রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ: শিগগিরই চালু হচ্ছে জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কারণে দুই বছর পর কক্সবাজার জেলায় বন্ধ থাকা জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম শিগগিরই চালু হচ্ছে বলে জানিয়েছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন।

দীর্ঘ দুই বছর অতিগুরুত্বপূর্ণ সেবাটি বন্ধ থাকার কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে জেলাবাসীসহ পার্শ্ববর্তী জেলার বাসিন্দাদের। তবে সেবাটি চালু হলেও জন্মনিবন্ধন সনদ মিলবে অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের পর এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা।

এদিকে নতুন এই নিয়ম সম্পর্কে জানতে ও সনদের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করতে ২০ জানুয়ারি কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে একটি সচেতনতা সভার আয়োজন করেছে জেলা প্রশাসন।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসনে বলেন, আগের মতো পৌর মেয়র, ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান অথবা সচিব সরাসরি জন্মনিবন্ধন সনদ দিতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে তারা শুধু সুপারিশ করতে পারবেন।

এর পর আবেদনকারীর আবেদন যাচাই-বাছাই করবে উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি টাস্কফোর্স বা যৌথ কমিটি। ওই কমিটির সিদ্ধান্তেই জন্মসনদ প্রদান করা হবে।

জেলা প্রশাসনের সূত্র বলেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের কারণে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে কক্সবাজারসহ কয়েকটি জেলার অনলাইন জন্মনিবন্ধন ও মৃত্যু সনদ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। এর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের।

এ ভোগান্তি থেকে বাঁচতে গত ২৯ অক্টোবর জেলায় পুনরায় জন্মনিবন্ধন ও মৃত্যুসনদ চালু করতে উচ্চ আদালতে রিট করেন কক্সবাজার শহরের রুমালিয়ারছড়া বাসিন্দা ও সু্প্রিমকোর্টের আইনজীবী নাসরিন সিদ্দিকা লিনা।

রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট রুল জারি করার পর গত ১৩ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে কক্সবাজারের জন্মনিবন্ধন ও মৃত্যুসনদের অনলাইন কার্যক্রম পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সেই সিদ্ধান্ত মতেই এ মাসের শেষ সপ্তাহেই চালু হতে পারে সেবাটি। সূত্র আরও জানায়, রোহিঙ্গাদের কারণে জন্মনিবন্ধন বন্ধ থাকায় ভোটার তালিকা হালনাগাদ থেকে শুরু করে চাকরির আবেদন, পাসপোর্ট বানানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিসহ যাবতীয় কাজে জন্মনিবন্ধন সনদ দরকার হওয়ায় কক্সবাজারসহ কয়েকটি জেলার মানুষের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

এ বিষয়ে রিটকারী ও সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী নাসরিন সিদ্দিকা লিনা সাংবাদিকদের বলেন, আমি কক্সবাজারের মেয়ে। তাই জেলাবাসীর ভোগান্তি, দুর্ভোগ ও স্বার্থ চিন্তা করে গত বছরের ২৯ অক্টোবর বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে জন্মনিবন্ধন চালু করতে একটি রিট করি। যার রিট নম্বর ১১৩৫১/২০১৯। এতে জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর নির্দেশনা চাওয়া হয়।

আইনজীবী নাসরিন সিদ্দিকা লিনা বলেন, রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

কার্যক্রমটি পুনরায় চালু করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয় রুলে। স্থানীয় সরকার সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, নির্বাচন কমিশন, রেজিস্ট্রার জেনারেল (জন্ম ও মৃত্যু), চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ও কক্সবাজারের জেলা প্রশাসককে চার সপ্তাহের মধ্যে ওই রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

ইতোমধ্যে অনেক সংস্থাই রুলের জবাব দিয়েছে। অনেক সংস্থার জবাব এখনও মেলেনি। তবে এরই মধ্যে জন্মনিবন্ধন সার্ভার খুলে দেয়া জেলাবাসীর জন্য একটি সুখবর। আশা করছি জন্মনিবন্ধন কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িতরা সঠিকভাবে ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুয়ায়ী শিগগিরই জন্মনিবন্ধন সার্ভার ফের চালু হচ্ছে। তবে কক্সবাজারে যেহেতু বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা অবস্থান করছে সেজন্য জন্মনিবন্ধন দেয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা কড়াকড়ি ব্যবস্থা অবশ্যই থাকবে।

তিনি আরও বলেন, আগের মতো পৌর মেয়র, ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান অথবা সচিব সরাসরি জন্মনিবন্ধন সনদ দিতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে তারা শুধু সুপারিশ করতে পারবেন। এর পর আবেদনকারীর আবেদন যাচাই-বাছাই করবে উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি টাস্কফোর্স বা যৌথ কমিটি থাকবে।

আবেদনকারীর জন্মস্থান এবং জাতীয়তা যাচাই করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সনদ প্রদানের অনুমোদন দেবে। এর পর আবেদনকারীরা আগের মতো পৌরসভা কিংবা ইউপি কার্যালয় হতে সনদ সংগ্রহ করবেন।

এদিকে নতুন এই নিয়ম সম্পর্কে জানাতে ও সনদের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করতে ২০ জানুয়ারি কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে একটি সচেতনতা সভার আয়োজন করেছে জেলা প্রশাসন।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক (ডিডিএলজি) শ্রাবন্তি রায় বলেন, ইউএনওকে প্রধান করে উপজেলা পর্যায়ে একটি কমিটি আগে থেকেই রয়েছে। সেই সময় তাদের কার্যক্রমের পরিধি কম থাকলেও এখন বাড়ছে। জন্মনিবন্ধন ও মৃত্যুসনদ কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করতে জেলার চার পৌরসভার ও ৭১ ইউনিয়নের সব জনপ্রতিনিধি, সচিব, তথ্যসেবা কেন্দ্রের উদ্যোক্তোদের সঙ্গে একটি সভা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকার সহায়তা প্রকল্প-৩ এর অধীনে আগামী ২০ জানুয়ারি কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ম্যানেজমেন্ট ইনফেরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) সভায় আরও অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও মূল আলোচ্য বিষয় থাকবে জন্মনিবন্ধন ও মৃত্যুসনদ প্রদান বিষয়ে সকলকে সচেতন করা।

এদিকে জন্মনিবন্ধন খুলে দেয়ার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আইনজীবী অ্যাড. আয়াছুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ভোগান্তির পর অবশেষে কক্সবাজার জেলার অনলাইন জন্মনিবন্ধন সার্ভার খুলে দেয়া জেলাবাসীর জন্য সুখবর। জেলাবাসী তাদের অধিকার ফিরে পাচ্ছেন।

বার্তাবাজার/কে.জে.পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর