ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার পৌরশহরে চাঁদনী সিনেমা হলের সামনে মহাসড়কের ফুটপাতে একটি ভ্যানগাড়ীতে ঝালমুড়ি বানিয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বিক্রি একজন দোকানদার। ঝালমুড়ি ক্রয়ের জন্য ঝালমুড়ি ক্রেতাদের সিরিয়ালের দৃশ্য চোখে পড়ার মত।
ঝালমুড়ি কেনার জন্য কাছে গিয়ে বোঝা গেল, ঝালমুড়ি বিক্রেতার দুটি চোখে বেশ সমস্যা রয়েছে। ঝালমুড়ি তৈরীতে প্রয়োজনীয় মসলা যেমন ছোলা-মুড়ি-চানাচুর দেওয়ার পরিমাণটা চোখের খুব কাছে নিয়ে নির্ণয় করতে হচ্ছে তাকে।
ঝালমুড়ি খেতে খেতে দোকানের পিছন দিক দেখিয়ে তিনি বলেন, তার নাম মোঃ আসাদুল (৩৩)। বাড়ী জেলার রাণীশংকৈল পৌরশহরের মহলবাড়ী গ্রামে। চোখে কোন সমস্যা কিনা- প্রশ্ন শুনে তিনি বেশ বিরক্ত হয়ে জানালেন দেখেও কি বুঝতে পারছেন না? জন্মগতভাবে আমি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তবে এক চোখে কাছের জিনিসগুলো খানিকটা দেখতে পাই। বেশি দুরের কোন দৃশ্য দেখতে পাই না। ঝালমুড়ি খেতে খেতে গল্পটা বেশ জমেই গেলো।

কথার ফাঁকে তিনি জানালেন, ভিক্ষাবৃত্তি না করে কাজ করে খাওয়ার ইচ্ছে থেকেই ঝালমুড়ি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছি। অনেকে ভিক্ষাবৃত্তির পেশায় নামতে বললেও তা আমি ভালোভাবে নেই নি। কারণ নিজে পরিশ্রম করে খাব। নিজের স্বাধীনতায় থাকবো। কারোও অবজ্ঞা নিয়ে চলার ইচ্ছা নেই আমার। তাই চোখে কম দেখলেও মনের জোরে ও সৎ সাহসে আল্লাহর উপর ভরসা রেখে ভ্যানগাড়ীতে করে আমি শহরের নির্দিষ্ট কিছু স্থানে ঝালমুড়ি বিক্রি করি।
হাসিমুখে আসাদুল বলেন, এতে আমাকে পরিবারের সদস্যরাসহ এলাকাবাসী অনেক সহযোগিতা করে। বিশেষ করে ভ্যান গাড়ীটি বহনের সময় তারা আমাকে গন্তব্যস্থলে পৌছাতে অনেক সহযোগিতা করে।
আসাদুলের বাড়ী গিয়ে দেখা গেছে, পৈত্রিক সামান্য জমির উপরে টিন দিয়ে নির্মাণ করা বাড়ীতে বসবাস করেন তিনি। অভাবের মধ্যেও উপযুক্ত বয়সে বিয়ে করে গড়ে তুলেছেন সুখী সংসার। সংসারে রয়েছে ২টি পুত্র সন্তান। বড় সন্তান মাদ্রাসায় এবং ছোট ছেলে স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া লেখা করছে।
স্থানীয়রা জানান, দৃষ্টিপ্রতিবন্দী আসাদুলের জন্ম একটি নিম্নবিত্ত পরিবারে। তার বাবা শাহাজাহান আলী ছিলেন দিনমুজুর। তার দ্বিতীয় পুত্র আসাদুল অশিক্ষিত হলেও বিচার বিশ্লেষণ জ্ঞান মুগ্ধ করার মত। ছোট থেকেই বাদাম বিক্রিসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকে সে জীবিকা নির্বাহ করছে। সন্তান হওয়ার পূর্বে ঝালমুড়ি বিক্রি করে ভালই চলছিলো সংসার, তবে সন্তান হওয়ার পর তাদের পড়ালেখা খরচসহ অন্যান্য খরচ বহণ করতে খুব হিমশিম খেতে হচ্ছে আসাদুলকে।

সরকারী কোন ধরনের সুযোগ সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় আসাদুলের কাছে। তিনি ঘর থেকে সমাজ সেবা অধিদপ্তর থেকে প্রতিবন্ধী হিসাবে স্বীকৃত প্রাপ্ত সনদপত্র ও পরিচয় পত্র দেখান। জন্মগত প্রতিবন্ধী হলেও তিনি প্রতিবন্ধী হিসাবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন গত ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে। তবে তালিকাভুক্ত হলেও প্রতিবন্ধী ভাতা কপালে জুটেনি তার।
আসাদুল ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার জন্য অনেকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্তÍ কোন হয়নি, কপারে জোটেনি প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা। এখন কারো পিছনে না ঘুরে ঝালমুড়ি বিক্রিতে বেশি সময় দিচ্ছি।
প্রতিদিনের আয় সম্পর্কে আসাদুল জানান, সারাদিন ঝালমুড়ি বিক্রি করে বেচাকেনা হয় ৮শ থেকে ১হাজার টাকা পর্যন্ত। সেখানে মুনাফা প্রতিদিন ২ থেকে ৩শ টাকা আসে। এই দিয়ে চলে আমার সংসার।
আসাদুলের স্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার অটিজম ও প্রতিবন্ধীদের সরকারীভাবে ভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিচ্ছেন। অথচ আমার বিয়ে হয়ে এই সংসারে আসা অবধি সরকারী সুযোগ সুবিধা পাই নি। আমার স্বামীর প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ডটি দ্রুত করে দেওয়ার জন্য আপনাদের সহিযোগিতা চাই।
রাণীশংকৈল উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, গেল বছরে যাচাই-বাছাই কার্যক্রমে আসাদুল উপস্থিত হয়নি। অন্যান্যদের ন্যায় আসাদুল ওই কার্যক্রমে উপস্থিত থাকলে এবারেই ভাতাভোগীদের তালিকায় তার নাম উঠতো। কাগজপত্র নিয়ে অফিসে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি।
রাণীশংকৈল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহরিয়ার আজম মুন্না বলেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আসাদুল আমাদের উপজেলার প্রতিবন্ধীদের মডেল। অনেক ভাল ও চলাফেরায় স্বচ্ছল প্রকৃতির গরিব মানুষেরা সামান্য কোন সমস্যায় পড়লে মানুষের নিকট সাহায্যের হাত পাতে। অথচ আসাদুল চোখে না দেখলেও মনের জোরে নিজেই কর্ম করে জীবিকা নির্বাহ করছে।
উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে দ্রুত তাকে সরকারী সুযোগ সুবিধা প্রদানসহ প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
বার্তাবাজার/এইচ.আর