চোখে গামছা বাঁধা অবস্থায় ছুটে চলছে কলুর বলদ। অজনার উদ্দেশ্যে পাড়ি তার। কখন পথ শেষ হবে জানেনা সে। কলুর লাঠির আঘাতে শত কষ্টের মাঝেও তার নিরন্তর ছুটেচলা।
কাঠের তৈরি এক গোলকার ছামে (ঢেকি সদৃশ) কতগুলো ভেজা সরিষা, তাতে একটি লাকরি বৈঠার মত কাঠে যুক্ত করা আর চওড়া একটি কাঠে বসে আছেন তেলি যাকে কলু ও বলা হয়। বলদ তাকে নিয়ে ঘুরছে আর তাতেই সরিষা পিষ্ট হয়ে একটি টিনের নালায় টপটপ করে আসছে সরিষার তেল। নিচে রাখা আছে প্লাস্টিকের পট। এভাবেই একটু – একটু করে জমে তা ঘন্টার পর ঘন্টায় লিটারে জমছে। প্রতি কেজি সরিষা হতে ৩০০ গ্রাম তেল হয়। আর সরিষা পিষ্ট উচ্ছিষ্ট কে বলা হয় খৈল। যা গরুর খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
একটা সময় ছিল যখন বাড়ি-বাড়ি ঘানি ভাঙ্গা সরিষার তেল পাওয়া যেত। যে গ্রামের মানুষজন বেশি এ পেশায় জড়িত ছিল সে গ্রামকে তেলি পাড়া বলা হত। গরু, মহিষ কিংবা ঘোড়া দিয়েও এ কাজ করত অনেকে সামর্থ অনুযায়ী । নির্ভেজাল, কেমিক্যাল মুক্ত ও সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রক্রিয়ায় তৈরি এ তেলের উৎপাদন ব্যবস্থা হওয়ায় মানুষের কাছে ঘানি ভাঙ্গা তেলের চাহিদা এখনো রয়েছে।
এমনি এক ব্যতিক্রম ধর্মী পেশায় নিয়োজিত আছেন পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার দেবনগড় ইউনিয়নের মাগুরমারী চৌরাস্তা এলাকার এনামুল হক (৪০)। তিনি ঐ এলাকার মৃত কুদরত আলীর ছেলে।
এনামুল হক “বার্তা বাজার” কে জানান আমি ১০/১১ বছর ধরে ঘানি ভাঙ্গা সরিষার তেলের ব্যবসা করছি । এটা এখন আর আমার পেশা নয় শখের বশেই করছি। আমি ২৭০/২৮০ টাকা কেজি দরে ঘানি ভাঙ্গা সরিষার তেল বিক্রি করি। মানুষজন জেলা ও জেলার বাইরে থেকে আমার ঘানি ভাঙ্গা তেল কিনতে আসে। তারা এ তেলের মান ভালো বলে জানিয়েছেন। তাই তাদের উৎসাহে আমি এই ঘানি ভাঙ্গা সরিষার তেলের উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছি।
জেলার তিরনই হাট এলাকা থেকে ঘানি ভাঙ্গা সরিষার তেল কিনতে আসা রইসুল আলম (৪৩) জানান, ঘানি ভাঙ্গা সরিষার তেল আমার প্রিয়। এ তেলে কোন প্রকার ভেজাল বা কেমিক্যাল জাতীয় কিছু নেই। ভর্তা কিংবা আচার তৈরীতে এই তেলের জুড়ি নেই। তাই সরাসরি কিনতে আসছি। যদিও তেলের দামটা একটু বেশি।
রফিকুল ইসলাম (৩৮) নামে এক ব্যাক্তি বলেন আমি পঞ্চগড় জেলার হাড়িভাসা থেকে ঘানি ভাঙ্গা সরিষার তেল কিনতে আসছি। শীতের দিনে ঘানি ভাঙ্গা সরিষার তেল গায়ে মাখলে অল্পতেই শরীর গরম হয়ে যায় এবং শীত কম অনুভূত হয়। আর চানাচুর দিয়ে মুড়ি মেখে খেতে এ তেলের কোন জুড়ি নেই।
বার্তাবাজার/কে.জে.পি