বঙ্গবন্ধু মানুষের একটি রাষ্ট্র তৈরি করতে চেয়েছিলেন

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ইতিহাসের অধ্যাপক। বঙ্গবন্ধু গবেষক। বঙ্গবন্ধু’র জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন দীর্ঘ দিন থেকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী সামনে রেখে জানিয়েছেন তার মূল্যায়ন, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির কথা।

বলেন, বঙ্গবন্ধুকে আমরা এখনো যোগ্য সম্মান দিতে পারিনি। এখনো দেশে কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শিক্ষা ক্ষেত্রে এখনো আমরা অনেক পিছিয়ে। মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বিস্তর ফারাক।

তবে আশার বিষয় হলো এদেশের আম জনতা। মানুষের ওপর ভর করেই দেশ এতোদূর এগিয়েছে। সামনেও এগিয়ে যাবে। তবে আমাদের শাসকদের সতর্কতার সঙ্গে চলতে হবে। শাসক শ্রেণি মানুষের ভাষা বুঝে সতর্ক হয়ে চললে লক্ষ্যপূরণ সহজ হয়ে যাবে।

মুজিববর্ষ সামনে রেখে প্রত্যাশা কী এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস শুধু ৪৮ বছরের ইতিহাস নয়। সেই শশাংক থেকে শুরু হয়েছে বাঙালির ইতিহাস। তখন থেকে নিয়ে যদি আমি বিবেচনা করি দীর্ঘ সময়ের ইতিহাস তাহলে আমি বলবো বাংলাদেশ কিন্তু এগিয়েছে। কোন না কোনভাবে এগিয়েছে।

দৌঁড়াতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছে, হাঁটতে গিয়ে পথ বিভ্রান্ত হয়েছে। তা স্বত্ত্বেও বাঙালি এগিয়েছে। কাজেই আমি মনে করি বাঙালি আমজনতার প্রতি আমার আস্থা আছে। এরা কিন্তু সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ’৫২ থেকে ’৭১ পর্যন্ত যত আন্দোলন হয়েছে সবগুলোতে আমজনতার অনুঘটক সমভূমিকা আমি লক্ষ্য করেছি। নেতৃত্ব আছে।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও আমজনতা ছিল। সেজন্য জনতার ওপর নির্ভর করে আমি আশাবাদী হতে চাই। তবে নেতৃত্বকে অবশ্য অনেক সচেতন হতে হবে। সস্তা রাজনৈতিক জনপ্রিয়তাকে এড়িয়ে দেশ এবং রাষ্ট্রের জন্য ভবিষ্যতমুখী কর্মপরিকল্পনা করতে হবে।

যেমন আমি দৃষ্টান্ত দিই যে মেট্রোরেলের সিদ্ধান্তের সাথে আমি একমত নই। আমি মনে করিনা মেট্রোরেল করলে ঢাকার যানজট কমবে। কারণ যানজট করে গাড়ি। পৃথিবীর কোন রাষ্ট্রের রাজধানীতে আমি দেখিনি যে আধঘণ্ট ৪৫ মিনিট গাড়ি থেমে থাকে।

কলকতা শহরটি গোটা আশির দশকে অসহ্য যানজট ছিল, এখন সেখানে তরতর করে গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে। তিন মিনিটের বেশি গাড়ি কোথায়ও থামছে না। ডিজিটাল সিগন্যালে গাড়ি চলছে। পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখছে, আইন মানছে কিনা।

প্রধানমন্ত্রী গত বছরের মাঝামাঝি নির্দেশ দিয়েছিলেন ডিজিটাল সিগন্যালে ঢাকায় গাড়ি চালানোর। সেটি উপেক্ষিত হয়েছে। পুলিশ ডিপার্টমেন্ট না সিটি করপোরেশন উপেক্ষা করেছে সেটি আমি জানি না। তবে আমি রাস্তায় নামলে অস্বস্তিতে থাকি।

কথা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী , প্রেসিডেন্ট রাস্তা পরিষ্কার করে চলেন। এমনকি পুলিশের মহাপরিদর্শকও ক্ষেত্র বিশেষে রাস্তা পরিষ্কার করে যাতায়াত করেন। তারা বুঝবেন না যানজটের যাতনাটা কী। এতে করে কত কর্মঘণ্টা হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের।

এটা অর্থনৈতিকভাবে ভয়ঙ্কর বিনাশী প্রভাব তৈরি করছে বলে আমি মনে করি। সেজন্য নেতৃত্বকে সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং জনগণকে আরো তৎপর হতে হবে। বাংলাদেশে সিভিল সোসাইটি নেই। আছে- আওয়ামী সোসাইটি, জাতীয়তাবাদী সোসাইটি।

তবু কিছু মানুষ আছেন যারা সিভিল সোসাইটির মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন। তাদেরকে আরো সচেতন হতে হবে এবং জনগণকে জাগিয়ে তুলবার জন্য নেতৃত্ব দরকার হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছি আমরা। শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে এসে জানতে চাই-আমরা কি পিতা মুজিবকে তার যোগ্য সম্মান দিতে পেরেছি? এমন প্রশ্নে সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দ্রষ্ট্রা ও স্রষ্টা।

সে কারণে আমরা তাকে জাতির জনক ও রাষ্ট্রের স্থপতি হিসেবে বিবেচিত করি। এই রাষ্ট্রটি গঠন করার পরে তিনি মাত্র ১৩১৪ দিন সময় পেয়েছিলেন যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে গড়ে তোলার জন্য। সে সময় তার অনেক পদক্ষেপ নিয়ে হয়তো বিতর্ক থাকতে পারে।

তিনি যে রাষ্ট্রটি গড়তে চেয়েছিলেন, তার দিকনির্দেশনা ছিল ’৭২ এর ১০ই জানুয়ারি তিনি রেসকোর্সে যে ভাষণ দিয়েছিলেন তার মধ্যে। কতগুলো দিকনির্দেশক বক্তব্য ছিল সে ভাষণে, যেমন- তিনি বলেছিলেন, বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বসবাস করবে, খেয়ে পরে সুখে থাকবে। বেকার যুবকরা যদি চাকরি না পায়, মানুষ যদি খেতে না পায়- তাহলে এ স্বাধীনতা মিথ্যা হয়ে যাবে।

তার চেয়েও বড় কথাটি তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। যার ভিত্তি কোন ধর্মভিত্তিক হবে না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে- গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র। ’৭২ এর সংবিধান রচনার সময় যুক্ত হয়েছিল জাতীয়তাবাদ।

আদর্শ রাষ্ট্র কী হবে, কেমন হবে- তা নিয়ে নানা মুনির না মত আছে। তবে এটা বিশ্বাস করি, মানুষের একটি রাষ্ট্র তিনি তৈরি করতে চেয়েছিলেন। যা বলি আমরা সোনার বাংলা, বাংলা কখনো সোনার বাংলা ছিল না।

তবে তিনি একটা সমৃদ্ধ, সুখী, অসম্প্রদায়িক এবং অগ্রসর সমাজভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরে এসে আমার কাছে মনে হয় তার যোগ্য সম্মান আমরা দিতে পারিনি।

তার দু’টো কারণ আছে। প্রথমত- ’৭৫ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত সময় বঙ্গবন্ধু ছিলেন নির্বাসিত। বিশেষ করে ৭ই মার্চের ভাষণ শোনাটাও একটা অপরাধ ছিল সে সময়। ’৯৬ তে যখন তার দল আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলো, তখন থেকে তার হত্যার বিচারের উদ্যোগ নেয়া শুরু হলো, বঙ্গবন্ধু পুনর্বাসিত হতে শুরু করলেন, ৭ই মার্চের ভাষণ তরুণ সমাজ শুনলো।

গত ৪৮ বছরে অনেক কিছুই হয়েছে তার নামে। তার নাম করে রাজনীতি হয়, ফায়দা লুটা হয়, ফন্দিফিকির হয়, সব কিছুই হয়। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় তার যোগ্য সম্মান আমরা দিতে পারিনি। এ জন্য যে, তিনি যে আদর্শভিত্তিক আওয়ামী লীগ দল তৈরি করেছিলেন, আজকের আওয়ামী লীগ সেই আদর্শের সঙ্গে নেই। প্রথমত- তিনি বললেন, যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কোন প্রকার ধর্মভিত্তিক হবে না।

অথচ ২০১১ তে ১৫তম সংশোধনীতে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ধর্ম ইসলামের ধারাটি সংরক্ষণ করলো। যা কিনা অবদান ছিল অবৈধ সামরিক স্বৈরশাসক হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের। যদি রাষ্ট্রের সংবিধানে ধর্ম থাকে, তাহলে সে রাষ্ট্রের ভিত্তি ধর্ম হয়ে যায়।

দুই- মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, নারী বিদ্বেষী হেফাজতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সখ্য বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সঙ্গে যায় না। উপরন্তু পাঠ্যপুস্তুক থেকে হেফাজতের সুপারিশে ১৭টি রচনা বাদ দিয়ে নতুন ১৭টি রচনা যোগ করা হয়েছে।

কওমি মাদ্রাসা একটা বাস্তবতা। কিন্তু তাকে মোকাবিলা করার বিজ্ঞানসম্মত পথ এড়িয়ে, সরাসরি দাওরায়ে হাদীস অর্থাৎ সর্বোচ্চ ডিগ্রিটি স্নাতকোত্তর মানের সমান করা হয়েছে। এসব কিছুই ভোট প্রাপ্তির আশায়। কিন্তু আমি মনে করি, অনন্ত প্রমাণ করা যাবে যে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠি আওয়ামী লীগের বাক্সে কোনদিন ভোট দেবে না।

কিন্তু রাজনীতির হিসেব অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত লক্ষ্য এবং আদর্শকে যদি জলাঞ্জলি দেয়া হয়, তাহলে আমি মনে করি না তার যোগ্য সম্মান দেয়া হচ্ছে। তার নাম উচ্চারিত হচ্ছে, কারণ তাতে রাজনীতি আছে, সুবিধা আছে। কিন্তু তাকে অন্তরে ধারণ করা হচ্ছে না, তার আদর্শকে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না।

জাতিরজনককে নিয়ে বিতর্ক কেন হবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটি সারা বিশ্বের মধ্যে একটা ব্যতিক্রম। আমাদের দেশেই এ বিতর্কটি আছে। সব দেশেই কিন্তু জাতির জনক স্বীকৃত। ব্যপারটা হলো- বাঙালি জাতি সবসময় কিছু সংকীর্ণতায় ভোগে।

তারা স্বীকৃতি দিতে খুবই কুণ্ঠু। আত্মপ্রেমী এ বাঙালি জাতি দুরদর্শীও নয়। সে কারণেই এ সমস্যাটা হয়েছে। তবে একটি কথা বলে রাখি-বঙ্গবন্ধু এবং জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায় বিতর্ক হয়নি।

জিয়াউর রহমানকে নিয়েও ছিল না। জিয়াউর রহমান কখনো নিজেকে দাবি করেননি তিনি স্বাধীনতার ঘোষক, তিনি জাতির জনক, কোন কিছুই তিনি দাবি করেননি। তা করবার মতো দুঃসাহসিকতা আমরা তার মধ্যে দেখিনি। কিন্তু ’৯২ থেকে বিএনপি ক্ষমতাসীন থাকার পরে, বেগম খালেদা জিয়ার ১৫ই আগস্ট জন্মদিন এবং স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া প্রচার শুরু হলো।

এটা রাজনৈতিক বিতর্ক। যার সঙ্গে ইতিহাস নেই। তবে খুব খারাপ লাগে দেশের বাইরে গেলে যখন প্রশ্নবিদ্ধ হই এ বিতর্ক সম্পর্কে। তখন লজ্জায় মাথা হেট হয়ে যায়। তবে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করি।

যে স্বাধীনতার ঘোষক বঙ্গবন্ধু এবং প্রচারক হবে জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমানের অবদান আমি অস্বীকার করবো না। যে যার অবস্থানে থাকবে। ইতিহাসের দায় হচ্ছে যার যতটুকু প্রাপ্য সেটুকু বুঝিয়ে দেয়া। কমও নয়, বেশিও নয়।

কাজেই এ বিতর্ক নিয়ে ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে আমার খুব একটা মাথা ব্যাথা নেই। এটা রাজনীতিবিদদের সংকীর্ণ মনোভিত্তিক একটি উদ্দেশ্যপ্রসূত বিতর্ক।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের বুদ্ধিভিত্তিক কর্মকাণ্ড অত্যন্ত সীমিত। যদিও এটা বলা হয় যে, বাংলাদেশের সব প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছেন। তবু আওয়ামী লীগ রাজনীতির পাটাতন থেকে বঙ্গবন্ধুকে সর্বজনীন করবার ক্ষেত্রে বোধ হয় খুব একটা উদ্যোগ নেয়নি বলে আমার মনে হয়। তাকে দলীয় ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়।

বঙ্গবন্ধু কেন জাতির জনক, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দ্রষ্টা এবং স্রষ্টা এ কথাগুলো আওয়ামী লীগের মঞ্চ থেকে তথ্যের ভিত্তিতে কোন সময় প্রচার করা হয়নি। বঙ্গবন্ধু মহান নেতা, জনগণের নেতা এ পর্যন্ত বলেই বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্য ও আদর্শবিরোধী কর্মকাণ্ড নিজেরা করেছে সবসময়।

এ জায়গায় আমার খুব কষ্ট ও দুঃখ লাগে। ইতিহাসের একটি মহান চরিত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে নিয়ে যে পরিমাণ শ্রদ্ধা সম্মান দেখানোর কথা ছিল, কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে নীতি আদর্শের ভিত্তিতে সেটুকু এখনো হয়নি।

স্বাধীনতার ৪৮ বছরে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মনে করেন? এমন প্রশ্নে অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, এ মানুষটি ’৪৭ থেকে বাঙালির মুক্তির জন্য কাজ করেছেন।

তার ভাবনা কর্মের চুড়ান্ত বহিঃপ্রকাশে গিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে জন্ম হয়েছে। কিন্তু মনে হচ্ছে-এ মানুষটির সারা জীবনের সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং কর্মকে আমরা ঠিক ধরে রাখতে পারছি না। আমি আগেই বলেছি- তিনি মাত্র ১৩১৪ দিন সময় পেয়েছেন।

এ বাঙালি তাকে হত্যা করেছে। পাকিস্তানিরা তাকে হত্যা করতে পারেনি। কাজেই বাঙালির সীমাবদ্ধতা যে কত বড় সেটি প্রমাণ করে ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ড।

বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ, সরকারের এই সময়কে কিভাবে মূল্যায়ণ করবেন? তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের ইতিহাসে দীর্ঘতম মেয়াদে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

টানা তিন মেয়াদে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অভূতপূর্ণ উন্নয়ন নয়, প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বাংলাদেশ যা অর্জন করেছে এবং যা করে সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তাকে আমি উন্নয়ন বলি না, তাকে বলি প্রবৃদ্ধি।

আর উন্নয়ন হচ্ছে সমতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধিকে উন্নয়ন বলে। প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কিন্তু দরিদ্র মানুষ কোন সুবিধা পাচ্ছে না। বৈষম্য বেড়ে যাচ্ছে। এবং সেটি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় নীতি, সীমাবদ্ধতা, দুর্বলতা যাই বলিনা কেন তার কারণে।

আমি দেখেছি যে তাজউদ্দীনের বাজেটে বাংলাদেশের দারিদ্র নিরসন এবং সামাজিক সাম্য এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার একটা দর্শন ছিল। কিন্তু তাজউদ্দীনের পর থেকে আজ পর্যন্ত সাম্প্রতিক বাজেট হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক বাজেট।

সরকারি আয় ব্যায়ের হিসাব মাত্র। এর মধ্যে দর্শন খুঁজে পাই না। বৈষম্য কমানোর জন্য আওয়ামী লীগের অঙ্গিকার আমি দেখেছি, নির্বাচনী অঙ্গিকারনামায়।

কিন্তু বাজেট পথনির্দেশ করবে, বৈষম্য কিভাবে কমবে। সেপথ নির্দেশ বাজেটে পাইনি। আমি বলি বাংলাদেশে একটি মানুষ এবং একটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। মানুষটি হচ্ছে শেখ হাসিনা। আর প্রতিষ্ঠান হচ্ছে আদালত।

আর কেউ কাজ করছে না, শুধু গলাবাজি করছে। যার ফলে সুশাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে। এখন কথা হতে পারে যে, অনেকে বলবেন, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যারা অন্ধভক্ত তারা বলবেন, যে সুশাসন কোথায় নেই।

আমি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছি- সারা বাংলাদেশে যে পরিমাণ লোমহর্ষক যে সমস্ত অপরাধ হচ্ছে এ অপরাধগুলোর পেছনে কারণই হচ্ছে শাসন বলতে কিছু নেই। সুশাসনতো পরের কথা, আমার শাসনের মৌলিক কাঠামো বাংলাদেশে অনুপস্থিত।

কাজেই শাসনের দিক থেকে বাংলাদেশ খুবই নাজুক অবস্থায় আছে। তার কারণই হচ্ছে শাসন এবং শাসক দু’টোকেই রাজনীতিকরণ করা হয়েছে। যোগ্যতা, দক্ষতা, মেধা কোন গুরুত্ব দেয়া হয়নি। বাংলাদেশের সব ক্ষেত্রে, এমনকি শিক্ষা ক্ষেত্রেও সুশাসন বলতে কিছু নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল-অস্থির। এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিরা যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের প্রতি সামাজিক সম্মান রেখেই বলবো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা তাদের অনেকেরই নেই। তবুও তারা ভিসি হয়েছেন। অনেকটা দলের পাহারাদার হিসেবে আছেন।

ভিসি হিসেবে নয়। সেজন্য সুশাসন বা শাসন কোনটিই এখন বাংলাদেশে নেই। এবং এ প্রসঙ্গক্রমে ১৪৭৬ সালে ইংল্যান্ডের একজন বিচারপতি স্যার জন ফটেসকু তিনি ইংল্যান্ডের সে সময়ের অপশাসনের চিত্র বা শাসনহীনতার চিত্র দেখে একটা বই লেখেছিলেন ‘গর্ভন্যান্স অব ইংল্যান্ড’।

আমি মনে করি আমাদেরও একটি বই লেখা দরকার কেউ একজন পণ্ডিত ব্যক্তি এ ধরণের একটা বই লেখুন। অবশ্য বাংলাদেশে কোন সরকারই কোন সময় বই পড়ে সরকার চালায় না। অনেকে বলে যে গ্রন্থকিট হয়ে দেশ চালানো যায় না।

তবে গ্রন্থেই তাকে দিকনির্দেশনা মনে রাখতে হবে। গ্রন্থেই থাকে জ্ঞান। জ্ঞানভিত্তিক যদি কোন কর্মকাণ্ড না হয়। তাহলে সে কর্মকাণ্ডের কোন সামাজিক প্রায়োগিক গুরুত্ব থাকে না।

কোন পথে এগুচ্ছে আমাদের নির্বাচন ও গণতন্ত্র এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ১৭ই মে ১৯৮১ যখন নির্বাসন থেকে দেশে ফেরেন তখন তিনি বলেছিলেন, ভোট ও ভাতের অধিকার আদায়ের জন্য তিনি এসেছেন।

ভাত এতোদিনে বাংলাদেশের মানুষ কিছুটা পেয়েছে। গণদারিদ্র অর্ধেকে কমে গেছে। তার জন্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে অভিনন্দন জানাবো। কিন্তু ৩০ই ডিসেম্বর ২০১৮ এর নির্বাচনের পর থেকে যত ছোটখাটো নির্বাচন হয়েছে সেগুলোতে ভোটারের উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে কম। বাংলার মানুষ সব সময় নির্বাচনমুখি, ভোটকে উৎসব মনে করেছে।

এখন তারা ভোটকেন্দ্রে কেন আসছে না। এ প্রশ্নের উত্তর নির্বাচন কমিশনকে দিতে হবে, সরকারকে দিতে হবে। অর্থাৎ নির্বাচন এবং ভোট এখন মানুষের চিন্তা চেতনায় অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। কেন পাচ্ছে না এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার।

আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তার চিত্রটি কেমন হবে তা নিয়ে আমি বেশ শংকিত আছি। আর বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই। সরকার বললেও আমি বলবো গণতন্ত্র নেই। এ জন্যে যে গণতন্ত্রতো আর এক চাকার সাইকেল না, গণতন্ত্র মানে দুই চাকার সাইকেল।

সরকার আছে, খুব ভালোমতো আছে, পরপর তিন মেয়াদে আছে। সংসদে একটা বিরোধীদল আছে কিন্তু গৃহপ্রসূত। বিরোধীদল হিসেবে কী ভূমিকা পালন করবে সেটিও বোধ হয় তারা জানে না। বাংলাদেশে যা আছে, গণতন্ত্রের পরিবর্তে তাকে আমি বলি ডেমোসক্লেরোসিস। এটি শব্দ চয়ন করা হয়েছে দুটি শব্দ থেকে।

একটি ডেমোক্রেসি অন্যটি স্ক্লেরোসিস। স্ক্লেরোসিস এমন একটি রোগ, যাতে করে শরীরের ধমনি শুকিয়ে যায়, রক্ত প্রবাহিত হয় না। তার ফলে আপতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু সতেজ সজীব থাকতে পারেনা। এবং অনেকটা কাজের গরুও বলা যেতে পারে।

আমার সংবিধানে, খাতায় গণতন্ত্র আছে। কিন্তু গোয়ালে নেই। তার জন্য সরকার কতটুকু দায় আর বিরোধী দল কতটুকু দায়ী সেটিও বিবেচ্য বিষয়। কারণ সরকারতো চাইবে ক্ষমতা কুক্ষিগত রেখে যত নির্বিঘ্নে দেশ শাসন করা যায়।

কিন্তু বিরোধীদলের ব্যর্থতাটুকু আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশে কোন বিরোধীদল গড়ে উঠতে পারেনি। বিএনপি তার নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে এখন অনেকটা নত অবস্থায় রয়ে গেছে। তাদের কর্মকাণ্ড এখন বক্তৃতায় এবং বিবৃতিবাদী দল হিসেবে।

বঙ্গবন্ধু’র হাতে গড়া আওয়ামী লীগের মূল্যায়ণ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের এখন সামগ্রিক যে অবস্থা তা আমার বহুদিন থেকেই বলা একটি কথাই প্রমাণ করে দিচ্ছে। আমি সবসময় বলেছি, গণতন্ত্র মানেই হচ্ছে সরকার এবং দল আলাদা থাকা।

কিন্তু আওয়ামী লীগ সব সময় সরকার এবং দলকে একাকার করেছে। বঙ্গবন্ধু তা করেননি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও তা নেই। পৃথিবীর কোন গণতান্ত্রিক দেশে এটা নেই। সাম্প্রতিককালে আমি যেটা দেখছি যে আওয়ামী লীগ নিচের স্তর থেকে কিছুটা দল এবং সরকার আলাদা করবার চেষ্টা করছে। যেমন অনেক মন্ত্রীকে এবার দলীয় কোন কমিটিতে রাখা হয়নি।

