মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বড়সতীনের সন্তানদের হাতে মার খেয়ে সৎ মা মায়া বেগম(৫৫) দীর্ঘ এক মাস ২৮দিন পর সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে আইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
ওদিকে ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে মারা যাওয়ার পর শনিবার বিকেল দুইটার দিকে মায়া বেগমের ময়না তদন্তের সুরতহাল রির্পোট তৈরীর জন্য সিলেট কোতয়ালী থানায় ট্রাক এক্সিডেন্টে মারা যান বলে ওসমানী মেডিকেল থেকে থানায় কপি দেয়া হয়।
থানায় প্রেরিত এ রিপোর্ট দেখে নিহতের ছেলে জাফর আলী ও বোন রুবিনা হতবিহবল হয়ে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং মেডিকেল থেকে লিখা রিপোর্ট ঢাহা মিথ্যাচার বলে থানায় চ্যালেঞ্জ করে এঘটনায় শ্রীমঙ্গল থানায় রজুকরা মামলার কপি ও শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজারের সরকারি হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসার রেফার্ডের কপিতে মারামারির রোগী লিখা নিশ্চিত করেন।
পরবর্তীতে সিলেট কোতয়ালি থানার দায়িত্বরত এস আই দেলোয়ার হোসেন শ্রীমঙ্গল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের রোগীর ভর্তির কাগজে মারামারির রিপোর্ট লিখা দেখে ওই কাগজ ওসমানী মেডিকেলে ফেরৎ পাঠান। জাফর ওসমানীতে কর্তব্যরত চিকিৎসকের কাছে ঘটনার অভিযোগ দেয়ার পর তার মা মারামারির ঘটনায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বলে রিপোর্ট সংশোধন করে বিকেলে থানায় পাঠানো হয়।
রাতে হাসপাতালে মায়া বেগমের মরদেহ রেখে দেয়া হয়। রোববার দুপুরে ময়না তদন্তের সুরতহাল রির্পোট তৈরীর পর পোষ্টমর্টেম শেষে নিহতের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে জানান সিলেট কোতয়ালি থানার এস আই দেলোয়ার হোসেন। এসআই দেলোয়ার মুঠোফোনে বলেন, প্রথমে এক্সিডেন্টের রোগী লিখা হলেও পরবর্তীতে মারামারির রোগী বলে সেটি কারেকশন করে দেয় মেডিকেল কর্তৃপক্ষ।
জাফর আলী মুঠোফোনে বলেন,‘আমার সৎ ভাই আছিদ আলী ও তাঁর ভাইবোনেরা মিলে পিতৃসম্পদের লোভে আমার মাকে লোহার রড দিয়ে ডান হাত ও মাথায় মারধর করে মেরে ফেলেছে। তারা আমাকেও মেরে ফেলতে চায়। আমাকে তারা হত্যার হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। মামলা তোলার জন্য চাপ দিচ্ছে। তাছাড়া আমাকে বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে দেয়ার নানান ভয় দেখাচ্ছে। ভয়ে আমার ও পরিবারের সদস্যদের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে গত ৮ জানুয়ারি শ্রীমঙ্গল থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করেছি। শেষমেশ আমার মা মারামারির ঘটনায় ওসমানীতে চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যাওয়ার পরও তারা এক্সিডেন্টের রোগী বলে পোষ্ট মর্টেম ও সুরতহাল রিপোর্টে সাজাতে চেয়েছিল।
জাফর বলেন-‘আমার মাকে যারা মেরেছে, সেই মামলার আসামী আছিদ আলী প্রকাশ্যে রাতদিন এলাকায় অবস্থান করছে। বসবাস করছে,ঘোরাঘুরি করছে। কিন্তু পুলিশ বলছে তাকে খুঁজে পাচ্ছে না’।
জাফর থানায় মামলায় উল্লেখ করেন, গত বছরের ১৫ নভেম্বর বিকেলে লোহার রড দিয়ে সৎ ছেলে-মেয়েরা মিলে তার মা মায়া বেগমের ডান হাত ও মাথায় রক্তাক্ত জখম করে গুরুতর আহত করে। পরে স্থানীয়রা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে শ্রীমঙ্গল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে ওইদিনই মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে রেফার্ড করলে সেখান থেকে রাতেই সিলেট ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।
এ ঘটনায় মায়া বেগমের ছেলে জাফর আলী(২৭) তার সহোদর সৎ ভাই আছিদ আলী(৫০)সহ আরও নয়জনকে আসামী করে শ্রীমঙ্গল থানায় গত বছরের ১ ডিসেম্বর মামলা রজু (মামলা নং-১,২০১৯ ইং) করেন। আছিদ আলী সিন্দুরখান ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক। মামলা রজুর পর নয় আসামির মধ্যে আছিদ আলীসহ আরও ১জন ছাড়া অন্য সাত আসামি বিজ্ঞ আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন।
ওই মামলা চলাবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘ ১ মাস ২৮ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মায়া বেগম গতকাল শনিবার সকাল ৮টায় আইসিউতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
প্রশাসন ও সরকারের কাছে মা-ভাইয়ের হত্যার বিচার চেয়ে জাফর আলী বলেন, আমার পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তির লোভে গত বছর তারা আমার আপন ছোট ভাই হাসানকেও কীটনাশক পান করিয়ে মারধর করে পরে সেও ওসমানীতে ২৫ দিন চিকিৎসার পর আইসিওতে মারা যায়। ওই মামলাটি বর্তমানে সিআইডিতে তদন্তাধীন রয়েছে।
এদিকে সৎ ভাই আছিদ আলী সম্পত্তির লোভে স্থানীয় সিন্দুরখান ইউনিয়ন পরিষদের উত্তরাধিকারী সনদে আমাদের ভাইবোনের নাম রেখে শুধু আমার মায়ের নাম বাদ দিয়ে সার্টিফিকেট তুলেন। বিষয়টি জেনে চেয়ারম্যান বরাবরে পুন:রায় সনদের জন্য আবেদন করি। কিন্তু স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার কাগজে সুপারিশ করলেও উত্তরাধিকারী সনদ দিতে চেয়ারম্যান গড়িমসি করছেন।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হেলাল বলেন,ওই মহিলা তার স্বামী জীবতথাকাবস্থায় ছাড়াছাড়ির কারণে তিনি স্বামীর সম্পত্তির মালিক হন না তাই আমি সনদ দেইনি। ছাড়াছাড়ির লিখিত কিছু নেই। তবে নিহতের ছেলে জাফর বলেন এসব মিথ্যা কথা,আমার আব্বা আকবর আলী মারা যাওয়ার দিন পর্যন্ত তিনি একসঙ্গে বাড়ীতে বসবাস করে গেছেন। তখনও সময় এসব কথা আসেনি। ছেড়ে দিলে তো তিনি এক সঙ্গে বসবাস করতে পারতেন না।
শ্রীমঙ্গল থানার পরিদর্শক তদন্ত সোহেল রানা বলেন,মারামারির ঘটনায় একটি মামলা চলমান আছে। আমরা জানতে পেরেছি,মামলার ভিকটিম মায়া বেগম সিলেট ওসমানী হাসাপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় মারা গেছেন। এবিষয়ে হাসপাতালের মেডিকেল রিপোর্ট ও সুরতাল রিপোর্ট আমাদের নিকট আসার পর আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বার্তা বাজার / ডব্লিও.এস