোষণা করেন ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। ফলে ভাষা আন্দোলন আবার একটি নতুনপর্যায়ে প্রবেশ করে। নতুন মাত্রা লাভ করে। শুরু হয় নতুন অধ্যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রতিটি শিাপ্রতিষ্ঠান এই ঘোষণার প্রতিবাদে ধর্মঘট পালন করে। এই ঘোষণার এক মাসেরও কম সময়ে আন্দোলন তার চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে এবং ২১ ফেব্রুয়ারির বিয়োগান্তক ঘটনার মধ্য দিয়ে সাফল্য আসে।
খাজা নাজিমুদ্দিনের ঘোষনার পর ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণেএক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। যার আয়োজক ছিল বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ৩১ জানুয়ারি ওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ঢাকা বার লাইব্রেরিতে সর্বদলীয় বৈঠক হয়। বৈঠকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পরিচালনার জন্য মওলানা ভাসানীকে আহ্বায়ক করে ৪০ সদস্যের একটি সর্বদলীয় কর্মপরিষদ গঠিত হয়।
সর্বদলীয় কর্মপরিষরে অন্য সদস্যরা ছিলেন : আবুল হাশিম, শামসুল হক, আব্দুল গফুর, আবুল কাসেম, আতাউর রহমান খান, কামরুদ্দিন আহমদ, খয়রাত হোসেন, আনোয়ারা খাতুন, আলমাস আলী, আব্দুল আওয়াল, অলি আহাদ, শামছুল হক চৌধুরী, মোহাম্মদ তোয়াহা, সৈয়দ আব্দুর রহিম, খালেক নেওয়াজ খান, কাজী গোলাম মাহবুব, মির্জা গোলাম হাফিজ, মজিবুল হক, হেদায়েত হোসেন চৌধুরী, আনোয়ারুল হক খান, গোলাম মাওলা প্রমুখ। এই কর্মপরিষদের দিকনির্দেশনা ও পরিচালনায় বেগবান হয়ে ওঠে রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন।
বার্তা বাজার / ডব্লিও.এস