গোপন খাতায় হিসাব রেখে ঘুষ নেন

নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের বড়-ছোট সব ধরনের প্রকল্পের ঠিকাদারদের কাছ থেকে বিলের ১ শতাংশ হারে অর্থ আদায় করেন খোদ সংস্থাটির পরিচালক (চলতি দায়িত্বে) ড. খুরশীদ জাবিন হোসেন তৌফিক।

অবৈধ এ অর্থ গ্রহণের নাম তিনি দিয়েছেন ‘অফিশিয়াল প্র্যাকটিস’ অর্থাৎ দাপ্তরিক চর্চা। এসব অর্থের হিসাব লিখে রাখার জন্য পৃথক একটি গোপন রেজিস্টারও (খাতা) রয়েছে। তার ভাষ্য- অফিসের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো হয় এ টাকায়। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে নিয়োগ পাওয়ার পর ধীরে ধীরে সংস্থাটিতে তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন ড. খুরশীদ।

তার বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও চাকরির শৃঙ্খলা-পরিপন্থী আচরণের অভিযোগে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রতিবেদনে দুর্নীতির এসব তথ্য তুলে ধরে তাকে অপসারণের সুপারিশ করা হয়।

তবে সেই সুপারিশ স্রেফ প্রতিবেদনেই রয়ে গেছে, আর খুরশীদও অদ্যাবধি রয়ে গেছেন তার পদে ও বহাল তবিয়তে। অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মনে করেন, কোনো এক অদৃশ্য শক্তির কলকাঠিতে তার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, যা ক্রমেই বাড়ছে।

মন্ত্রণালয় গত বছরের ১১ মার্চ তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত শেষে কমিটির প্রতিবেদনটি ২ মে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিবের কাছে জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অভিযুক্ত পরিচালক একাই অধিদপ্তরের তিনটি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন।

অথচ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আনা-নেওয়ায় ব্যবহার করা হয় আউটসোর্স থেকে ভাড়া করা গাড়ি। শুধু তাই নয়, নিজের অপছন্দের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অকারণে বদলির নামে হয়রানি করেন তিনি। কারণে-অকারণে অধীনস্থদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও উঠে এসেছে তদন্তে। অধিদপ্তরের কর্মচারী ইউনিয়নের নির্বাচনে পর্যন্ত তিনি হস্তক্ষেপ করেন।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগের ভিত্তিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (অডিট) মো. ইমরুল চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন শাখা-২) মো. ইসমাইল হোসেন এবং উপসচিব (প্রশাসন-৩ শাখা) মো. ছিদ্দিকুর রহমান।

প্রায় দুই মাস ধরে চলা তদন্তে অভিযুক্ত পরিচালক ছাড়াও অধিদপ্তরের ২৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিচালক খুরশীদের প্রশাসনিক দক্ষতার অভাবে সংস্থাটিতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বলে তদন্ত কমিটি মনে করছে।

শুধু এ কারণেই তাকে অপসারণ করা উচিত। এ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি তার আচরণ অভিভাবকসুলভ ও শোভনীয় নয়। তার অশালীন আচরণের কারণে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্ষুব্ধ। নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

তাই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পরিচালক খুরশীদকে তার পদে বহাল রেখে সংস্থাটির কার্যক্রম সুচারুভাবে সম্পাদন সম্ভব নয়। এ প্রতিবেদন দাখিলের পর পেরিয়ে গেছে সাত মাস। তবু স্বপদে বহাল আছেন খুরশীদ।

এ বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার বলেন, প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী ড. খুরশীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মচারী পরিষদের সভাপতি হরষিত বাড়ৈ বলেন, আমরা চাই তদন্ত কমিটির সুপারিশের বাস্তবায়ন। নয়তো আমরা কাজ বন্ধ করে দেব।

যার বিরুদ্ধে এত সব অভিযোগ, সেই ড. খুরশীদ জাবিন হোসেন তৌফিক অবশ্য এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, আমি এখনো তদন্ত প্রতিবেদন পাইনি। এ কারণে আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।

বিলের ১ শতাংশ অর্থ আদায় গ্রহণযোগ্য নয়

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঠিকাদারের কাছ থেকে বিলের ১ শতাংশ অর্থ আদায় তদন্ত কমিটির কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। পরিচালক তৌফিক তার লিখিত বক্তব্যে অভিযোগটি অস্বীকার করলেও জবানবন্দি গ্রহণকালে তদন্ত কমিটির জেরাতে স্বীকার করেছেন এ অর্থ আদায়ের বিষয়টি।

এর পক্ষে সাফাই হিসেবে তিনি বলেন, দাপ্তরিক প্র্যাকটিস হিসেবে এ টাকা নেওয়া হয়। আমি নিই না। আমি শুধু হিসাব দেখে স্বাক্ষর করি। প্রকল্পের কর্মকর্তারা এ টাকা গ্রহণ করেন। অফিসের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো হয় এ টাকা থেকে।

নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রধান অর্থনীতিবিদ খবির উদ্দিন আহম্মেদ ২০১৮ সাল থেকে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জবানবন্দিতে জানান, অঘোষিত একটি রেজিস্টারে বিলের পাশাপাশি ১ শতাংশ টাকা লিখে পরিচালকের নির্দেশ মতো তার নিকট উপস্থাপন করেন। পরিচালক ঠিকাদারের কাছ থেকে টাকা আদায় করেন। পরিচালক ওই টাকা থেকে কিছু টাকা দাপ্তরিক প্রয়োজনে ব্যয় করেন। অবশিষ্ট টাকা পরিচালক কী করেন, তিনি তা জানেন না।

এ ছাড়া অধিদপ্তরের সিনিয়র প্ল্যানার শাহীন আহম্মেদ লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেন, পরিচালক বিভিন্ন বিল থেকে ১ শতাংশ টাকা গ্রহণ করেন। তিনি তদন্ত কমিটির কাছে এ সংক্রান্ত লেনদেনের রেজিস্টারের একটি কপি দাখিল করেছেন। সেখানে ১ শতাংশ জমা টাকার বিপরীতে পরিচালকের স্বাক্ষরও রয়েছে।

অনুসন্ধানকালেও গোপন ওই রেজিস্টারের অনুলিপির একটি অংশ পাওয়া গেছে। সেখানে দেখা যায়, ২০১৮ সালের ১৩ ডিসেম্বর পরিচালক তৌফিক ও প্রধান অর্থনীতিবিদ খবির উদ্দিন স্বাক্ষর করে দুটি প্রকল্পের বিপরীতে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিলের ১ শতাংশ হারে ৯৪ হাজার টাকা আদায় করেছেন।

একের জন্য তিন

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পরিচালক একাই তিনটি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন। ওই তিনটি গাড়ি পালাক্রমে চালান গাড়িচালক আবুল ফয়েজ। অন্য দুজন গাড়িচালক মেহেদী হাসান ও শেখর আহম্মেদ বসে থাকেন।

গাড়িচালক ফয়েজ তদন্ত কমিটির নির্দেশক্রমে পরিচালক স্বাক্ষরিত তিনটি গাড়ির লগবুকের ফটোকপি তাদের কাছে জমা দিয়েছেন। সেটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, তিনটি গাড়ি যাদের নম্বর ২৯৯১, ২৪৪৯ ও ৭৮০৯ ব্যবহার করেন পরিচালক। লগবুকে তার স্বাক্ষরও আছে।

প্রতিবেদনের মন্তব্যে বলা হয়, পরিচালক তৌফিক তিনটি গাড়ি ব্যবহার না করে অন্য দুটি অধীনস্থদের ব্যবহারের সুযোগ দিলে সরকারি অর্থের সাশ্রয় হতো; কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আউটসোর্সিংয়ের গাড়ি প্রয়োজন হতো না। এমনকি দুই গাড়িচালককেও বসিয়ে রেখে অর্থব্যয়ের প্রয়োজন হতো না।

১০১-এর অভিযোগ

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিটি মনে করে, পদ না থাকা সত্ত্বেও ঢাকার বাইরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি করে তাদের হয়রানি করেছেন পরিচালক। অধিদপ্তরের রেখাকার মশিউর রহমান তদন্ত কমিটির কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেন, তিনি ১৩ বছর ধরে অধিদপ্তরে কর্মরত আছেন। তার স্ত্রী যখন গর্ভাবস্থায়, পদ না থাকা সত্ত্বেও তাকে তখন বরিশাল অফিসে বদলি করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে ১৪০ থেকে ১৫০ কর্মকর্তা ও কর্মচারী কর্মরত আছেন। এর মধ্যে ১০১ কর্মকর্তা ও কর্মচারী পরিচালকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে স্বাক্ষর করেছেন। এতে প্রতীয়মান হয়, তারা পরিচালকের আচরণে অতিষ্ঠ।

মাস্টারপ্ল্যান জমা না হলেও বিল উত্তোলন

এমএসডিপি প্রকল্পের মাস্টারপ্ল্যান রিপোর্ট লাইব্রেরিতে জমা পড়েনি। গত ৩০ জুন অধিদপ্তরের লাইব্রেরিয়ান সজীব সরকার স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্রে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ পরিচালকের স্বাক্ষরে এ খাতে বরাদ্দ ৮ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

নির্বাচনের ফল অহেতুক বাতিল

তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরে ২০১৮ সালে কর্মচারী পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে একটি মাত্র প্যানেল দাখিল হওয়ায় বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।

এ ফল পরিচালকের নিকট উপস্থাপন করা হলে তিনি বিভিন্ন অজুহাতে তা অনুমোদন করেননি। পরে নির্বাচন কমিশন ফল বাতিল করে। এরও পরে, উচ্চ আদালতের নির্দেশে ফল বাতিলের ঘোষণা চার মাসের জন্য স্থগিত করা হয়।

তদন্ত কমিটি বলছে, পরিচালক বিনাকারণে নির্বাচনের ফল বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিল। পরিচালক অহেতুক জটিলতা তৈরি করে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করেন। এ কারণেই কর্মচারীরা এ নিয়ে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।

বার্তাবাজার/কেএ

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর