কর্মী অদক্ষতায় বাড়ছে রেল দুর্ঘটনা

২০১৯ সালে সব মিলিয়ে ১২৯টি ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে দেশে। বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মীদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় ৩৯ জনের মৃত্যুর এবং দেড় শতাধিক যাত্রী আহত হয়। আর এসব দুর্ঘটনার ৭২ ভাগই হয় মানব সৃষ্ট ভুলের কারণে।

এক্ষেত্রে রেলকর্মীদের অদক্ষতার চিত্র উঠে আসে সংস্থাটির তদন্ত প্রতিবেদনে। এমন খবর প্রকাশ করেছে বণিক বার্তা।

গত বছর ২৩ জুন সিলেট থেকে ঢাকায় আসার পথে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় দুর্ঘটনায় পড়ে আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেস। ওই দুর্ঘটনায় চারজন নিহত ও অন্তত ৬৪ জন আহত হয়। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসে রেলকর্মীদের অদক্ষতার কথা।

এরপর আরো বড় দুর্ঘটনা ঘটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়। গত ১২ নভেম্বর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী তূর্ণা-নিশীথার সঙ্গে সিলেট থেকে চট্টগ্রামের দিকে যাওয়া উদয়ন এক্সপ্রেসের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ১৫ ট্রেনযাত্রী। পরে মারা যান আরো দুজন। আহত হন শতাধিক। এই দুর্ঘটনার জন্য তূর্ণা-নিশীথার দুই চালক (লোকোমাস্টার) ও গার্ডকে (পরিচালক) দায়ী করা হয় রেলের তদন্ত প্রতিবেদনে।

বেশিরভাগ দুর্ঘটনা মানবসৃষ্ট হওয়ায় রেলকর্মীদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। রেলওয়ের কর্মকর্তারাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে রেলকর্মীদের দক্ষতায় ঘাটতির কথাই জানাচ্ছেন।

রেলওয়ের তথ্য মতে, প্রতি বছর যত ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে, তার ৭২ শতাংশই হয় মানব ভুলে। ২০১৯ সালে সব মিলিয়ে ১২৯টি ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে দেশে। এসব দুর্ঘটনায় ৩৯ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি দেড় শতাধিক আহত হয়। এর মধ্যে ১৮ জন লেভেল ক্রসিং দুর্ঘটনায় নিহত হয়। এ সব দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ঘটেছে লাইনচ্যুতির ঘটনা।

তবে রেলওয়ে লেভেল ক্রসিং দুর্ঘটনায় ১৮ জনের প্রাণহানির কথা বললেও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য দিচ্ছে ভিন্ন বার্তা।

এআরআইয়ের হিসাব মতে, গত বছর (২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত) লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২১৭টি। আর এসব দুর্ঘটনায় ২৩৯ জন নিহত ও ৪৭০ জন আহত হয়। তবে লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার দায় রেলওয়ের নয় বলে দাবি করে থাকেন রেল কর্মকর্তারা।

কুলাউড়ায় উপবন এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনার জন্য রেলপথ যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ার কথা উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সেখানে রেলপথটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন দুজন কর্মী। তারা ‘ওয়ে অ্যান্ড ওয়ার্কস ম্যানুয়াল এবং জেনারেল অ্যান্ড সাবসিডিয়ারি রুল’ অনুযায়ী রেলপথটি সুরক্ষিত রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। এজন্য ট্র্যাক (রেল লাইন) ও কোচ রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের কথা বলা হয় ওই তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশে।

এ বিষয়ে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক ও এডিবির সুপারিশে নব্বইয়ের দশকে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে রেলে বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই হয়। ওই সময় যেসব কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়, তাদের বেশির ভাগই ছিলেন কারিগরিভাবে বেশ দক্ষ। পরবর্তী সময়ে সেই দক্ষ জনবলের ঘাটতি আর পুষিয়ে উঠতে পারেনি রেলওয়ে।’

তিনি আরো বলেন, ‘নতুন জনবল এলেও তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম-দুর্নীতি, কর্মীদের প্রয়োজনীয় নজরদারি ও জবাবদিহিতার মধ্যে রাখতে না পারাসহ বিভিন্ন কারণে রেলকর্মীদের দক্ষতায় বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।’ রেল দুর্ঘটনা কমানো ও সংস্থাটি লাভজনক করতে কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও শূন্য থাকা কারিগরি পদগুলো দ্রুত পূরণের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন বুয়েটের এই অধ্যাপক।

এ সমম্যার কথা স্বীকার করে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান বলেন, ‘গত বছর ট্রেন দুর্ঘটনা আগের দুই বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি হয়েছে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর পরই আমরা কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করি এবং কমিটি যেসব সুপারিশ করে, সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করি।’

তিনি আরো বলেন, ‘মানবসৃষ্ট ভুলে ট্রেন দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে। এজন্য প্রধানত দায়ী আমাদের জনবলস্বল্পতা। রেলপথ সুরক্ষিত রাখার জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় জনবল নেই। স্টেশন মাস্টারের অভাবে অনেকগুলো স্টেশন বন্ধ। ট্রেন পরিচালনার জন্যও পর্যাপ্ত জনবল আমাদের নেই।’ দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার জন্য শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণও জরুরি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এ বিষয়ে রেলওয়ের মহাপরিচালক বলেন, ট্রেনচালকদের প্রশিক্ষণের জন্য কিছুদিন আগেই অত্যাধুনিক সিমুলেটর উদ্বোধন করা হয়েছে। দক্ষতা বাড়াতে মাঠ পর্যায়সহ সর্বস্তরের কর্মীদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আমরা আশা করছি, চলতি বছরই এসব উদ্যোগের মাধ্যমে রেল দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

বার্তাবাজার/কে.জে.পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর