টাঙ্গাইল রেসিডেনসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কে ঘিরে কি চলছে?

ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় ‘টাঙ্গাইল রেসিডেনসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ নামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি এই অঞ্চলে বেশ সুনামের সাথে স্বীকৃত একটি প্রতিষ্ঠান। আশুলিয়ার ইউনিক এলাকায় ও ধামরাইয়ে এই প্রতিষ্ঠানের মোট ৬টি ক্যাম্পাস রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার দুই ভাইয়ের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এর কারণে বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি দ্বিধাবিভক্ত মালিকানায় এক জটিল অবস্থার ঘূর্ণিপাকে বেসামাল।

প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের দায়িত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ আবদুল লতিফ। কিন্তু তার বড় ভাই প্রতিষ্ঠানটির সাবেক সভাপতি মাসুদ রানা’র সাথে দ্বন্দ্বের কারণে গত বছরের ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠানগুলো ভাগ হয়ে যায়। বর্তমানে আশুলিয়ার ইউনিক এলাকার স্কুল শাখার মূল ক্যাম্পাসসহ কলেজ পরিচালনার দায়িত্ব পান মোহাম্মদ আবদুল লতিফ। এই ক্যাম্পাস থেকে এবার ২৮৪ জন শিক্ষার্থী আশুলিয়ার গণবিদ্যাপীঠ স্কুল কেন্দ্রে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।

তবে সর্বশেষ গতকাল বুধবার দিবাগত রাতে এবং বৃহস্পতিবার দুপুরে সংঘটিত দুইটি ঘটনার কারণে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্থানীয় জনমনে বিভ্রান্তি সহ মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, বুধবার দিবাগত রাতে আশুলিয়ার ইউনিক এলাকায় টাঙ্গাইল রেসিডেনসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এর বহুতল ভবনে আবাসিক ছাত্রদের কক্ষে এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। কলেজের সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রদের দ্বারা এই ভবনে অবস্থানরত এবারের আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার্থীদের উপর হামলার ঘটনায় সায়েম আলী নামের এক ছাত্র আহত হবার অভিযোগ পাওয়া যায়।

এব্যাপারে ভুক্তভোগী ছাত্র সায়েম মিয়ার মা সালমা মুঠোফোনে জানান, তার ছেলে এই বিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে যাচ্ছে। কিছুদিন পূর্বে ভালো ফলাফলের আশায় আবাসিক শিক্ষকদের তত্বাবধানে হোস্টেলে তার ছেলেকে পাঠান তিনি। কিন্তু বুধবার রাতে কলেজের সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্ররা তার ছেলেকে অন্য একটি রুমে নিয়ে বেদম প্রহার করে। পরে আশুলিয়া থানার পুলিশ এসে তার ছেলেকে উদ্ধার করে।

বর্তমানে তার ছেলে নারী ও শিশু হাসপাতালে চিকিতসাধীন উল্লেখ করলেও কেন তার ছেলের উপরে হামলা হয়েছে তা তিনি জানাতে পারেন নাই। তবে হামলার সময় ভবনে অবস্থানরত আবাসিক শিক্ষক এবং কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল লতিফ এগিয়ে এসে কোনো ভূমিকা নেন নাই বলেও জানান হামলার শিকার ওই ছাত্রের মা সালমা বেগম।

এদিকে, বৃহস্পতিবার (৩০ জানুয়ারি) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ৩০-৪০ জনের একদল যুবক মুখে মাস্ক পরে লাঠিসোঠা নিয়ে আশুলিয়ার ইউনিক এলাকায় অবস্থিত টাঙ্গাইল রেসিডেনসিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের স্কুল ও কলেজ শাখায় এবং প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল লতিফের বাসায় হামলা চালিয়ে ভাংচুর শুরু করে। পরে তারা কলেজ ভবনের সামনের কয়েকটি দোকানে ভাংচুর করে বলে জানা যায়।

তবে এব্যাপারে অধ্যক্ষ আব্দুল লতিফ ও প্রতিষ্ঠানের সাবেক সভাপতি মাসুদ রানা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। আর সৃষ্ট হামলার জন্য তারা একে অপরকে দোষারোপ করেন।

প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ আব্দুল লতিফ জানান, গত বুধবার দিবাগত গভীর রাতে কলেজের আবাসিক ভবনে যে অনাকাঙ্খিত হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা তাতক্ষনিকভাবেই মিটে গেছে। অভিভাবকদের উপস্থিতিতে রাত ৩টা থেকে ৪টার ভিতরেই এর সমাধান হয় এবং পরে এ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়ারও সৃষ্টি হয়নি। কারণ এরকম কোনো বড় ব্যাপার ঘটলে স্থানীয় থানায় মামলা হতো। কিন্তু অভিভাবকদের পক্ষ থেকে রাতের ঘটনা নিয়ে থানায় কোনো অভিযোগই হয়নি।

তিনি বলেন, আমার বড় ভাই মাসুদ রানা সাহেব বিগত কিছুদিন ধরে আমার উপরে প্রতিহিংসাবশতঃ আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে অস্থিতিশীল করতে আমাকে নানা হুমকি-ধামকি প্রদান সহ অনৈতিক কর্মকান্ড চালাচ্ছেন। সর্বশেষ আজ (বৃহস্পতিবার) দুপুরে মাসুদ রানার নেতৃত্বে বাইরের কিছু লোকজন ও আমার প্রতিষ্ঠানের কিছু ছাত্রদের নিয়ে আশুলিয়ার ইউনিকে অবস্থিত আমাদের ক্যাম্পাস ও আমার বাসভবনে হামলা ও ভাংচুর চালান। এসময় হকি স্টিক দিয়ে তাকেও পেটানো হয় বলেও জানান অধ্যক্ষ আব্দুল লতিফ।

তবে এডমিট কার্ড না পাওয়া নিয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা ওই হামলা চালায় এব্যাপারে তিনি জানান, বাংলাদেশের ইতিহাসে এরকম কখনো হয়েছে কি যে স্কুল কর্তৃপক্ষকে অতিক্রম করে উপজেলা প্রশাসন সরাসরি পরীক্ষার্থীদের এডমিট কার্ড বিতরণ করেছে? আর এরকম কোনো পরিস্থিতিও তো আমাদের প্রতিষ্ঠানে ঘটে নাই যে স্কুল কর্তৃপক্ষকে অতিক্রম করে উপজেলা প্রশাসন এব্যাপারে ‘ইন্টারফেয়ার’ করবে। আসলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতার কারণে এই প্রতিষ্ঠানের সাবেক সভাপতি মাসুদ রানা বহিরাগতদের নিয়ে এরকম একটি হামলা ঘটানোর সুযোগ পেয়েছেন। সাভার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা যদি শিক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র আটকে না রাখতো তাহলে এমন ঘটনা ঘটতো না।

এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের সাবেক সভাপতি মাসুদ রানা বলেন, আমার বিরুদ্ধে করা অভিযোগটি সম্পুর্ন মিথ্যা ও বানোয়াট। আর এডমিট কার্ড নিয়ে আসলে কোনো কিছুই হয়নি। বুধবার দিবাগত রাত আনুমানিক একটায় কলেজের আবাসিক ছাত্ররা নেশা করে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের উপর হামলা চালায়। এসময় বুয়েট ছাত্র আবরার কে যেভাবে হত্যা করা হয়েছিলো, একই স্টাইলে এক এসএসসি পরীক্ষার্থী সায়েম মিয়াকে একটি রুমে নিয়ে মারধর করে। তখন কৌশলে ওই হামলার শিকার ছাত্র তার মাকে ফোনে জানালে তার মাধ্যমে পুলিশ এসে ওই ছাত্রকে উদ্ধার করে।

তবে প্রতিষ্ঠানটিতে বৃহস্পতিবার এর হামলা তার নেতৃত্বে হয়েছে এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও তাকে হেয় করার চক্রান্ত বলে জানান তিনি। মুঠোফোনে এসময় তিনি আরও বলেন, এডমিট কার্ড আসলে কোনো ফ্যাক্টর না, কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল লতিফ নিজের অপকর্মকে ঢাকতে এরকম নাটকের অবতারণা করছেন।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোসাঃ কামরুন্নাহার জানান, টাঙ্গাইল রেসিডেনসিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মৌখিক নির্দেশে প্রবেশপত্রগুলো তাদের কাছে দেয়া হয়নি। আমরা নিজেদের লোক দিয়ে দুই দিন ধরে প্রবেশপত্রগুলো শিক্ষার্থীদের মাঝে বিলি করার ব্যবস্থা নিয়েছি। হামলার সঙ্গে প্রবেশপত্র বিতরণের কোনো সম্পর্ক নেই বলেও জানান তিনি।

এব্যাপারে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পারভেজুর রহমানের মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় এবিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাংচুরের বিষয়ে আশুলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক নুরুল হুদা মুঠোফোনে জানান, গত বুধবার রাতে কলেজের সিনিয়র ছাত্রদের সাথে তুচ্ছ বিষয় যেমন সিনিয়রদের কে জুনিয়রদের পক্ষ থেকে সালাম দেওয়া না দেওয়া নিয়ে মারামারির ঘটনা ঘটে। পরে অভিভাবকদের উপস্থিতিতে বিষয়টি ওই রাতেই ফয়সালা হয়।

তবে বৃহস্পতিবার দুপুরে এডমিট কার্ড পাওয়া না পাওয়া নিয়ে হামলা ও ভাংচুর এর ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না বলেও জানান ওই উপ-পরিদর্শক।

এব্যাপারে আশুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ রিজাউল হক দিপু জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তবে এঘটনায় কোনো পক্ষই থানায় লিখিত কোনো অভিযোগ করেনি।

এদিকে, ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব ও এর জেরে চলমান সংকটে হতাশা ব্যক্ত করেছেন এখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা।

বার্তা বাজার / ডব্লিও.এস

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর