দীর্ঘ ২৮ বছর পর নির্বাচনের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (ডাকসু) নতুন নেতৃত্ব উঠে আসে। ডাকসুর ২৫টি পদের মধ্যে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও সহ-সাধারণ সম্পাদকসহ (এজিএস) ২৩টি পদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ মনোনীত প্যানেলের প্রার্থী এবং সহ-সভাপতি (ভিপি) ও সমাজসেবা সম্পাদক পদে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী প্লাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্যানেলের প্রার্থীরা জয়ী হন। এ ছাত্র সংসদের নির্বাচনের আগে ছাত্রলীগের সঙ্গে ছাত্র অধিকার পরিষদের যে বিরোধ চলছিল, বিভিন্ন ইস্যুতে ডাকসুতেও সেসব বিরোধ দেখা যায়। এই বিরোধ-বিবাদে কেটে গেছে ডাকসুর ১১ মাস।
অবশেষে এই বিরোধের বরফ গলতে দেখা গেল শনিবার (৮ ফেব্রুয়ারি)। এদিন ডাকসুর বৈঠকের এজেন্ডায় রাখা হয় উভয়পক্ষের আলোচ্যবিষয়। এমনকি উত্থাপিত বিষয়ে উভয়পক্ষের নেতারাই একমত হন। বিরোধ মিটিয়ে সামনের দিনগুলোতে একসাথে কাজ করার কথা বলেছেন ভিপি নুর ও জিএস রাব্বানী। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে আক্ষেপ করেছেন ফেলে আসা প্রায় ১১টি মাস নিয়ে।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর গত বছরের ১১ মার্চ বহুলকাঙ্ক্ষিত ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভিপি (সহ-সভাপতি) পদে ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে হারিয়ে জয়লাভ করেন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক নুরুল হক নুর। জিএস পদে প্রার্থী হন ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী এবং ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন। এ পদে জয়লাভ করেন রাব্বানী।
ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, নির্বাচনের পর তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি শোভনের অনুসারীসহ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নুরকে ভিপি হিসেবে মেনে নিতে পারেননি। সেজন্য নুর যেন ভিপি হিসেবে কোনো কার্যক্রম চালাতে না পারেন, সেজন্য ছাত্রলীগ প্রকাশ্যে ও গোপনে বিভিন্নভাবে বাধা দিতে থাকে। সেইসাথে নুরের প্যানেল থেকে নির্বাচিত সমাজসেবা সম্পাদকের বিভিন্ন কার্যক্রমেও বাধা-বিঘ্নের সৃষ্টি করে ছাত্রলীগ। সেজন্যই সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্যানেল থেকে নির্বাচিত ডাকসুর দুই নেতা তেমন কোনো কার্যক্রম দেখাতে পারেননি।
অন্যদিকে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেও ভিপি নূরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। তারা বলে আসছিল, ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদকের কারণে শিক্ষার্থীবান্ধব দাবি আদায়ে এগোনো যায়নি। সেজন্য ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে নির্বাচিত বিভিন্ন সম্পাদকরা আলাদাভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন।
এসব কারণে ছাত্রলীগের প্যানেলের নির্বাচিত সম্পাদকদের অনুষ্ঠানে ভিপি নুরকে দাওয়াত দেয়া হতো না, অথবা ভিপি যেতেন না। আবার ভিপি বা সমাজসেবা সম্পাদকের অনুষ্ঠানে জিএস-এজিএসসহ অন্য সম্পাদকরা আসতেন না।
ভিপি-সমাজসেবা সম্পাদকের কিছু কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের হামলার অভিযোগও পাওয়া যায়। এমনকি গত ২২ ডিসেম্বর ডাকসুতে হামলা চালিয়ে ভিপি নুরুল হক নুরসহ ৩৫ জনকে পিটিয়ে জখম করার ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চকে দায়ী করা হলেও অভিযোগের তীর মূলত ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী ও এজিএস সাদ্দাম হোসেনসহ ছাত্রলীগের নেতাদের দিকেই গিয়েছে।
তবে গত শনিবার অনুষ্ঠিত ডাকসুর কার্যকরী সভায়সব বিরোধ যেন ‘মুছে’ যায়। সভায় দুই পক্ষের উত্থাপিত এজেন্ডা নিয়ে একমত প্রকাশ করতে দেখা যায় নেতাদের। উভয়েই সব দাবির সাথে একমত হন। যদিও এজেন্ডা নির্ধারণ নিয়ে শুরুতে বাহাস দেখা যায়। পরে দু’পক্ষের মতৈক্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন দাবি উত্থাপিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও তা মানার বিষয়ে আশ্বস্ত করে। এর আগে প্রশাসন ছাত্রলীগের নির্বাচিতদের বিভিন্ন দাবি মানলেও ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নির্বাচিতদের দাবি মানছিল না বলে অভিযোগ শোনা যায়।
এজেন্ডা নিয়ে ছাত্রলীগের প্যানেলের ‘বিদ্রোহ’
ডাকসুর কার্যকরী সভায় উত্থাপিত দাবির বিষয়ে বিবাদমান উভয়পক্ষ একমত হলেও শুরুতে বিরোধিতা দেখা যায় এজেন্ডা নির্ধারণ নিয়ে। ছাত্রলীগের প্যানেলের নির্বাচিত কয়েকজন সম্পাদককেও এই বিরোধিতায় দেখা যায়। তারা দাবি করেন, ডাকসুর জিএস (গোলাম রাব্বানী) নিজের ইচ্ছেমতো কারও সাথে আলোচনা না করে এজেন্ডা ঠিক করেছেন।
বার্তা বাজার / ডব্লিও.এস