সুনামগঞ্জে পারিবারিক নৃশংসতা বেড়েছে। পারিবারিক দ্বন্দ্বে একের পর এক শিশু নির্মমভাবে খুন হচ্ছে। এর মধ্যে দিরাইয়ে সাড়ে পাঁচ বছরের শিশু তুহিনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা দেশবাসীর বিবেকবোধকে নাড়া দিয়েছে। তুহিনকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে জবাই করার পর দুই কান ও লিঙ্গ কেটে মরদেহের পেটে দুটি ছুরি ঢুকিয়ে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়। তুহিন হত্যায় বাবা, চাচা ও চাচাতো ভাই জড়িত থাকার অভিযোগে আদালতে বিচারকাজ শুরু হয়েছে।
এই চাঞ্চল্যকর হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ১১ জানুয়ারি ভোরে তাহিরপুরে সাত বছরের শিশু তোফাজ্জল হত্যার ঘটনা ঘটেছে। তার চোখ উফড়িয়ে হত্যা করে বস্তাবন্দি লাশ ফেলে রেখে যায় প্রতিবেশীর বাড়ির পেছনে। এ ঘটনায়ও নিহত শিশুর চাচা-ফুফুসহ সাতজনকে রিমান্ডে নিয়েছে। পুলিশ এক চাচার বসতঘরের ওয়ার্ডরোব থেকে রক্তমাখা লুঙ্গি ও বালিশ উদ্ধার করেছে। এর আগে ২০১৫ সালে ছাতকের বাতিরকান্দি গ্রামে মসজিদের বারান্দায় পাঁচ বছরের শিশু মোস্তাফিজুর রহমান ইমনকে হত্যা করে তিন টুকরা লাশ হাওরে পুঁতে রাখা হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডে সম্প্রতি চারজনের ফাঁসি দিয়েছেন আদালত।
জানা যায়, গত বছরের ১৩ নভেম্বর রাতে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে শিশু তুহিনকে নির্মমভাবে হত্যা করে স্বজনরা। পুলিশ এ ঘটনায় তুহিনের বাবা, তিন চাচা ও এক চাচাতো ভাইকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত দেখিয়ে গত ৩০ ডিসেম্বর চার্জশিট দিয়েছে। গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য আনোয়ার মেম্বারের সঙ্গে মামলার বিরোধের জের ধরেই প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে শিশু তুহিনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাকে জবাই করে দুই কান ও লিঙ্গ কেটে মরদেহের পেটে দুটি ছুরি বিদ্ধ করে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। বর্তমানে এর বিচারকাজ চলছে। এ ঘটনায় গত ১৩ জানুয়ারি আদালতে সাক্ষী দেন তুহিনের মা মনিরা বেগমসহ পাঁচজন। তবে কে তাঁর ছেলেকে হত্যা করেছে—তা জানেন না বলে আদালতকে জানান মনিরা বেগম।
এদিকে এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত গ্রাম বাঁশতলার জোবায়ের হোসেনের সাড়ে সাত বছরের শিশু তোফাজ্জলকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। গত ৮ জানুয়ারি নিখোঁজের পর ৯ জানুয়ারি ৮০ হাজার টাকা মুক্তিপণের চিরকুট লিখে তোফাজ্জলের জুতা বাড়ির সামনে ফেলে রেখে যায় ঘাতকরা। পরে গত ১১ জনুয়ারি ভোরে বাড়ির পাশে তোফাজ্জলের বস্তাবন্দি লাশ পান স্বজনরা। শিশুটির চোখ উফড়ানো ও পা ভাঙা ছিল। এ ঘটনায় ওই দিন রাতেই শিশুর চাচা, ফুফু, ফুফুর স্বামী ও শ্বশুর, দাদার চাচাতো ভাই ও তার ভাতিজাসহ সাতজনকে আটক করে পুলিশ। গত ১৪ জানুয়ারি আদালতে তোফাজ্জলের দাদার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে সারোয়ার হাবিব রাসেল ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে ভাতিজাকে হত্যার ঘটনা স্বীকার করে।
এর আগে ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ ছাতকের বাতিরকান্দি গ্রামের শিশু শ্রেণির ছাত্র মোস্তাফিজুর রহমান ইমনকে অপহরণ করে ঘাতকরা। মসজিদের ইমাম সুজনসহ তিনজন মিলে ইমনকে অপহরণ করে। টাকা না পেয়ে মসজিদের বারান্দায় জবাই করে হত্যা করে লাশের টুকরা হাওরে ফেলে দেয়। এ ঘটনায় ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক ঘাতক ইমাম সুজনসহ চারজনকে ফাঁসির দণ্ড দেন। ইমামের সঙ্গে শিশু ইমনের প্রতি এই নৃশংসতায় তার নিকটাত্মীয়রাও জড়িত ছিলেন।
সুনামগঞ্জ জেলা খেলাঘরের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রভাষক দুলাল মিয়া বলেন, ‘শিশুর প্রতি স্বজনদের এমন বর্বরতা ভাবাই যায় না। মানুষ বিবেকবোধ ও মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে দানবে পরিণত হচ্ছে। বুনো পশু-পাখিও নিজের সন্তানদের প্রতি এমন অমানবিক হয় না। তাই আমাদের সবার মানবিক মূল্যবোধ জাগানো দরকার।’ অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, ‘পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের কাছে না ফিরলে অসহিষ্ণু সমাজে এমন কলঙ্কজনক ঘটনা বাড়তেই থাকবে।’
সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান পিপিএম বলেন, ‘দ্রুত শিশু তুহিন হত্যার চার্জশিট প্রদান করা হয়েছে। এ ঘটনাটি প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন্যই করেছে স্বজনরা। আমাদের তদন্তে সব ঘটনা বেরিয়ে আসছে। তাহিরপুরের শিশু তোফাজ্জল হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও মূল ঘাতকদের কাছে চলে এসেছি। এই নৃশংসতায়ও পরিবারের নিকটাত্মীয়রা জড়িত। এ ঘটনায়ও দ্রুততম সময়ে চার্জশিট প্রদান করা হবে।’-কালের কণ্ঠ
বার্তাবাজার/কে.জে.পি