কিন্তু একটি প্রশ্ন হচ্ছে- আসলেইতো দল এবং সরকার একাকার থেকে যাচ্ছে। কারণ প্রধানমন্ত্রী দলের সভাপতি, সেতুমন্ত্রী দলের সাধারণ সম্পাদক। কাজেই দল এবং সরকার একাকার হলে দলও ভালো চলে না সরকারও ভালো চলে না।

সেইটা প্রমাণিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের মাঝে যত কোন্দল, এটা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে সাধারণ সম্পাদকের কোন নেতৃত্ব নেই। কোন প্রভাব নেই। কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। এমনকি বিদ্রোহীপ্রার্থীও। এটাই প্রমাণ করে যে দলের চুড়ান্ত প্রভাব কোন ব্যক্তির ওপর নেই।

আর আওয়ামী লীগের একটা সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ের সঙ্গে কেন্দ্রের একটা দারুণ দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। এগুলো ঠিক করতে পারবে যদি সর্বক্ষণিক একজন সাধারণ সম্পাদক থাকে।

কারণ আমাদের সেতুমন্ত্রী সেতু ও মেট্রোরেল নিয়ে এতো ব্যস্ত তার মধ্যে আওয়ামী লীগের মতো বিরাট, বিশাল, প্রাচীন এবং তৃণমূললগ্ন একটি দলকে শামাল দিতে গেলে তাকে সুপারম্যান হওয়া লাগবে। তিনি সুপারম্যান না, তিনি হিউম্যান।

সে জায়গায় একটু সমস্যা। আমি মনে করি, শেখ হাসিনা যদি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যতকে লক্ষ্য করেন তাহলে জলদি সরকার এবং দলকে আলাদা করা দরকার। শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনার পরে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব কে দেবেন সে ব্যাপারটিও তাকে ভেবে চিন্তে পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে চার জাতীয় নেতা মুক্তিযুদ্ধ চালিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু নেতৃত্ব তৈরি করে গিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা এতোদিন ক্ষমতায় থাকার পরেও ওই মানের ওই মাপের নেতৃত্ব তৈরি করতে পারেননি। কাজেই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা বেশ শঙ্কিত আছি।

শিক্ষা ব্যবস্থা এতোদিনে কতদূর এগোল এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সংবিধানের ১৭ নম্বর ধারায় বলা আছে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু সংবিধান প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন পর থেকে আজও পর্যন্ত প্রতিটি সরকার এ ধারা লঙ্ঘন করেছে।

এখন বাংলাদেশে নানামুখী শিক্ষা প্রচলিত। সরকারের সহযোগীতায় সেগুলো চলছে। আমি মনে করি আদালতে কেউ যদি রিট করে যে সরকার সংবিধান লঙ্ঘন করছে। তাহলে রিটটি টিকে যাবে। আদালত যদি বিবেচনা করে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার পদ্ধতি পাল্টানো দরকার। শিক্ষা কমিশন সর্বসাম্প্রতিক যেটা হয়েছিল, সেটাকে শিক্ষা কমিশন বলবো না। তারা কোন নীতি দেয়নি। তারা কিছু ব্যবস্থা সুপারিশ করেছেন। শিক্ষা কমিশন একমাত্র একটিই হয়েছিল, সেটা হচ্ছে কুদরত-ই-খোদা।

শিক্ষা কমিশন সেটা বাস্তবায়ন কোন দিনই হয়নি। বঙ্গবন্ধুকে সময়ও দেয়া হয়নি বাস্তবায়নের। কাজেই শিক্ষা নিয়ে দারুণ চিন্তা আমাদের। অশনি সংকেত দেখা দিচ্ছে আগামীতে শিক্ষা নিয়ে।

বার্তাবাজার/কেএ

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর