জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) একটি মাইক্রোবাস কবজায় নিয়ে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে পরিবহন অফিসের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত অধ্যাপক আলী আজম তালুকদার নিয়মবহির্ভূত সার্বক্ষণিক ৩০ লাখ টাকা দামের একটি মাইক্রোবাস ও একজন চালক ব্যবহার করেন। আবার এই গাড়ির জ্বালানি এবং চালকের বেতন দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাগার থেকে।
এই প্রতিবেদকের হাতে আসা দুইটি ফিলিং স্টেশনের হিসাব বলছে, পরিবহনের অফিসের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক আলী আজম তালুকদারের ব্যবহৃত গাড়িতে গত বছর জ্বালানি ব্যয় হয়েছে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪৫৭ টাকা। এই টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাগার থেকে পরিশোধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবহন অফিসের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।
এ ছাড়া গাড়ি চালকের বেতন বাবদ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাগার থেকে গত বছর আরও ৫ লাখ ৭৯ হাজার ৯৯০ টাকা খরচ হয়েছে বলে জানা গেছে। গত বছর সব মিলিয়ে এই শিক্ষকের পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ব্যয় ৯ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৭ টাকা।
তবে অধ্যাপক আলী আজম তালুকদারের আগে পরিবহন অফিসে সংশ্লিষ্ট পদে দায়িত্ব পালন করা তিন শিক্ষকের সাথে কথা বললে তারা জানান, পরিবহনের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক পদে দায়িত্ব পালন করতে পরিবহনে এত টাকা খরচ হওয়ার কথা না। কারণ এই পদের জন্য সার্বক্ষণিক গাড়ির প্রয়োজন হয় না। আর সার্বক্ষণিক মাইক্রোবাস ব্যবহার করাটা মাত্রাতিরিক্ত বিলাসিতা।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, রেজিস্ট্রার এবং প্রক্টরের জন্য গাড়ি ব্যবহারের অনুমতি আছে। সিন্ডিকেটে এই প্রশাসনিক পদধারীদের জন্য গাড়ি ব্যবহারের অনুমতির সঙ্গে বেঁধে দেয়া হয়েছে জ্বালানি খরচের পরিমাণ।
নির্ধারিত জ্বালানির বেশি খরচ হলে বর্ধিত টাকা তাদের বেতন থেকে কেটে নেয়া হয়। হিসেব অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এবং রেজিস্ট্রারের জন্য ৩০০ ইউনিট (অকটেন, ডিজেল এবং এলপিজির যে কোনো একটি) জ্বালানী নির্ধারণ করা আছে। এর বেশি জ্বালানি ব্যবহার করলে তাদের বেতন থেকে বাকি অর্থ কেটে নেয়া হয়।
একইভাবে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষের গাড়ির জন্যও নির্দিষ্ট জ্বালানি নির্ধারণ করা রয়েছে। কিন্তু এই পদধারীদের বাইরে গিয়ে সিন্ডিকেটের কোনো নিয়ম না থাকা সত্ত্বেও পরিবহন অফিসের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক সার্বক্ষণিক ড্রাইভারসহ ৩০ লাখ টাকা দামের একটি মাইক্রোবাস (গাড়ি নং ৩৩১৫) ব্যবহার করেন।
সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, পরিবহন অফিসের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকের জন্য বৈধ গাড়ি বরাদ্দ না থাকায় অধ্যাপক আজম নিজের ‘ইচ্ছানুযায়ী’ জ্বালানি ব্যবহার করেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দুইটি ফিলিং স্টেশন থেকে তার ব্যবহৃত গাড়ির জন্য জ্বালানি কিনেছেন ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪৫৭ টাকার। সাভার সি.এন.জি রিফুয়েলিং স্টেশন ও এম/এস সাহারা ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড সার্ভিস থেকে এই জ্বালানি কেনা হয়।
এই দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাব বলছে, গত জুলাই মাসে অধ্যাপক আজম ওই গাড়ির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেছেন ৭৯৮ ইউনিট, যে মাসে প্রক্টর ব্যবহার করেছেন ৩৩১ ইউনিট। এ ছাড়া একই মডেলের ভাড়ায় চলা পরিবহন পুলের অপর গাড়ির জ্বালানি ব্যয় হয়েছে ৩৮৭ ইউনিট।
তথ্যমতে, এই শিক্ষকের জ্বালানি ব্যয় গত মে মাসে ৩১৬ ইউনিট, জুনে ৩৬৫ ইউনিট, আগস্টে ৩২৩ ইউনিট, সেপ্টেম্বর ৫০৫ ইউনিট, অক্টোবরে ৫৫৫, নভেম্বরে ৫৮৭ ইউনিট এবং সর্বশেষ ডিসেম্বরে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২৬ ইউনিটে।
এ ছাড়া এই শিক্ষকের ব্যক্তিগত ড্রাইভারের পেছনে গত বছর বেতন-ভাতা বাবদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় হয়েছে ৫ লাখ ৭৯ হাজার ৯৯০ টাকা। যেখানে ওই ড্রাইভারের ওভারটাইম বাবদ ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৯০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে তার ড্রাইভার ২৫০ ঘণ্টা ওভারটাইমের জন্য বেতন তুলেছেন।
কিন্তু এই ওভার টাইমের একটি ঘণ্টাও বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কাজে ব্যয় হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্মকর্তা। সবমিলিয়ে এই শিক্ষকের পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ব্যয় বছরে ৯ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৭ টাকা।
এসব বিষয়ে জানতে পরিবহনের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক আলী আজম তালুকদারকে ফোন দেওয়া হলে মুঠোফোনে কোনো মন্তব্য করবেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন অফিসের তদারকির দায়িত্ব পালন করেন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন)। এ পদে দায়িত্ব পালনকারী অধ্যাপক আমির হোসেনের কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পরিবহন ও মেডিকেলের তদারকির দায়িত্ব আমার। কিন্তু সিন্ডিকেটে এ বিষয়টি বারবার বলার পরেও আমাকে কোনো কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয় না। তাই পরিবহনে কী হচ্ছে না হচ্ছে সেটা আমি জানিও না, বলতেও পারি না। তবে পরিবহনে এমন অর্থের অপচয় হলে সেটা খুবই দুঃখজনক’। ।।জাগো নিউজ।।
বার্তা বাজার / ওয়ালিদ