বিদেশিরা প্রতি বছর পাচার করছে ২৬৪০০ কোটি টাকা

বাংলাদেশে কাজ করে এমন লোকদের মাধ্যমে বছরে ২৬,৪০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয় বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি। সংস্থাটি একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে জানিয়েছে বাংলাদেশে অন্তত আড়াই লাখ বিদেশি নাগরিক কাজ করছেন। গড়ে তারা বেতন পান মাসে দেড় হাজার ডলার। তাদের একটি বড় অংশ অবৈধভাবে বিদেশে টাকা পাঠান। এই টাকার পরিমান অন্তত ২৬৪০০ কোটি টাকা।

এতে সরকার বছরে ১২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। টিআইবি জানিয়েছে সরকারি হিসেবে আড়াই লাখ হলেও মূলত বৈধ ও অবৈধ উপায়ে ৫ থেকে ১০ লাখ বিদেশি কর্মী কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে পর্যটক ভিসায় এসে কাজ করছেন ১ লাখ ৬০ হাজার কর্মী।

গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডিস্থ মাইডাস সেন্টারে টিআইবি’র কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। টিআইবি’র কর্মসূচি ব্যবস্থাপক মনজুর ই খোদার গবেষণা ‘বাংলাদেশে বিদেশি কর্মসংস্থান: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণার তথ্য তিনি নিজেই তুলে ধরেন।

গবেষণায় উঠে আসে, সত্তরের দশকে বাংলাদেশের জিডিপি’তে কৃষির অবদান ছিলো ৪৪ শতাংশ। যা ২০১৮ সালে গিয়ে হয় মাত্র ১৪ শতাংশ। অপরদিকে সত্তরের দশকে শিল্পের অবদান ছিলো ১১ শতাংশ ও ২০১৮ সালে তা ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ১৯৮০’র দশকে সরকার কর্তৃক বিভিন্ন বিদেশি বিনিয়োগ বান্ধব উদ্যোগের ফলে বিদেশি কর্মীদের আকৃষ্ট করে। বিশ্বব্যাংক ও আইএলও, ২০১৭’র বরাদ দিয়ে তারা বলছে বাংলাদেশি শিক্ষিত বেকারের হার ৪৭ শতাংশ। ফলে এই বিদেশিরা বাংলাদেশিদের প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে ও সুযোগ সংকুচিত করছে। টিআইবি বলছে, চার দশক আগে বিদেশিদের প্রয়োজন থাকলেও বর্তমানে প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ।

টিআইবি’র তথ্যমতে বর্তমানে ৪৪টি দেশের নাগরিক বাংলাদেশে কর্মরত আছেন। এরমধ্যে অন্যতম ভারত, চীন, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, নরওয়ে ও নাইজেরিয়া। এসব নাগরিক মূলত ২১টি সেক্টরে কাজ করেন। এরমধ্যে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, বায়িং হাউজ, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র অন্যতম। বিদেশি কর্মী নিয়োগের কারণ ও প্রয়োজনীয়তায় দেখা যায়, বাংলাদেশিদের মাঝে শিল্পখাতে সয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারে দক্ষতার অভাব, যোগাযোগ অদক্ষতা, অকারণ বিদেশিদের পছন্দ করা, প্রয়োজনীয় কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাবের কারণে।

এছাড়াও স্থানীয় শিক্ষিতদের কারখানা পর্যায়ে কাজে অনীহাও বিদেশি কর্মী নিয়োগের অন্যতম কারণ। টিআইবির পক্ষ থেকে বলা হয় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে বিদেশি কর্মী নিয়োগে বোর্ডের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্থানীয় যোগ্য প্রার্থী খোঁজা হয়না এবং বিদেশি প্রার্থী নিয়োগের সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে রাখা হয়। বিদেশে বাংলাদেশি মিশনে ভিসার সুপারিশ পত্র ছাড়াই এমপ্লয়মেন্ট ভিসা ইস্যু করা হয়।

টুরিস্ট ভিসা ইস্যুর ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া যায়। তারা বলছে, একজন বিদেশি কর্মী যারা বাংলাদেশে আসে তাদের নিয়মবহির্ভূতভাবে ২৩ থেকে ৩৪ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। সর্বোচ্চ ৫ থেকে ৭ হাজার হাজার টাকা ভিসা সুপারিশে, বিদেশে বাংলাদেশি মিশন হতে ভিসা সংগ্রহে দিতে হয় সাড়ে ৪ হাজার টাকা থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত।

গবেষণায় উঠে আসে কর ফাঁকির ক্ষেত্রে বৈধভাবে কর্মরত কর্মীর বেতন প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্রে প্রকৃত বেতন অপেক্ষা কম দেখানো হয়। বেতনের এক তৃতীয়াংশ ব্যাংকের মাধ্যমে দেয়া হলেও বাকী অর্থ অবৈধভাবে নগদ দেয়া হয়। আবার অবৈধভাবে কর্মরত কর্মীর শতভাগ বেতন নগদ অথবা দুবাই বা সিঙ্গাপুরের ব্যাংক একাউন্টে দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো দেশি বিদেশি কর্মীদের অনুপাত মানা হয়না, নথিতে বিদেশি কর্মীর উল্লেখ রাখা হয়না ইত্যাদি।

বাংলাদেশে বর্তমানে তৈরি পোশাকখাতে সর্বোচ্চ পরিমাণ বিদেশি কর্মরত আছেন। ১০ ধরণের পদের মধ্যে সর্বোচ্চ বেতন পান সিইও। তাদের বেতন মাসিক সাড়ে ৮ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত। আর নথিতে তারা দেখান আড়াই লাখ টাকা থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। এই প্রতিবেদনে বিদেশি কর্মীর (২০১৮-২০১৯) কর ফাঁকি দেয়ার তথ্যে দেখা যায়, কর অঞ্চল-১১ দেয়া বিদেশী কর্মীর সংখ্যা সাড়ে ৯ হাজার। প্রদত্ত করের মোট পরিমাণ ১৮১ কোটি টাকা। সকল বিদেশি কর্মীর প্রদর্শিত বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ৬০৩ কোটি টাকা। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিদেশি কর্মী প্রদর্শিত মাসিক বেতন ৫৩ হাজার টাকা।

টিআইবি বলছে, বিভিন্ন উৎস হতে প্রাপ্ত তথ্যের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বিদেশি কর্মীর বৈধ ও অবৈধ সংখ্যা ২ লাখ থেকে ১২ লাখ ৬০ হাজার জন। সাবেক প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর দেয়া তথ্যমতে (আক্টেবর ২০১৭) বৈধ অবৈধ ২ লাখ ও জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর (ফেব্রুয়ারি ২০১৮) বলেন, বৈধভাবে কর্মরতের সংখ্যা ৮৫ হাজার ৪৮৬ জন।

আর ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ইস্যুকৃত কর্মোপযোগী ভিসার সংখ্যা ২০১৮ সালে ৩৩ হাজার ৪০৫ জন। এছাড়াও বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের তথ্যানুযায়ী ২০১৮ সালে ৮ লাখ বিদেশি পর্যটন ভিসায় আসেন। এদের মধ্যে ন্যূনতম ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ কাজের উদ্দেশ্যে। বাংলাদেশ থেকে বৈধ ও অবৈধভাবে প্রেরিত রেমিটেন্সের পরিমাণ গণমাধ্যমের পাওয়া তথ্যানুযায়ী ৫ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার, সাবেক প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর (আক্টেবর ২০১৭) দেয়া তথ্যমতে, বৈধ ও অবৈধভাবে ৬ বিলিয়ন ডলার, সাবেক অর্থমন্ত্রী (১৩ই মে ২০১৮) জানান, ৫ বিলিয়ন ডলার, বিশ্ব ব্যাংক (২০১৭) বৈধ ও অবৈধভাবে ২.১১ বিলিয়ন ডলার ও বাংলাদেশ ব্যাংককের তথ্যমতে বৈধভাবে প্রেরিত রেমিটেন্স ৪৬.৬ মিলিয়ন ডলার। ফলে বিদেশিদের কারণে আমাদের রাজস্বের ক্ষতি হচ্ছে ১.৩৫ বিলিয়ন ডলার বা ১২ হাজার কোটি টাকা।

টিআইবি’র গবেষণাপত্র প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের তাগিদে এদেশে বিদেশি কর্মী প্রয়োজন। এজন্য ভিসা, কর্মানুমতি, বেতন কাঠামো ঠিক করা হয়েছে। এসব নীতিমালা পালনের চর্চার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। আইন লঙ্ঘন হয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। নিয়োগকর্তা ও সরকারি পক্ষের যোগসাজশেই এসব অনিয়ম হয়। তিনি আরো বলেন, এসবের কারণে ব্যাপকভাবে অর্থ পাচার হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স বিদেশে যাচ্ছে এবং অবৈধভাবে অর্থ পাচার হচ্ছে তা খুবই উদ্বেগজনক। দেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। তবে বিদেশে অর্থ পাচারের ফলে এ উন্নয়নের সুফল দেশবাসী পাচ্ছেন না।

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান ও সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহজাদা এম আকরাম।

বার্তা বাজার / ডব্লিও.এস

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর