পরিবারের ৬ সদস্যই প্রতিবন্ধী, ভাতা পান না কেউই

এক পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৬ জন। এরমধ্যে ৩ জন মেয়ে, একজন ছেলে আর তাদের মা-বাবা। প্রায় সারা বছরই অর্ধহারে, অনাহারে থাকেন। কারণ এই ৬ জনই প্রতিবন্ধী। স্বামী শারীরিক প্রতিবন্ধী, স্ত্রী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, তিন মেয়ে শারীরিক ও বুদ্ধি এবং একমাত্র ছেলে শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। এখন ছেলেই কিছুটা উপার্জনের সঙ্গে যুক্ত। শারীরিকভাবে কাজ করার সামর্থ তার নেই। তারপরও এলাকার এক ঠিকাদার দয়া করে ছেলেটিকে নিজের কাজের সাইটে পাহারাদার হিসেবে রেখেছেন।

সেখান থেকেই যে টাকাটা আসে তার সঙ্গে বাড়ির ফলমূল বিক্রয় করা টাকা যোগ করেই কোনো রকম চলে তাদের সংসার। কিন্তু, দুঃখের বিষয় হলো সমাজের অনেক স্বচ্ছল পরিবার, ব্যক্তির নামে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন সংস্থার ভাতা কার্ড। নেই শুধু এই পরিবারের কোনো সদস্যের। আর এই পরিবারের খবরই জানেন না স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার, সমাজ সেবা অফিসসহ প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা।

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড তিলেকপুর গোরস্তান পশ্চিমপাড়া মৃত আফেজ উদ্দিন প্রামাণিকের ছেলে আবুল কাশেম প্রামাণিক (৭১) এর প্রতিবন্ধী অসহায় পরিবার। কোথায় গিয়ে এবং কিভাবে প্রতিবন্ধী সনদ নিতে হয় তা পরিবারটির কারও জানা নেই। কখন ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এই কার্ড করা তাও জানতে পারেন না। যখন লোকমুখে শুনে ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার ও চেয়ারম্যানের নিকট যান তখন বলা হয় কার্ড হয়ে গেছে। এখন আর হবে না। আবার নতুন কার্ড আসলে যোগাযোগ করবেন। কিন্তু আবার কখন কার্ড আসে তা পরিবারটি জানতে পারে না। এভাবেই চলে আসছে তাদের কার্ড পাওয়ার প্রতিক্ষা। কিন্তু সেই প্রতিক্ষা আর এই জনমে শেষ হবে বলে বিশ্বাস নেই।

সরেজমিনে ওই এলাকায় গিয়ে এলাকাবাসী, জনপ্রতিনিধি ও পরিবার সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

শারীরিক প্রতিবন্ধী আবুল কাশেম প্রামাণিকের ছোট ভাই আরিফুল ইসলাম জানান, তার ভাই কাশেম প্রামাণিক শারীরিক, তার স্ত্রী রওশন আরা বেগম (৫৭) দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, ৩ মেয়ে নাসিমা খাতুন (৩৩), নাজমা খাতুন (৩০), শিল্পী খাতুন (২২) শারীরিক ও বুদ্ধি এবং ছেলে রায়হান প্রামাণিক (২৫) শারীরিকভাবে (হাত-পা শুকনা) প্রতিবন্ধী। এদের মধ্যে নাজমা খাতুনকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এদের কারও নামেই প্রতিবন্ধী, বয়স্ক কিংবা অন্য কোনো সরকারি ভাতার কার্ড নেই। অনেকবার স্থানীয় মেম্বার শামসুল ইসলামের নিকট ভাতার কার্ড করার জন্য এই পরিবারের সদস্যদের ছবি ও কাগজপত্র দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কার্ড আর হয় না।

প্রতিবন্ধী আবুল কাশেম প্রামাণিক জানান, তার পরিবারের সবাই অসুস্থ। সমাজের অনেক সুস্থ মানুষের নামে কার্ড আছে। আমাদের নামে নেই। বেসরকারি ওসাকা নামের একটি সংস্থা থেকে তিন মাস পর পর তাকে এক হাজার করে টাকা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরো জানান, অনেক চেষ্টার পর স্থানীয় মেম্বার মেরিনা খাতুন একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দিয়েছিলেন। কয়েকবার টাকা পাওয়ার পর তা বন্ধ হয়ে গেছে। মেম্বার জানিয়েছেন, তার বয়স নাকি ভোটার আইডিতে ৫৭ বছর লেখা আছে। কিন্তু আমার বয়স তো ৭০/৭২ বছর। ভাটার আইডিতে ভুল হওয়ায় আমাকে ভাতা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তার পরিবারের আর কোনো সদস্যের নামে ভাতার কার্ড নেই।

সাহাপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৪,৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার মেরিনা খাতুন জানান, পরিবারের অন্যান্য সদস্যের নামে ভাতার কার্ড নেই। আবুল কাশেমের নামে বয়স্কভাতার কার্ড ছিল। কিন্তু ভোটার আইডির সঙ্গে ভাতার কার্ডের বয়সের তারতম্য হওয়ায় উপজেলা সমাজ সেবা অফিস থেকে কার্ডটি বাতিল করা হয়েছে।

সাহাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মতলেবুর রহমান মিনহাজ ফকির জানান, প্রতিবন্ধী এই পরিবারটির কথা তার জানা ছিলো না। তারা প্রতিবন্ধী সনদ নিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করলে কার্ড করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

ঈশ্বরদী উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা আব্দুল সেলিম জানান, তিনি নতুন এসেছেন। প্রতিবন্ধী পরিবারটির কথা তিনি জানেন না। খোঁজ নিয়ে দেখবেন। তবে পরিবারটি প্রতিবন্ধী সনদ নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করলে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

ঈশ্বদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিহাব রায়হান জানান, বিষয়টি ইতিপূর্বে তার জানা ছিল না। প্রতিবন্ধী পরিবারটি বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হবে।-কালের কণ্ঠ

বার্তাবাজার/কে.জে.পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর